ফিলিস্তিনে ইউরোপের সুনজর

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

ইসরাইলের মিত্র ভিক্টর অরবানের নির্বাচনি পরাজয়ের পর ইউরোপের দৃষ্টি ফিরেছে ফিলিস্তিনের দিকে। গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরের বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে

2026-04-22T01:47:59+00:00
2026-04-22T01:47:59+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
ফিলিস্তিনে ইউরোপের সুনজর
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৬, ১:৪৭ এএম 
সংগৃহীত ছবি
ইসরাইলের মিত্র ভিক্টর অরবানের নির্বাচনি পরাজয়ের পর ইউরোপের দৃষ্টি ফিরেছে ফিলিস্তিনের দিকে। গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরের বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে এই পরিবর্তন নতুন গতি এনে দিয়েছে। 

সোমবার ব্রাসেলসে ৬০টির বেশি দেশ তাদের প্রতিনিধি পাঠিয়েছে ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিদের সঙ্গে স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি শান্তি নিয়ে আলোচনার জন্য।  আগ্রাসন বন্ধে স্থায়ী কোনো সমাধান বের করতে না পারলেও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এখন পর্যন্ত ফিলিস্তিনিদের সবচেয়ে বড় সাহায্যকারী এবং ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাতে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সমর্থক। ইইউর অধিকাংশ সদস্য রাষ্ট্র এখন একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে। ইসরাইলেরও শীর্ষ বাণিজ্য অংশীদার এবং ইসরাইলি অস্ত্রের বড় ক্রেতা এই ২৭ জাতির জোট। খবর আলজাজিরার।

কিন্তু দুই বছর যুদ্ধের পর অক্টোবরে গাজায় যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়, তার আলোচনায় ইইউর কোনো ভূমিকা ছিল না। আর ইসরাইলের কিছু পদক্ষেপ নিন্দা বা নিষেধাজ্ঞার ইউরোপীয় উদ্যোগ বারবার ভেটো দিয়েছেন অরবান। এখন হাঙ্গেরির পরবর্তী নেতা পেটার মাগয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছেন, তিনি ইসরাইল ইস্যুতে অরবানের চেয়ে ভিন্ন পথে হাঁটবেন। একই সঙ্গে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কড়া সমালোচকরা যেমন, স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার পক্ষে জোর দিচ্ছেন।

ইসরাইলের সঙ্গে ইউরোপীয় চুক্তি চ্যালেঞ্জের মুখে : মাগয়ার বলেছেন, তিনি ইসরাইলের সঙ্গে ‘বাস্তববাদী সম্পর্ক’ চান। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) পুনরায় যোগ দেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন তিনি। এই আদালতই গাজার ঘটনায় নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছিল। অরবান ২০২৫ সালে নেতানিয়াহুকে আমন্ত্রণ জানিয়ে সেই পরোয়ানা অমান্য করেন। এরপর যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার বিচারের জন্য বিশ্বের একমাত্র আদালতটি থেকে হাঙ্গেরিকে বের করে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেন।

মাগয়ার আরও বলেছেন, তিনি ইসরাইল ইস্যুতে অরবানের ভেটো নীতি চালিয়ে যেতে পারেন না। গত তিন বছরের মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে ইসরাইলের সমালোচনাকারী ইইউ নেতাদের কাছে এই ভেটো ছিল সবচেয়ে বড় বাধা। ব্রাসেলস বৈঠকের পর ইইউর পররাষ্ট্রনীতি প্রধান কায়া কালাস বলেছেন, অরবানের ভেটো না থাকলে শিগগিরই পদক্ষেপ আসতে পারত। উদাহরণস্বরূপ, সহিংস ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ।

তিনি বলেন, আমাদের ২৭টি দেশ আছে, আর ২৬টি দেশ সহিংস বসতি স্থাপনকারীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা চায়। যে দেশ চায় না, সে দেশটিই আগে প্রাধান্য পেয়েছিল। এখন সেই দেশে নির্বাচন হয়েছে, আর আমাদের নতুন সরকার আসছে। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী চান, ইইউ ইসরাইলের সঙ্গে দীর্ঘদিনের ‘অ্যাসোসিয়েশন চুক্তি’ স্থগিত করুক। মঙ্গলবার ইইউর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে তিনি একটি প্রস্তাব দেবেন বলে জানিয়েছেন।

