সকাল শুরু করার অভ্যাসের সঙ্গে কফির সম্পর্ক বহুদিনের। কাজের চাপ, ঘুম ঘুম ভাব কাটানো কিংবা শুধু অভ্যাসের কারণেই অনেকেই নিয়মিত কফি পান করে থাকেন। তবে টানা ৩০ দিন কফি পান বন্ধ করলে শরীরে কী ধরনের পরিবর্তন আসে—এ নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আলোচনা ও দাবি ছড়িয়ে পড়েছে। চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদদের মতে, এসব পরিবর্তন কোনো জাদুকরি রূপান্তর নয়, বরং ক্যাফেইন হঠাৎ বন্ধ হওয়ার পর শরীরের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া এবং ধীরে ধীরে মানিয়ে নেওয়ার একটি প্রক্রিয়া।
বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কফি বন্ধ করার ১২ থেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই শরীরে ক্যাফেইনের প্রভাব কমতে শুরু করে। প্রথম ১ থেকে ৩ দিনকে সবচেয়ে কঠিন ধাপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ সময় মাথাব্যথা সবচেয়ে সাধারণ উপসর্গ হিসেবে দেখা দেয়, যা অনেক সময় তীব্র আকার ধারণ করতে পারে। এর পাশাপাশি অতিরিক্ত ক্লান্তি, ঘুম ঘুম ভাব, মনোযোগ কমে যাওয়া, কাজের গতি ধীর হয়ে যাওয়া এবং মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে বমি বমি ভাব, পেশিতে হালকা ব্যথা বা ফ্লু-এর মতো অনুভূতিও হতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, ক্যাফেইন মস্তিষ্কে অ্যাডিনোসিন নামক রাসায়নিকের কার্যকারিতা নিয়ন্ত্রণ করে, এটি হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে মস্তিষ্কে সাময়িক ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়, যার ফলেই এসব উপসর্গ দেখা দেয়।
তবে ৩ থেকে ৭ দিনের মধ্যে শরীর ধীরে ধীরে অভিযোজন প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করে। এই সময় মাথাব্যথা ও শারীরিক অস্বস্তি অনেকটাই কমে আসে। অনেকেই লক্ষ্য করেন যে ঘুমের মান আগের তুলনায় ভালো হতে শুরু করে এবং গভীর ঘুম পাওয়া যায়। দিনের বেলায় ঝিমুনি বা ব্রেইন ফগ ধীরে ধীরে হ্রাস পায়। মনোযোগও আগের চেয়ে কিছুটা স্থিতিশীল হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পর্যায়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখান থেকেই শরীর ক্যাফেইন ছাড়াই স্বাভাবিকভাবে কাজ করার জন্য নিজেকে পুনরায় সামঞ্জস্য করতে শুরু করে।
৭ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে শরীর অনেকটাই স্থিতিশীল অবস্থায় পৌঁছে যায়। এ সময়ে শক্তির ওঠানামা কমে আসে এবং অনেকের ক্ষেত্রে সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর স্বাভাবিক শক্তি অনুভূত হতে শুরু করে। কফির প্রতি তীব্র আকর্ষণও ধীরে ধীরে কমে যায়। তবে চিকিৎসকরা সতর্ক করে বলেন, এই পরিবর্তনগুলো শুধু কফি ছাড়ার কারণে নয়, বরং ব্যক্তির দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত পানি পান, মানসিক চাপ এবং ঘুমের মানও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
একদিকে ১৫ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে শরীর তুলনামূলকভাবে ক্যাফেইন ছাড়া জীবনযাত্রার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। অনেকেই এই সময়ে লক্ষ্য করেন যে সকালে কৃত্রিম উত্তেজক ছাড়াই স্বাভাবিকভাবে কাজ শুরু করা সম্ভব হচ্ছে। ঘুমের চক্র নিয়মিত হতে থাকে এবং রাতের ঘুম আরও গভীর হয়।
কিছু গবেষণা ও পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, অতিরিক্ত কফি নির্ভরতা কমে গেলে উদ্বেগ বা হার্টবিট দ্রুত হওয়ার মতো সমস্যাও কিছু ক্ষেত্রে কমে যেতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা এটিও স্পষ্ট করে বলেন যে “ডোপামিন রিসেট” বা শরীরের শক্তি স্থায়ীভাবে বেড়ে যাওয়ার মতো ধারণাগুলোর কোনো শক্ত বৈজ্ঞানিক ভিত্তি এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
চিকিৎসক ও ডায়েটিশিয়ানদের মতে, কফি ছাড়ার প্রভাব ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন হয়। কারও ক্ষেত্রে ৩–৪ দিনের মধ্যেই মূল উপসর্গ কমে যায়, আবার কারও ক্ষেত্রে এক সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। সাধারণভাবে ৭ থেকে ৯ দিনের মধ্যেই বেশিরভাগ শারীরিক অস্বস্তি কেটে যায় এবং শরীর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে বলে তারা জানান। তারা আরও পরামর্শ দেন, কফি ছাড়ার সময় পর্যাপ্ত পানি পান, পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ, পর্যাপ্ত ঘুম এবং ধীরে ধীরে অভ্যাস পরিবর্তন করলে এই প্রক্রিয়া অনেক সহজ হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টানা ৩০ দিন কফি না খেলে শরীর প্রথমে কিছুটা প্রতিক্রিয়া দেখালেও তা স্থায়ী কোনো ক্ষতি করে না। বরং এটি শরীরের একটি স্বাভাবিক অভিযোজন প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে ক্যাফেইন নির্ভরতা কমে এবং শরীর ধীরে ধীরে নিজের স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসে।
/ইউএমএইচ