দুই শতাব্দী পেরিয়ে ঠাকুরবাড়ী মেলা

কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা

সারাদেশ

দুশ বছরের ঐতিহ্য বুকে নিয়ে গাইবান্ধার ঠাকুরবাড়ী বৈশাখী মেলা আজও টিকে আছে গ্রামীণ জনজীবনের স্পন্দন হয়ে। বাংলা নববর্ষের আবহে এই

2026-04-20T03:30:25+00:00
2026-04-20T03:30:25+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
সারাদেশ
দুই শতাব্দী পেরিয়ে ঠাকুরবাড়ী মেলা
কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা
প্রকাশ: সোমবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৬, ৩:৩০ এএম   (ভিজিট : ৪২)
মেলা থেকে প্লাস্টিকের খেলনা কেনে দাদার সঙ্গে বাড়ি ফিরছে এক শিশু। ছবি : সময়ের আলো
দুশ বছরের ঐতিহ্য বুকে নিয়ে গাইবান্ধার ঠাকুরবাড়ী বৈশাখী মেলা আজও টিকে আছে গ্রামীণ জনজীবনের স্পন্দন হয়ে। বাংলা নববর্ষের আবহে এই মেলা শুধু বেচাকেনার স্থান নয়; বরং মানুষের মিলনমেলা, সংস্কৃতির বিনিময় ক্ষেত্র এবং গ্রামীণ অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। সময়ের পরিবর্তনে অনেক কিছু বদলালেও মেলার প্রাণচাঞ্চল্য, মানুষের ভিড় আর ঐতিহ্যের রেশ এখনও অটুট। 

সদর উপজেলার রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের ঠাকুরবাড়ী মন্দির চত্বরে বৈশাখ মাস এলেই শুরু হয় উৎসবের আমেজ। শঙ্খধ্বনি আর উলুধ্বনির মধ্যে গৌর-নিতাইয়ের পূজার মধ্য দিয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা মেলার আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেন। বৈশাখ মাসজুড়ে প্রতি রোববার ও বৃহস্পতিবার বসে এই মেলা। ধর্মীয় আবহের সঙ্গে গ্রামীণ জীবনের সহজ-সরল আনন্দ মিলেমিশে তৈরি করে এক অনন্য পরিবেশ।

মেলায় ঢুকতেই চোখে পড়ে বিশাল বটগাছ ঘিরে মানুষের ভিড়। চারপাশে পসরা সাজাতে ব্যস্ত দোকানিরা। কেউ গাঁইট খুলে পণ্য বের করছেন, কেউ বা শামিয়ানা টানিয়ে দোকান গুছিয়ে নিচ্ছেন। ক্রেতারা অপেক্ষা না করেই আধখোলা গাঁইট থেকে পণ্য দেখে দরদাম শুরু করে দিচ্ছেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিড়ও বাড়তে থাকে। শিশু, তরুণ, বৃদ্ধ- সব বয়সি মানুষের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।

এই মেলার মূল আকর্ষণ স্থানীয় কারুশিল্প ও কৃষিপণ্য। বাঁশ, বেত, পাট, শোলা, মাটি, কাঠ কিংবা ধাতুর তৈরি নানা সামগ্রী মেলার প্রাণ। মাটির তৈজসপত্র, টেপা পুতুল, কাচের চুড়ি, হাতপাখা, শীতলপাটি, ডালা-কুলা, মাছ ধরার চাঁই কিংবা গাছের চারা- সবকিছুরই দেখা মেলে এখানে। শিশুদের জন্য থাকে বাঁশি, খেলনা গাড়ি, রঙিন পুতুল। খাদ্যপণ্যের দোকানগুলোতে খাজা, গজা, মওয়া, বাতাসা, মুড়ি-মুড়কি আর গরম জিলাপির সুবাস ভেসে বেড়ায় চারদিকে। মেলার বিনোদনের অংশও কম আকর্ষণীয় নয়। নাগরদোলায় চড়ে শিশুরা আনন্দে মেতে ওঠে। এসব আয়োজন শুধু বিনোদন নয়, বরং লোকসংস্কৃতির ধারাবাহিকতার এক গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ।

জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ এই মেলায় আসেন বছরের প্রয়োজনীয় ছোটখাটো জিনিসপত্র কিনতে। একসময় দেশের নানা অঞ্চল এমনকি বিদেশ থেকেও পুণ্যার্থীরা এখানে আসতেন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই জৌলুস কিছুটা কমেছে। আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, শহরমুখী জীবনযাত্রা এবং বাজার ব্যবস্থার পরিবর্তনে গ্রামীণ মেলার গুরুত্ব আগের মতো নেই।

ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ব্রিটিশ শাসনামলে ঠাকুরবাড়ী মন্দির নির্মাণের পর ১৮২০ সালের দিকে জমিদার নরেন্দ্র লাহিড়ী এই মেলার সূচনা করেন। সেই থেকে প্রায় দুইশ বছর ধরে চলে আসছে এই আয়োজন। তবে কালের প্রবাহে মানুষের রুচি ও চাহিদার পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে মেলার ওপরও। ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে বাঁশ-বেতের কাজ, সূচিশিল্প, কাঁসা-পিতলের তৈরি জিনিসপত্র কিংবা মৃৎশিল্পের ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন। জায়গা করে নিচ্ছে প্লাস্টিকের তৈরি আধুনিক পণ্য।
তারপরও এই মেলা গ্রামীণ জীবনের এক অনিবার্য অংশ হয়ে আছে। 

এখানে মানুষ শুধু কেনাকাটা করতে আসে না, আসে একে অপরের সঙ্গে দেখা করতে, গল্প করতে, আনন্দ ভাগাভাগি করতে। এই সামাজিক যোগাযোগই মেলার প্রকৃত শক্তি। স্থানীয়দের দাবি, শতবর্ষী এই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও পরিকল্পিত উদ্যোগ। বড় পরিসরে আয়োজন, কারুশিল্পীদের সহায়তা এবং সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের প্রসার ঘটানো গেলে ঠাকুরবাড়ী বৈশাখী মেলা আবারও ফিরে পেতে পারে তার হারানো জৌলুস। গ্রামের মাটির গন্ধ, মানুষের হাসি আর শত বছরের স্মৃতি বয়ে চলা এই মেলা তাই আজও বলে যায়- সময়ের স্রোত বদলালেও শিকড়ের টান কখনো হারায় না।



  বিষয়:   দুই শতাব্দী  ঠাকুরবাড়ী মেলা 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: