হামের চিকিৎসায় সঞ্চয় শেষ ৬১ শতাংশ পরিবারের

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয়

দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ে নতুন করে ১১৩ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। গত

2026-08-04T03:57:08+00:00
2026-08-04T03:57:08+00:00
 
  মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট ২০২৬,
২০ শ্রাবণ ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট ২০২৬
জাতীয়
হামের চিকিৎসায় সঞ্চয় শেষ ৬১ শতাংশ পরিবারের
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬, ৩:৫৭ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ে নতুন করে ১১৩ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৮৪৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ৯৬ জনের। এ ছাড়া হামের উপসর্গ নিয়ে ৭৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে। 

দেশে হামের প্রকোপের মধ্যে সন্তান হারানোর বেদনার পাশাপাশি পরিবারগুলোকে কী পরিমাণ আর্থিক ভার বইতে হচ্ছে, তার একটি চিত্র উঠে এসেছে। হামের চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে প্রায় ৮৯ শতাংশ পরিবারকে ঋণ করতে হয়েছে। পাশাপাশি প্রতি ১০টি পরিবারের মধ্যে ছয়টিকেই (প্রায় ৬১ শতাংশ) চিকিৎসার খরচ জোগাতে নিজেদের জমানো সঞ্চয় ভাঙতে হয়েছে। পৌনে তিন হাজার পরিবারের ওপর পরিচালিত এই মূল্যায়ন জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (বিডিআরসিএস) এবং ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজের (আইএফআরসি) যৌথভাবে এই জরিপ চালিয়েছে। 

সোমবার (৩ আগস্ট) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জরিপের ফলাফল প্রকাশ করে জানানো হয়, হামের প্রাদুর্ভাবের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব মূল্যায়ন এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার উদ্দেশ্যে দেশের ১২টি সরকারি মেডিকেল কলেজ ও জেলা হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া ২ হাজার ৭৪৬টি পরিবারের ওপর এই জরিপ করা হয়।

জরিপে অংশ নেওয়া রংপুর থেকে ১১ মাসের মেয়েকে নিয়ে ঢাকায় এসেছেন হাজেরা খাতুন। শিশুকন্যাটি হামে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি আছে রাজধানীর শহিদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা বিনামূল্যে হলেও তাদের চিকিৎসা-সংক্রান্ত খরচ ইতিমধ্যে ৭০ হাজার টাকা ছাড়িয়েছে। শুধু অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় আনতেই ব্যয় হয়েছে প্রায় ২০ হাজার টাকা। এরপর প্রতিদিনের খাবার, বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও আনুষঙ্গিক ব্যয় যোগ হয়ে খরচ আরও বেড়েছে। শেষ পর্যন্ত আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার করতে হয়েছে। 

হাজেরা খাতুন বলেন, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা বিনামূল্যে হলেও এর বাইরের অনেক খরচ আমাদের বহন করতে হয়। শুধু অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় আসতেই প্রায় ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। প্রতিদিন খাবার কিনতে হচ্ছে, বিভিন্ন চিকিৎসা পরীক্ষা করাতে হচ্ছে, সঙ্গে রয়েছে নিত্যদিনের অন্যান্য ব্যয়। আমি ইতিমধ্যে আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে টাকা ধার করেছি। আমার স্বামী সৌদি আরবে কাজ করেন, কিন্তু এ মাসে তিনি বেতন পাননি। এতে আমাদের আর্থিক সংকট আরও বেড়েছে।

হাজেরা খাতুনের মতো অভিজ্ঞতা এখন হাজারো পরিবারের। বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (বিডিআরসিএস) ও ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেডক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজের (আইএফআরসি) যৌথ এক মূল্যায়নে দেখা গেছে, হামে আক্রান্ত প্রতি ১০টি পরিবারের প্রায় ৯টিই চিকিৎসা-সংক্রান্ত খরচ মেটাতে ঋণ নিতে বাধ্য হয়েছে। প্রতি ১০টি পরিবারের ৬টি তাদের সঞ্চয় শেষ করে ফেলেছে। দেশের যেসব পরিবারে সদস্যরা হামে আক্রান্ত হয়েছে, চিকিৎসা খরচ মেটাতে সেগুলো অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে। 

এক জরিপে দেখা গেছে, ১০টি পরিবারের মধ্যে ৯টিই ঋণ নিতে বাধ্য হয়েছে। অনেকে চাকরি হারানোর কথা জানিয়েছেন। হাসপাতালে চিকিৎসা বিনামূল্যে হলেও, অন্যান্য খরচ দ্রুত বেড়ে যায়। জরিপে দেখা গেছে, ৩৫ শতাংশ পরিবারের ওষুধ কেনার জন্য আর্থিক সহায়তা লেগেছে। আর ২২ শতাংশ পরিবারের খাবার সহায়তা প্রয়োজন হয়েছে। 

আক্রান্ত অনেক পরিবারই দরিদ্র জনগোষ্ঠীর এবং অনানুষ্ঠানিক কাজের ওপর নির্ভরশীল। তাদের মাসিক আয় ৪৮ ডলার (৫ হাজার ৯০০ টাকা) থেকে ১৬০ ডলারের (১৯ হাজার ৬০০) মধ্যে। জরিপে দেখা গেছে, হামের প্রাদুর্ভাবে আক্রান্ত পরিবারগুলো চিকিৎসা ও সংশ্লিষ্ট খরচ বাবদ গড়ে ১৩০ ডলারের (১৬ হাজার টাকা) বেশি খরচ করেছে।