তবে চুক্তি একেবারে স্থগিত হওয়া সম্ভব নয় বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ অস্ট্রিয়া ও জার্মানির মতো দেশ সাধারণত ইসরাইলকেই সমর্থন করে। ২০০০ সাল থেকে বলবৎ এই চুক্তির আওতায় ইইউ ও ইসরাইল বাণিজ্য ও সহযোগিতা পরিচালনা করে। ইইউ মনে করে, গাজায় সামরিক অভিযানে ইসরাইল এই চুক্তি লঙ্ঘন করেছে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। পশ্চিম তীরের ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের ওপর নিষেধাজ্ঞার মতো পদক্ষেপ অনুমোদিত হতে পারে, যদি ‘যোগ্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা’ অর্জিত হয় অর্থাৎ ২৭টি দেশের মধ্যে ১৫টি এবং ইইউর জনসংখ্যার কমপক্ষে ৬৫ শতাংশের সমর্থন।

সোমবারের বৈঠকের আগে বেলজিয়ামের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ম্যাক্সিম প্রেভো বলেছেন, পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের চলমান হামলা এবং গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনাকে মøান করে দিচ্ছে। তিনি আরও বলেন, দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান দিন দিন আরও কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তবে বেলজিয়াম এবং অনেক ইউরোপীয় ও আরব সঙ্গী এখনও বিশ্বাস করে ইসরাইলি, ফিলিস্তিনি এবং পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য এটিই একমাত্র বাস্তবসম্মত পথ।

একতা ও নিরস্ত্রীকরণের আহ্বান ফিলিস্তিনি প্রধানমন্ত্রীর : ব্রাসেলসে ফিলিস্তিনি প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মুস্তফা বলেছেন, গাজার জন্য প্রয়োজন ‘একটি রাষ্ট্র, একটি সরকার, একটি আইন ও একটি লক্ষ্য’। 

তিনি বলেন, বৈধ কর্তৃত্বের অধীনে একটি একক নিরাপত্তা কাঠামো অর্জনই আমাদের সাধারণ লক্ষ্য। সেজন্য আন্তর্জাতিক স্থিতিশীল বাহিনী, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ, নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক নেতাদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় করে পথ দেখানো উচিত। তা হলে আর নিরাপত্তা সংকটে পড়বে না। তিনি ‘সব সশস্ত্র গোষ্ঠীর কাছ থেকে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে ধাপে ধাপে অস্ত্র পরিত্যাগ এবং গাজা থেকে ইসরাইলের সম্পূর্ণ প্রত্যাহার’ আহ্বান জানিয়েছেন। গাজায় যুদ্ধবিরতির পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য হামাসের নিরস্ত্রীকরণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিরা বলছেন, ইরান যুদ্ধের ছল করে ইসরাইল এই ভূখণ্ডে নিজের আগ্রাসী মনোভাব আরও পোক্ত করেছে। বসতি স্থাপনকারীদের হামলা বেড়েছে, আর সামরিক বাহিনী নিরাপত্তার অজুহাতে যুদ্ধকালীন বাড়তি বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।

ইইউ সরাসরি ট্রাম্প প্রশাসনের তৈরি বোর্ড অব পিসে (শান্তি বোর্ড) যোগ দেওয়া এড়িয়ে গেছে। তারা জাতিসংঘের বহুপাক্ষিকতা এবং বৈশ্বিক আইনি নীতিকে বেশি পছন্দ করে। তবে ভূমধ্যসাগরের ঠিক ওপারে মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতি থেকে বাদ পড়তে ইউরোপীয় জোটটি আগ্রহী নয়।

ব্রাসেলস বৈঠকের সময় মুস্তফা বলেন, তিনি বুলগেরিয়ান কূটনীতিক নিকোলাই ম্লাদেনভ সঙ্গে প্রথমবার সাক্ষাৎ করেছেন যাকে ট্রাম্প বোর্ড অব পিসের পরিচালক নিয়োগ করেছেন। তিনি গাজায় ইসরাইলের চলমান সামরিক অভিযান, মানবিক সহায়তা বৃদ্ধি এবং উপকূলীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ে ম্লাদেনভের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন। মুস্তফা বলেন, অনেক বিষয়ে আমরা একমত হয়েছি এবং আমি মনে করি শিগগিরই আমরা আবার দেখা করব।

