‘সেবা এক্সওয়াইজেড’ জ্বালানি সংকটের এই সময়ে নতুন একটি উদ্যোগ হাতে নিয়েছে— “ফুয়েল রিফুয়েলিং ড্রাইভার সার্ভিস”— যার মাধ্যমে গ্রাহকরা নিজেদের হয়ে ফিলিং স্টেশনে লাইনে দাঁড়ানোর জন্য ড্রাইভার ভাড়া করতে পারবেন। ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে গিয়ে লাইনে দাঁড়াবে, জ্বালানি ভরবে এবং পরে গাড়িটি মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেবে। বর্তমানে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে জ্বালানি সংকট চলমান থাকায় এই উদ্যোগটি বেশ আলোচনায় এসেছে এবং অনলাইনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে।
সারাদেশে গত কয়েক সপ্তাহের বাস্তবতা ছিল একেবারেই ভিন্ন— দীর্ঘ জ্বালানির লাইন, অনিশ্চয়তা এবং ট্যাঙ্ক ভরাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা। অনেকের জন্য এটি শুধু সাময়িক অসুবিধা নয়; বরং কাজ, পারিবারিক সময় এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রায়ও বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে।
এই প্রেক্ষাপটেই সেবাটির ধারণা আসে। কোম্পানির ভাষ্য অনুযায়ী, তারা তাদের বিদ্যমান গ্রাহকদের কাছ থেকে নিয়মিত কল ও বার্তা পেতে শুরু করে— বিশেষ করে যারা আগে থেকেই অন-ডিমান্ড ড্রাইভার সার্ভিস ব্যবহার করেন। গ্রাহকদের অভিজ্ঞতাগুলো ছিল বাস্তব ও ব্যক্তিগত। কেউ জানিয়েছেন, শুধু জ্বালানির লাইনে দাঁড়ানোর জন্য তাকে অফিস থেকে ছুটি নিতে হয়েছে। আরেকজন বলেছেন, তার ড্রাইভার সারারাত পাম্পে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে পরদিন আবার বিশ্রাম ছাড়াই গাড়ি চালাতে বাধ্য হয়েছেন। অনেক পরিবার জানিয়েছে, তাদের দৈনন্দিন সময়সূচি ভেঙে পড়ছে, এমনকি পরিবহন খরচও বেড়ে যাচ্ছে—কারণ গাড়িগুলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে আটকে থাকছে।
এই অভিজ্ঞতাগুলো থেকেই নতুন সেবার ধারণা— বাস্তব সমস্যার সমাধান থেকেই নতুন সেবার জন্ম। সেই চিন্তা থেকেই এই উদ্যোগ, যা মূলত কঠিন সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর একটি প্রয়াস।
সেবাটির মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে দিনে প্রতি ঘণ্টা ১৭৫ টাকা এবং রাতে প্রতি ঘণ্টা ২২৫ টাকা। তবে শুরু থেকেই খরচ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। কোম্পানির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই সেবা জ্বালানির দামের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার জন্য নয়; বরং সময় বাঁচানো, মানসিক চাপ কমানো এবং যারা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে পারেন না তাদের জন্য একটি বিকল্প তৈরি করাই এর লক্ষ্য।
বাস্তবতা হলো— যাদের সময় ও সুযোগ আছে, তারা নিজেরাই লাইনে দাঁড়াতে পারেন। কিন্তু কর্মজীবী মানুষ ও অনেক পরিবারের জন্য এটি সহজ নয়। তাদের জন্যই এই ধরনের সেবা কিছুটা স্বস্তি এনে দিতে পারে।
নিরাপত্তার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রায় এক দশক ধরে গ্রাহকদের সেবা দিয়ে আসছে তারা। তাদের প্ল্যাটফর্মে বিশ্বাসই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই সব ড্রাইভার যাচাইকৃত ও প্রশিক্ষিত এবং নিরাপদ সেবা নিশ্চিত করতে ট্র্যাকিং ও সহায়তা ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
তবে কোম্পানির পক্ষ থেকে এটিও স্পষ্ট করা হয়েছে যে, এটি একটি সাময়িক সেবা। অস্বাভাবিক পরিস্থিতির কারণে এটি চালু করা হয়েছে, এবং জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হলে এই সেবার প্রয়োজনও স্বাভাবিকভাবেই কমে যাবে।
কোন চিন্তা থেকে আসলে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এ প্রসঙ্গে কোম্পানির সিইও আদনান ইমতিয়াজ হালিম সময়ের আলোকে বলেন, তাদের আগে থেকেই অন-ডিমান্ড ড্রাইভার সার্ভিস ছিল। যাদের নিজস্ব ড্রাইভার নেই বা প্রয়োজন হয়, তারা সেখান থেকে ড্রাইভার নিতে পারতেন। কিন্তু কিছুদিন ধরে অনেক গ্রাহক জানাচ্ছিলেন, তারা জ্বালানির তেল না পাওয়ায় নানা সমস্যায় পড়ছেন। যাদের ড্রাইভার নেই, তাদের ছুটি নিয়ে নিজেই পাম্পে গিয়ে জ্বালানি আনতে হচ্ছে। আবার যেসব পরিবারে ৩–৪ জন ড্রাইভার থাকে, তারাও সমস্যায় পড়ছেন— কারণ ড্রাইভারদের জ্বালানি নিতে রাতে লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে, ফলে তাদের সবসময় পাওয়া যাচ্ছে না। এতে পরিবহন খরচও বেড়ে গেছে। গ্রাহকদের অনেকেই বলেছেন, এখানে টাকার বিষয়টা প্রধান নয়— বরং একটি সমাধান দরকার। সেই চিন্তা থেকেই এই সেবা চালু করা হয়েছে, যাতে এই সংকটের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো যায়।
সেবাটি কেমন সাড়া পাচ্ছে এ বিষয়ে তিনি জানান, তাদের সক্ষমতার চেয়ে বেশি চাহিদা আসছে প্রতিদিন। আজকের সব স্লট ইতোমধ্যে বুকড হয়ে গেছে, এমনকি আগামী দুই দিনের জন্যও বুকিং এসেছে। তারা যেহেতু যাচাইকৃত ড্রাইভার পাঠায়, তাই তাদের সক্ষমতা সীমিত। বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৫০ জন ড্রাইভারের একটি পুল তৈরি করা হয়েছে।
নির্দিষ্ট এ সেবা থেকে কোম্পানির লাভের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘সেবা এক্সওয়াইজেড’ একটি সোশ্যাল বিজনেস প্ল্যাটফর্ম। প্রায় ১০ বছর বয়স হলেও এখনো এতে বিনিয়োগ করতে হচ্ছে। একটি নির্দিষ্ট সার্ভিস থেকে খুব বেশি আয় হয় না এবং এটি দিয়ে বড় কিছুও করা সম্ভব নয়। তবে মানুষের সেবা করাই তাদের মূল লক্ষ্য, তাই নতুন এই উদ্যোগেও সেই ধারাই বজায় রাখতে চান তারা।
/ইউএমএইচ