সোমবার অধিদফতরের বুলেটিনে বলা হয়, হামের উপসর্গ নিয়ে যে ৩ জনের প্রাণ গেছে, তাদের মধ্যে দুজন সিলেট বিভাগের। অন্যজন ঢাকা বিভাগের। হামের উপসর্গ নিয়ে সবচেয়ে বেশি ৩২৬ জন মারা গেছে ঢাকা বিভাগে। এর পরেই আছে সিলেট বিভাগ, সেখানে মারা গেছে ১১৩ জন। এ ছাড়া রাজশাহীতে ৯১, চট্টগ্রামে ৬১, বরিশালে ৪৫, ময়মনসিংহে ৭১, খুলনায় ৩২ ও রংপুর বিভাগে ১২ জন মারা গেছে। 

স্বাস্থ্য অধিদফতর বলছে, গত ২৪ ঘণ্টায় আর ৯৬৭ জন হামের উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে এসেছে; তাদের মধ্যে ভর্তি হয়েছে ৯০২ জন। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ভর্তি ২৯৭ জন, রাজশাহীতে ২৭, সিলেটে ৯৩, চট্টগ্রামে ২৩৭, বরিশালে ১৩১, ময়মনসিংহে ৪৮, খুলনায় ৫০, রংপুরে ১৯ জন। 

গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সারা দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে মোট হাম রোগী ভর্তি হয়েছে এক লাখ ১৩ হাজার ৫২২ জন; যার মধ্যে ১ লাখ ৯ হাজার ১৭৯ জন হাসপাতাল ছেড়েছে। অন্যদিকে সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৩১ হাজার ৪৪ এবং হাম আক্রান্তের সংখ্যা ১৬ হাজার ৪০৮।

জরিপে অংশগ্রহণকারী পরিবারগুলোর ৭৫ শতাংশ রোগীর বয়স ৪ বছরের নিচে। এ ছাড়া ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সি রোগী ১৯ শতাংশ এবং ১৮ বছরের বেশি বয়সি রোগী রয়েছে ৬ শতাংশ।

বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, চিকিৎসা ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য খাতে প্রতিটি পরিবার গড়ে ১৬ হাজার টাকা করে ব্যয় করেছে। এই ব্যয় মেটাতে গিয়ে ৪ শতাংশ পরিবার নিজেদের সম্পদ বিক্রি করেছে এবং প্রায় ৩ শতাংশ পরিবার অনুদানের ওপর নির্ভর করেছে। জরিপে অংশ নেওয়া সব পরিবারই বলেছে, ধকল সামলে উঠতে তাদের আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন। এর মধ্যে ৩৫ শতাংশ পরিবার সবচেয়ে জরুরি সহায়তা হিসেবে ওষুধের কথা বলেছে। এরপর রয়েছে পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি (ওয়াশ) সহায়তা (৩৩ শতাংশ) এবং খাদ্য সহায়তা (২২ শতাংশ)।

পেশাগত তথ্য দেওয়া পরিবারগুলোর ৭৮ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন, যাদের মাসিক আয় ৬ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে। অসুস্থ শিশু বা পরিবারের সদস্যের পাশে দীর্ঘ সময় হাসপাতালে থাকার কারণে অনেকে আয় হারিয়েছেন, এমনকি চাকরি হারানোর ঘটনাও ঘটেছে।

জরিপের ভিত্তিতে নির্ধারিত ঝুঁকির মানদণ্ড অনুযায়ী সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ২ হাজার ৪০০টি পরিবারকে জরুরি নগদ সহায়তা (প্রতি পরিবারকে ১০ হাজার টাকা) দেওয়ার জন্য নির্বাচন করার কথা বলা হয়েছে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে।

বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সেক্রেটারি জেনারেল কবির এম আশরাফ আলম বলেন, এই মূল্যায়নে দেখা যাচ্ছে, অনেক পরিবার শুধু স্বাস্থ্য সংকট নয়, একই সঙ্গে বড় ধরনের আর্থিক সংকটেরও মুখোমুখি হয়েছে। আমাদের জরুরি সাড়ার অংশ হিসেবে আমরা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে নগদ সহায়তা দিচ্ছি এবং একই সঙ্গে কমিউনিটিতে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।


বাংলাদেশে আইএফআরসির হেড অব ডেলিগেশন আলবার্তো বোকানেগ্রা বলেন, হামের এই স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থার প্রভাব শুধু হাসপাতালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। অসুস্থ শিশু বা পরিবারের অন্য সদস্যের যত্ন নিতে গিয়ে অনেক পরিবার কঠিন আর্থিক সীমাবদ্ধতার মুখে পড়েছে। 

এই মূল্যায়নের ফলাফল বলছে, জনস্বাস্থ্যের জন্য জরুরি পরিস্থিতিতে মানবিক সহায়তা এবং শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষা দুটোই জরুরি। আমাদের কার্যক্রম অবশ্যই তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়া উচিত।

আইএফআরসি ও অংশীজনদের সহায়তায় বাংলাদেশ সরকারের দেশব্যাপী হাম টিকাদান কর্মসূচিতে সহযোগিতা করছে বিডিআরসিএস। পাশাপাশি কমিউনিটিতে সচেতনতা বৃদ্ধি, টিকাদান কেন্দ্রে সহায়তা এবং মানুষকে টিকা গ্রহণে উৎসাহিত করতে ১ হাজারের বেশি রেড ক্রিসেন্ট স্বেচ্ছাসেবক মাঠে কাজ করছেন বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি  


  বিষয়:   হাম  চিকিৎসা  সঞ্চয়  শতাংশ  পরিবার 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: