বান্দরবান সদর থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরের এক জনপদ ‘নিশিপাড়া’। দুর্গম পাহাড়ের বুক চিরে গড়ে ওঠা এই গ্রামে পৌঁছাতে হলে আজও প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয়। নেই বিদ্যুৎ, নেই মোবাইল নেটওয়ার্ক; সুপেয় পানি কিংবা হাসপাতালের দেখা পাওয়া তো সেখানে এক বিলাসিতা। সেই নিশিপাড়ার রূঢ় বাস্তবতায় বেড়ে ওঠা এক তরুণী এবার দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে এক নতুন ইতিহাস লিখে দিলেন।
তার নাম য়াপাও ম্রো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে প্রথম ম্রো সম্প্রদায়ের তরুণী হিসেবে ভর্তি হয়ে তিনি কেবল নিজের স্বপ্ন পূরণ করেননি, বরং ভেঙে দিয়েছেন একটি জাতির দীর্ঘদিনের নীরবতার অচলায়তন।
য়াপাওয়ের পিতা পারাও ম্রো পেশায় একজন সাধারণ জুমচাষি। নিজের নামটুকু সই করার অক্ষরজ্ঞানও হয়তো তার নেই। কিন্তু তার চোখে ছিল অদম্য স্বপ্ন। দারিদ্র্য আর সীমাবদ্ধতার যাতাকলে পিষ্ট হয়েও তিনি মেয়ে য়াপাওকে বলতেন, ‘আমরা তো চোখ থাকতে অন্ধ ছিলাম, তুই আমাদের আলো হবি।’ বাবার সেই আশার প্রদীপ হাতে নিয়েই অন্ধকার পাহাড় থেকে যাত্রা শুরু করেছিলেন য়াপাও। চার ভাইবোনের মধ্যে তৃতীয় এই অদম্য তরুণী প্রমাণ করেছেন, ইচ্ছা থাকলে পাহাড়ের উচ্চতাও হার মানে মানুষের কাছে।
পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংখ্যায় ম্রোরা দ্বিতীয় হলেও শিক্ষা ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধার দৌড়ে তারা অনেকটা পিছিয়ে। বিশেষ করে ম্রো সমাজের মেয়েদের জন্য উচ্চশিক্ষার পথটি ছিল দীর্ঘদিনের রুদ্ধ। ম্রো ভাষার গবেষক ইয়াংঙান ম্রো এই অর্জনকে দেখছেন একটি ‘বিপ্লব’ হিসেবে। তার মতে, এতদিন ম্রো সমাজে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া কোনো তরুণীর উদাহরণ ছিল না। য়াপাও সেই দেয়াল ভেঙে ম্রো জাতির আত্মবিশ্বাসকে হিমালয়সম উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া য়াপাওয়ের জন্য কেবল একটি শিক্ষাবর্ষের শুরু নয়, এটি ম্রো জাতির কয়েক দশকের বঞ্চনার জবাব। যে গ্রামে নেটওয়ার্কের খোঁজে পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে হয়, সেখান থেকে এসে দেশের মেধা তালিকায় নিজের নাম লেখানো- এটি কোনো রূপকথার চেয়ে কম নয়।
য়াপাও ম্রোর এই জয়যাত্রা এখন পাহাড়ের প্রতিটি পাড়ায় পাড়ায় কিশোরীদের স্বপ্নের জ্বালানি। নিশিপাড়ার সেই দুর্গম পথ আর রূঢ় প্রকৃতি আজ গর্বিত তার সন্তানকে নিয়ে। পাহাড়ের বুক চিরে যে আলোর মশালটি য়াপাও জ্বালিয়ে দিয়েছেন, তা হয়তো অদূর ভবিষ্যতে আরও অনেক ম্রো তরুণীকে নিয়ে আসবে বিদ্যার এই আঙিনায়।
সময়ের আলো/জেডআই