ট্রাম্পের ‘শান্তি বোর্ডের’ সঙ্গে ডিপি ওয়ার্ল্ডের আলোচনা : ফিন্যান্সিয়াল টাইমস (এফটি) জানিয়েছে, দুবাইভিত্তিক লজিস্টিকস জায়ান্ট ডিপি ওয়ার্ল্ড ডোনাল্ড ট্রাম্পের তথাকথিত ‘শান্তি বোর্ডের’ (বোর্ড অব পিস) সঙ্গে গাজার সরবরাহ শৃঙ্খল ও অবকাঠামো প্রকল্প ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা করেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলোচনায় রাষ্ট্রায়ত্ত এই কোম্পানিটি অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে প্রবেশকারী মানবিক সহায়তা ও বাণিজ্যিক পণ্যের লজিস্টিকস তদারকির জন্য ওই গোষ্ঠীর সঙ্গে অংশীদার হতে পারে কি না তা খতিয়ে দেখা হয়েছে।

এর মধ্যে গুদামজাতকরণ, কার্গো ট্র্যাকিং ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত থাকবে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। আলোচিত অন্যান্য প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে গাজায় অথবা মিসরের নিকটবর্তী ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে একটি নতুন বন্দর নির্মাণ এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত এই ভূখণ্ডের ভেতরে একটি মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল তৈরি করা। এই আলোচনাগুলো ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের অধিকাংশ সেবা ও অবকাঠামো বেসরকারিকরণের জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের দীর্ঘদিনের প্রস্তাবনার অংশ, যাকে তারা ‘নতুন গাজা’ পরিকল্পনা হিসেবে আখ্যা দেয়।

কিন্তু সমালোচকরা অভিযোগ করেছেন, এই পরিকল্পনা ফিলিস্তিনিদের পাশ কাটিয়ে চলে, জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে উপেক্ষা করে এবং ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতিকে বৈধতা দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। এই প্রতিবেদন প্রকাশ পেল যখন গাজায় শান্তির অগ্রগতি থমকে গেছে। ইসরাইল এখনও ভূখণ্ডটির বড় অংশ দখল করে রেখেছে।

অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ‘যুদ্ধবিরতি’ ঘোষণা করা হলেও সাহায্য প্রবেশাধিকার এখনও ব্যাপকভাবে সীমিত। ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, ওই যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে ইসরাইলি হামলায় ৭০০-এর বেশি মানুষ নিহত এবং প্রায় ২ হাজার আহত হয়েছে।

এফটি জানিয়েছে, তারা যে খসড়া প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করেছে, সেখানে একটি ‘নিরাপদ ও ট্রেসযোগ্য সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যবস্থা’ এবং ‘বন্দর-নেতৃত্বাধীন অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেমের’ পাশাপাশি হালকা শিল্প ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্ল্যাটফর্ম তৈরির পরিকল্পনা বর্ণিত হয়েছে। নথিটির খসড়া কে তৈরি করেছেন বা আলোচনা কতদূর এগিয়েছে তা স্পষ্ট নয়। ডিপি ওয়ার্ল্ডের একজন মুখপাত্র সংবাদপত্রটিকে জানিয়েছেন, তারা কোনো আলোচনার বিষয়ে অবগত নন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এফটির মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। দুবাই সরকারের মালিকানাধীন ডিপি ওয়ার্ল্ড বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান। ৮০টির বেশি দেশে প্রতিদিন বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রায় ১০ শতাংশ পরিচালনা করে তারা।

এফটি আরও জানিয়েছে, এরই মধ্যে নিরাপত্তা, অর্থ ও প্রযুক্তি খাতের কোম্পানিগুলোর সঙ্গেও গাজার পুনর্গঠন সংক্রান্ত আলোচনা পর্দার আড়ালে চলছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাতিসংঘ ও বিশ্বব্যাংকের একটি যৌথ মূল্যায়নে বলা হয়েছে, আগামী ১০ বছরে গাজার পুনর্গঠনে ৭১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হবেÑ যার মধ্যে আগামী ১৮ মাসেই লাগবে ২৩ বিলিয়ন ডলার।


  বিষয়:   ফিলিস্তিন  ইউরোপ  ইসরাইল  মিত্র  ভিক্টর  অরবান 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: