ইউরোপের ২৭ দেশের জোট ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে ব্রাসেলসে বাংলাদেশ অংশীদারিত্ব সহযোগিতা চুক্তির (পিসিএ) প্রাথমিক সংস্করণ সই করেছে। এশিয়ায় স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ প্রথম ইইউর সঙ্গে পিসিএ চুক্তি সই করল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় উত্তীর্ণ হল। উভয়পক্ষের মধ্যে রাজনীতি, অর্থনীতি, বাণিজ্যসহ সার্বিক খাতের নিবিড় যোগাযোগকে চিহ্নিত করছে এই চুক্তি।
সোমবার (২০ এপ্রিল) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বাংলাদেশ ও ইইউ এর মধ্যে পিসিএ'র প্রাথমিক স্বাক্ষর সোমবার সকালে ব্রাসেলসে সম্পন্ন হয়েছে।
এই চুক্তিতে বাংলাদেশের পক্ষে সচিব (পূর্ব ও পশ্চিম) ড. মো. নজরুল ইসলাম এবং ইইউর পক্ষে ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (এশিয়া এবং প্যাসিফিক) পাওলা পাম্পালনি স্বাক্ষর করেন। এই সময়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এবং ইউরোপিয়ান কমিশনের হাই রিপ্রেজেনটেটিভ/ভাইস প্রেসিডেন্ট কাজা কাল্লাস উপস্থিত ছিলেন।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, পিসিএ মূলত একটি বিস্তৃত ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি, যা সরাসরি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নয়, তবে এটি বাণিজ্য-বিনিয়োগ সহযোগিতাকে অনেক শক্তিশালী করবে। এই চুক্তির ফলে দুপক্ষের মধ্যে স্থিতিশীল আইনি কাঠামোর আওতায় বাণিজ্য, বিনিয়োগ, কাস্টমস সহযোগিতা, বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি অধিকার, মানসম্মতকরণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে নিয়মিত সংলাপ ও সহযোগিতা বাড়বে। ইইউ কোম্পানিগুলোর জন্য বাংলাদেশে বিনিয়োগের পরিবেশ আরও স্বচ্ছ ও নিরাপদ হবে। শ্রম অধিকার, পরিবেশগত মান, সার্কুলার ইকোনমি, গ্রিন এনার্জি, ডিউ ডিলিজেন্স ইত্যাদি ক্ষেত্রে আরো সহযোগিতা বাড়বে। শুধুমাত্র তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাত নয় কৃষি, ফিশারিজ, আইটি, ওষুধ শিল্পসহ একাধিক খাতে রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ বাড়বে। এই চুক্তির ফলে গ্রিন ফ্যাক্টরি, প্রযুক্তি হস্তান্তর ইত্যাদি খাতে ইইউর বিনিয়োগ আরো আকৃষ্ট হবে। আবার এই চুক্তির ফলে মানবাধিকার, শ্রম অধিকার, সুশাসন ইত্যাদি শর্ত পূরণ না হলে দুপক্ষের সম্পর্কে বাণিজ্য সুবিধা প্রভাবিত হতে পারে। এদিকে ঢাকার পক্ষ থেকে পিসিএ চুক্তির পর ইইউর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা সেপা (কমপ্রেহেনসিভ ইকনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট) চুক্তির আলোচনা শুরুর আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন
ইইউ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। বিগত ২০২৪ সালে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের মোট পরিমাণ ছিল প্রায় ২২.২ বিলিয়ন ইউরো। বাংলাদেশের রপ্তানির প্রায় ৪৪-৫০% যায় ইইউতে, যার মধ্যে ৯৪ শতাংশই তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল। বাংলাদেশ বর্তমানে ইইউভূক্ত দেশগুলোতে ইবিএ (এভরিথিং বাট আর্মস) সুবিধায় শুল্কমুক্ত ও কোটা-মুক্ত প্রবেশাধিকার পাচ্ছে। ইউরোপীয় এক্সটারনাল অ্যাকশন সার্ভিসের (ইইএএস) এশিয়া- প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক পাওলা পাম্পালোনি গত জানুয়ারিতে বাংলাদেশ সফর করেন। তখন তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ ২০ বছর সাধারণ অংশীদারিত্ব চুক্তির আওতায় সম্পর্ক পরিচালনার পর ২০২৪ সালের নভেম্বরে সমন্বিত অংশীদারিত্ব চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। পিসিএ চুক্তি দুই পক্ষের সম্পর্ককে আরও গভীর করবে এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগে বড় সুযোগ তৈরি করবে’। ব্রাসেলসে দুপক্ষের মধ্যে সোমবার সকালে এই চুক্তি সইয়ের আগে উভয়পক্ষ অন্তত ৫বার এই ইস্যুতে বৈঠক করেছে।
বাংলাদেশ-ইইউ সম্পর্ক শুরু ১৯৭৩ সাল থেকে এবং দুপক্ষ দীর্ঘ ৫০ বছরেরও বেশি সময়ধরে নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক আরো নিবিড় করেছে। শুরুতে এই সম্পর্ক দাতা ও গ্রহীতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও বাংলাদেশের উন্নতি এবং দুপক্ষের আগ্রহের ফলে এই সম্পর্ক ২০২২ সালে রাজনৈতিক পর্যায়ে উন্নীতি হয়। বর্তমানে দুপক্ষের মধ্যে পিসিএ চুক্তি সইয়ের ফলে এই সম্পর্ক আরো বিস্তৃত হল।
অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ দৈনিক সময়ের আলোকে বলেন, বাংলাদেশ-ইইউ সম্পর্ক খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপের দেশগুলোর এই জোটটি বাংলাদেশের বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। পিসিএ চুক্তি সইয়ের ফলে বাংলাদেশ-ইইউ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ হল। এই চুক্তি সইয়ের মধ্য দিয়ে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরো উজ্জ্বল হবে এবং বিনিয়োগ ও বাণিজ্যে আরো সুবিধা পাওয়া যাবে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক সাহাব এনাম খান দৈনিক সময়ের আলোকে বলেন, ইইউর সঙ্গে চুক্তি সই নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। এতে দুপক্ষের সম্পর্ক আরো নিবিড় হল। এই চুক্তির ফলে ইউরোপের দেশগুলোতে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা আরো বাড়বে, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য আরো সহজ হবে এবং বাংলাদেশের ট্রেডবডি বেনিফিটেড হবে।
এএডি/