আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলের ছোট্ট এক দেশ নিরক্ষীয় গিনি। ইংরেজিতে ইকোটোরিয়াল গিনি। এর সাবেক রাজধানী মালাবো। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এ শহরটি বেশ অদ্ভুত, কারণ মূল ভূখণ্ডে নয়, শহরটি আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে বিয়োকো নামের একটি দ্বীপে গড়ে উঠেছে। দেশের প্রশাসনিক কেন্দ্র হয়েও মূল ভূখণ্ড থেকে এমন বিচ্ছিন্নতাই মালাবোকে বিশ্বের অন্যান্য শহর থেকে আলাদা করে তুলেছে। শহরটি একদিকে যেমন ঔপনিবেশিক অতীতের স্মৃতি বহন করে, অন্যদিকে আধুনিক আফ্রিকার পরিবর্তনের প্রতিচ্ছবিও তুলে ধরে।
শহরটির শুরুটা হয়েছিল ব্রিটিশদের হাতে, তবে পরবর্তীকালে স্প্যানিশ শাসনের অধীনে এর ব্যাপক বিস্তার ঘটে। স্বাধীনতার পর মালাবো দেশের নতুন প্রশাসনিক প্রাণকেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। একসময় দাস ব্যবসা প্রতিরোধেও শহরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। স্পেনের শাসনামলে শহরটির নাম ছিল সান্তা ইসাবেল। আজও শহরের স্থাপত্যে সেই ঔপনিবেশিক ছাপ স্পষ্টভাবে দেখা যায়—বিশেষ করে পুরোনো ক্যাথেড্রাল, সরকারি ভবন ও ঐতিহ্যবাহী বাড়িগুলোতে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মালাবোর অর্থনীতির চিত্রও বদলে গেছে। আগে যা ছিল কোকো, কফি ও কাঠ রফতানির ওপর নির্ভরশীল, এখন সেখানে প্রধান চালিকাশক্তি হলো তেল ও গ্যাস শিল্প। এর ফলে দেশটিতে বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে এবং বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষের আগমনে শহরটি আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে।
এই দূরবর্তী দ্বীপ-শহরে গড়ে উঠেছে ছোট কিন্তু প্রাণবন্ত এক বাংলাদেশি কমিউনিটি। সংখ্যায় তারা প্রায় ২০০ জন। ব্যবসা কিংবা চাকরি—নানা পেশায় তারা সেখানে যুক্ত। সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সংস্কৃতিতে থেকেও তারা নিজেদের ভাষা, ঐতিহ্য আর খাদ্যাভ্যাস সগৌরবে ধরে রেখেছেন।
সেখানে বসবাসরত মোহাম্মদ হোসাইন জানালেন, এখানে জীবনটা একদম আলাদা, যেহেতু সবকিছুই দ্বীপকেন্দ্রিক। অনেক কিছু পাওয়া কঠিন হলেও আমরা একে অপরকে সহযোগিতা করে মিলেমিশে থাকি। দেশ থেকে দূরে থাকলেও বাংলাদেশকে সবসময় মনে পড়ে।
উল্লেখ্য, মালাবো দীর্ঘদিন ধরে নিরক্ষীয় গিনির রাজধানী ছিল। ১৯৬৮ সালে স্বাধীনতার পর থেকেই এটি প্রশাসনিক রাজধানী হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। তবে ২০১৭ সালে সরকার মূল ভূখণ্ডে নতুন পরিকল্পিত শহর ওইয়ালাকে রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর ধীরে ধীরে প্রশাসনিক কার্যক্রম সেখানে স্থানান্তর শুরু হয়।
নিরক্ষীয় গিনি প্রজাতন্ত্র মধ্য আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত একটি স্প্যানিশভাষী দেশ। এর মূল ভূখণ্ড হলো রিও মুনি, আর সাবেক রাজধানী মালাবো অবস্থিত বিওকো দ্বীপে। খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসে সমৃদ্ধ এই দেশটি সাব-সাহারান আফ্রিকার অন্যতম প্রধান তেল উৎপাদনকারী। তবে সম্পদের বৈষম্য এখানে বেশ প্রবল। দেশের পশ্চিমে রয়েছে গিনি উপসাগর, আর সীমান্তে রয়েছে ক্যামেরুন ও গ্যাবন। অর্থনীতি মূলত পেট্রোলিয়াম, প্রাকৃতিক গ্যাস, বনজ সম্পদ ও মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল।
১৯৭৯ সাল থেকে ‘তেওদোরো ওবিয়াং এনগুয়েমা এমবাসোগো’ দেশটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, যা তাকে বিশ্বের দীর্ঘতম সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা রাষ্ট্রপ্রধানদের একজন করে তুলেছে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দিক থেকেও দেশটি অনন্য—ট্রপিক্যাল রেইনফরেস্ট, আগ্নেয়গিরি ও সুন্দর সমুদ্রসৈকত যে কাউকে মুগ্ধ করবে। যদিও পর্যটকদের জন্য এটি কিছুটা দুর্গম, তবুও এর সংস্কৃতি ও প্রকৃতি সহজেই বিস্ময় জাগায়। মালাবোর জনসংখ্যা বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত, যেমন ফাং, বুবি প্রভৃতি। ফলে এখানে সংস্কৃতির এক অনন্য মিশ্রণ দেখা যায়—ভাষা, সংগীত, খাদ্য ও উৎসব সবকিছুতেই তার প্রতিফলন রয়েছে।
/ইউএমএইচ