গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে হস্তান্তরের আগেই প্রায় সোয়া দুই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বেকরীরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ফ্লাড শোল্ডারের বিভিন্ন অংশে বহু ফাটল দেখা দিয়েছে। নিম্নমানের কাজ দেখে শুরুতেই অভিযোগ করেছিলেন স্থানীয়রা। কিন্তু কোনো কর্ণপাত করেননি সংশ্লিষ্টরা। চরম আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠায় আছেন ওই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা।
এলজিইডি অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলার বেলকা ইউনিয়নের বেকরীরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ফ্লাড শ্লেডার নির্মাণ কাজের দায়িত্ব পান রংপুরের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স তাহিতি অ্যান্ড জেডএইচডি (জেবি)। কাজটি করেন সুন্দরগঞ্জে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পলাশ এন্টারপ্রাইজ। কাজটি শুরু করার তারিখ ছিল ২০২১ সালের ২০ ডিসেম্বর। শেষে করার কথা ছিল ২০২৩ সালের ১৯ জুন। সেই কাজ শেষ করা করা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে। বিল্ডিং হস্তান্তর করা হয় চলতি মাসের ১৪ তারিখে। কাজটির চুক্তিমূল্য ছিল ২ কোটি ১২ লাখ ৯৩ হাজার ৯৬২ টাকা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, সুদৃশ্য একটি তিন তলা ভবন। ওঠানামা করার জন্য সিঁড়ি আছে দুইটি। একটি রেলিং সিঁড়ি, আরেকটি স্বাভাবিক সিঁড়ি। তবে রেলিং সিঁড়িটা নীচ থেকে একবারে বিল্ডিং-এর তৃতীয় তলায় সংযোগ দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় তলা পড়াশোনার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। আর নীচ তলা ব্যবহৃত হবে বন্যায় আশ্রয় কেন্দ্র হিসেবে। পুরো রেলিং সিঁড়িতে অসংখ্য ফাটল দেখা গেছে। বিল্ডিং-এর পলেস্তারা এখনই ফেটে চৌচির হয়েছে। বিশাল ফাটল দেখা গেছে পানির ট্যাংকিতেও। বিদ্যুৎ-এর লাইনগুলো বিপদজনক অবস্থায় দেখা গেছে। বোর্ডে সুইচের স্থানগুলো ফাঁকা। অসাবধানতা বশত যে কেউ হাত দিলে ঘটতে পারে দুর্ঘটনা। এদিকে কোনো ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে রেলিং সিঁড়িতে থাকা কেঁচি গেটটা বন্ধ করে রাখা হয়েছে।
বিষয়গুলো নিয়ে ঠিকাদার এবং এলজিইডি অফিসের প্রধান তপন কুমার চক্রবর্তীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেছেন। তারা কোনো গুরুত্ব দেননি। এমনকি ইউএনও, টিও, এটিওকে অনেকবার বিদ্যালয়ে ডেকেছেন তারা। ২৪৯ শিক্ষার্থী নিয়ে আতঙ্কে পাঠদান কার্যক্রম চালাচ্ছেন বলেও জানা গেছে।
স্থানীয়রা জানান, এটা কেবলমাত্র বিদ্যালয় নয়। বন্যার সময় এ অঞ্চলের মানুষজন এতে আশ্রয় নেবে। আশ্রয় নেবে গবাদিপশুও। বানভাসি মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল এ আশ্রয়কেন্দ্রটি। কিন্তু সেটিতে যেভাবে ফাটল দেখা দিয়েছে তাতে মনে হচ্ছে সরকারের টাকাগুলো যেন বানের জলে ভেসে না যায়।
তারা আরও জানান, শুরু থেকেই ঠিকাদারের লোকজন নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে কাজ করছিলেন। ইঞ্জিনিয়ার অফিসের লোকজনদের এখানে আসতে তেমন একটা দেখিনি। সে কারণে অনিয়মের কথাগুলো ঠিকাদারের লোকজনকে বলেছিলাম। উল্টো তারাই আমাদের ধমক দিয়েছেন। আমরা তো অত বুঝি না। কাজ শেষ হতে না হতেই সিঁড়িতে যে ফাটল দেখা দিয়েছে তাতে মনে হয় ভিতরে না জানি আরও কত অনিয়ম হয়েছে। সবমিলিয়ে এ বিল্ডিং নিয়ে চরম আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠায় আছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও এলাকার সাধারণ মানুষজন।
