প্রযুক্তি বিশ্বে স্মার্টফোন নিয়ে আমাদের উন্মাদনার শেষ নেই। তবে স্মার্টফোন সচল রাখার প্রধান অনুষঙ্গ ‘চার্জিং কেবল’ সম্ভবত আমাদের জীবনের সবচেয়ে অবহেলিত প্রযুক্তি। কেবলটি নষ্ট হয়ে ফোন বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আমরা এর গুরুত্ব অনুধাবন করি না। অথচ আমাদের কিছু ছোট ভুল অভ্যাসই এই চার্জিং কেবল দ্রুত নষ্ট হওয়ার প্রধান কারণ।
সম্প্রতি ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ডের সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড লাইফ সাইকেল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রতিষ্ঠাতা মাইকেল পেখট এবং টেকসই উন্নয়ন বিষয়ক প্রতিষ্ঠান ‘আইফিক্সিটে’র কাইল ওয়েইন্স চার্জিং কেবলের আয়ু ও স্থায়িত্ব নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
কেন ভেঙে যায় চার্জিং কেবল?
বিশেষজ্ঞদের মতে, চার্জিং কেবলের সংযোগস্থলে অর্থাৎ যেখানে প্লাগটি যুক্ত থাকে, সেখানেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়। ওর্চেস্টার পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক রবার্ট হায়ার্স বিষয়টিকে একটি ‘পেপার ক্লিপের’ সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি জানান, একটি ক্লিপকে একই জায়গায় বারবার বাঁকালে যেমন এর ভেতরের পরমাণুর বন্ধন ভেঙে যায় এবং এক পর্যায়ে তা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, চার্জিং কেবলের ভেতরের সূক্ষ্ম ধাতব তারগুলোর ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। একে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘ডিসলোকেশন’।
যেসব অভ্যাস কেবলের আয়ু কমিয়ে দিচ্ছে
গবেষণায় দেখা গেছে, কেবলের সক্ষমতা নষ্ট হওয়ার জন্য আমাদের দৈনন্দিন কিছু অভ্যাস সরাসরি দায়ী:
সংযোগস্থলে টান দেওয়া : চার্জার খোলার সময় অনেকে কানেক্টর না ধরে তারের লম্বা অংশে টান দেন। এতে কানেক্টরের ভেতরের সূক্ষ্ম সংযোগ ছিঁড়ে যায়।
তীক্ষ্ণ কোণে বাঁকানো : বিছানায় শুয়ে ফোন চার্জে দিয়ে ব্যবহারের সময় কেবলটি প্রায়ই তীক্ষ্ণ কোণে বেঁকে থাকে। এটি কেবলের স্থায়ী ক্ষতি করে।
অতিরিক্ত চাপ বা ওজন : গাড়ির কাপহোল্ডারে ফোন রাখার সময় ফোনের পুরো ওজন অনেক সময় কেবলের সংযোগস্থলের ওপর পড়ে। এ ছাড়া ছোট কেবল টেনে লম্বা করে সকেটে পৌঁছানোর চেষ্টা করলেও তারের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়।
কেবল জড়ানোর পদ্ধতি কি আদৌ গুরুত্বপূর্ণ?
সাধারণত ধারণা করা হয়, কেবল খুব টাইট করে পেঁচালে তা নষ্ট হয়ে যায়। তবে মাইকেল পেখট এই ধারণাকে কিছুটা উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি জানান, বড় বড় কম্পিউটার কোম্পানির গবেষণায় দেখা গেছে, কেবল কীভাবে প্যাঁচানো হচ্ছে তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো এর কানেক্টরগুলো কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। পাতলা ও নমনীয় চার্জিং কেবলের ক্ষেত্রে 'ওভার-আন্ডার' পদ্ধতিতে জড়ানো খুব একটা জরুরি নয়, যতক্ষণ না সেটি তীক্ষ্ণভাবে ভাঁজ করা হচ্ছে।
দীর্ঘস্থায়ী সমাধানে ‘ব্রেইডেড’ কেবল
বিশেষজ্ঞরা জানান, সাধারণ প্লাস্টিক কেবলের চেয়ে ‘ব্রেইডেড’ বা নাইলনের বেণি করা কেবলগুলো অনেক বেশি টেকসই। এই কেবলগুলোতে তারের ওপর শক্তিশালী টেক্সটাইল বা নাইলনের জাল বোনা থাকে, যা বাইরের চাপ ও জট থেকে তারকে রক্ষা করে। এমনকি বর্তমান সময়ে অ্যাপলসহ বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের ডিভাইসের সাথে এই ধরনের উন্নত মানের কেবল সরবরাহ শুরু করেছে।
পরিবেশ ও পকেটের সুরক্ষা
কাইল ওয়েইন্সের মতে, কেবলের যত্ন নেওয়া কেবল ব্যক্তিগতভাবে সাশ্রয়ী নয়, বরং এটি পরিবেশের জন্যও মঙ্গলজনক। অকালে নষ্ট হওয়া কেবলগুলো বিপুল পরিমাণ ইলেকট্রনিক বর্জ্য তৈরি করে, যা পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ : চার্জিং কেবল খোলার সময় সর্বদা প্লাগ বা কানেক্টর ধরুন, কেবলকে কখনোই ৯০ ডিগ্রি কোণে বা তার বেশি বাঁকাবেন না এবং সম্ভব হলে উন্নত মানের ব্রেইডেড কেবল ব্যবহার করুন। সামান্য সচেতনতাই আপনার চার্জিং কেবলের স্থায়িত্ব কয়েক বছর বাড়িয়ে দিতে পারে।
/ইউএমএইচ