রামডাকুয়া গ্রামের বাসিন্দা মো. রমজান আলী বলেন, ‘এই স্কুলে আমার বাচ্চা ক্লাস ওয়ানে পড়ে। বাচ্চা নিয়ে রেলিং সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠার সময় দেখি সিঁড়িগুলা ফাটা। তারপরও ভয়ে ভয়ে উপরে উঠি। এরপরে উপরে উঠে দেখি তালা দেওয়া। পরে আবার নীচে নামি। পরে অন্য সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠি বাচ্চা নিয়ে। পরে স্যারদের বললাম সিঁড়ির মুখ বন্ধ ক্যা। তখন তারা বলেন, সিঁড়িগুলোতে ফাটল দেখা দিয়েছে।’
বিদ্যালয়ের পাশেই বাড়ি মো. খলিলুর রহমানের (৬৫) বলেন, ‘এই স্কুলে ছেলেমেয়েরা যতক্ষণ থাকে ততক্ষণ জিউ হামার হাতোত থাকে। না জানি কখন কোন বিপদ হয়। আরও বন্যা আইলে কী যে হইবে সেই টেনশনও মাথায় ঘুরপাক করে। ওরা কাজ খারাপ করছিলো। বিধায় আমরা গ্রামের মানুষজন বলছিলাম। তা ওমরা শোনে নাই। ওমরা ওমার মতি করি কাজ করি গেইছে। হামার কথা শোনে নাই। শুরুতে যখন সিঁড়ি ডাবাইছে তখন একটা সিঁড়ি কিছুদূর যাওয়ার পরে ভাঙগি গেইছলো। সেটা আর ডাবায় নাই।’
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক তফছিরা চৌধুরী বলেন, ‘বিল্ডিং এর কাজ শেষ হয়েছে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে। আর অফিসিয়ালি ভাবে বিল্ডিং হস্তান্তর করা হয়েছে এ মাসের গত ১৪ তারিখে। তবে এ বিল্ডিংয়ে ওঠার আগে থেকেই এ ফাটলগুলো ছিল। সে কারণে রেলিং সিঁড়িটা বন্ধ রেখেছি। ছোটো বাচ্চা কখন কোনো দুর্ঘটনা ঘটে। বিষয়গুলো নিয়ে আমি একাধিকবার ইঞ্জিনিয়ার অফিসের তপন স্যার, মিলন স্যার এবং ঠিকাদারকে বলেছি। তারা খালি বলেন আসছি। কিন্তু আসেন না।’
তিনি আরও বলেন, ‘তখন আমি সহকারী শিক্ষক ছিলাম। তারপরেও মাঝে মধ্যেই কাজ দেখতে এসেছিলাম। বলেছিলাম কাজে অনিয়ম হচ্ছে। কিন্তু কোনো গুরুত্ব দেননি তারা। পরে দেখা যায় তৎকালীন হেড স্যার আমাকেই বকা দিতেন। কেন আমি এ বিষয়ে কথা বলি।’
বেলকা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মাওলানা মো. ইব্রাহীম খলিলুল্লাহ বলেন, ‘বিল্ডিংয়ের বিভিন্ন অংশে ফাটল হয়েছে বিষয়টি আপনার মাধ্যমে জানলাম। তবে কাজটা শুরু করার পরে কয়েকবার গিয়েছিলাম। তখন কাজে অনিয়ম দেখে এলজিইডি অফিসে কথাও বলেছিলাম। তারা কেন জানি গুরুত্ব দেননি। বিল্ডিংয়ের কাজটি শেষ করতে অনেক সময় লাগিয়েছেন তারা। এ নিয়েও বারবার কথা বলেছি, তারা যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো না বলেই সময় পার করেছেন।’
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পলাশ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী প্রিতম এ বিষয়ে নিউজ করতে নিষেধ করেন। নিউজ হলে তাদের রেপুটেশন খারাপ হওয়ার কথাও তিনি বলেন।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নুর মোহাম্মদ বলেন, কেউ আমাকে জানায়নি। আপনার মাধ্যমে জানলাম। খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেব।
তদারকির দায়িত্বে থাকা উপ-সহকারী প্রকৌশলী কাজী মাহবুবুর রহমান মিলন বলেন, এ ধরনের কাজে হেয়ার ক্রাক হয়ে থাকে অনেক সময়। কিউরিন খারাপ হলে এ ধরনের সমস্যা হয়। তবে এতে ভয়ের কোনো কারণ নেই। তারপরেও বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখছি। সে রকম হলে আবারও ঠিক করে দেওয়া হবে।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী তপন কুমার চক্রবর্তী এ বিষয়ে কোনো মতামত দিতে রাজি হননি।
সময়ের আলো/জোই