কুড়িগ্রামের উলিপুরে কেবলকৃষ্ণ জুম্মাহাটের আমজাদ হোসেনের বাড়িতে ঢুকতেই চোখে পড়বে পুরোনো দিনের কয়েকটি গ্রামোফোন। কোনোটির সঙ্গে বড় চোঙা, কোনোটির পাশে হাতল। কাঠের র্যাকে সারি সারি সাজানো গানের রেকর্ড। একটু পরই একটা রেকর্ড বসিয়ে হাতল ঘুরিয়ে দেন আমজাদ হোসেন। পরক্ষণেই পুরোনো দিনের গান...‘চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে, আমরা ভেবে করবও কী...।’ গান শেষ হয়। কিন্তু আমজাদ হোসেনের গল্প শেষ হয় না।
নব্বই দশকের প্রায় পাঁচ হাজার গানের মধ্যে হাতে ঘোরানো গ্রামোফোন -২২ পিচ, এলপি রেকর্ড - ১ হাজার পিচ, ছোট ইপি রেকর্ড - ৩ হাজার পিচ, ক্যাসেটের সেট-১৪ পিচ, ইলেকট্রনিক কলের গান -১৫ পিচসহ পুরোনো গানের প্রায় ৫ হাজার গানের রেকর্ড তার সংগ্রহে রয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় তার সংগ্রহের সব রেকর্ডিং সচল রয়েছে।
কোন রেকর্ডটি কোথা থেকে সংগ্রহ করেছেন, কোন শিল্পীর কণ্ঠে কোন গান রয়েছে, কোন গ্রামোফোনের কোন যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়েছিল, কীভাবে সেটি আবার সচল করেছেন, বলতে বলতে ফিরে যান কয়েক দশক আগের দিনগুলোতে। এসব গ্রামোফোন এখন তার কাছে শুধু গান শোনার যন্ত্র নয়, হারিয়ে যাওয়া সময়ের স্মৃতি।
উনিশ শতকের শেষ দিকে গ্রামোফোন তৈরি হওয়ার পর বিশ শতকের বড় একটি সময়জুড়ে এটি ছিল গান শোনার অন্যতম জনপ্রিয় মাধ্যম। পরে রেডিও, ক্যাসেট, সিডি, কমপ্যাক্ট ডিস্ক, মোবাইলফোনসহ নানা প্রযুক্তির কাছে হারিয়ে যায় সেই যন্ত্র। একসময় যে গ্রামোফোনের চোঙা দিয়ে গান ছড়িয়ে পড়ত মানুষের ঘরে ঘরে, সেটিই এখন অনেকের কাছে কেবল পুরোনো সিনেমার দৃশ্য কিংবা জাদুঘরের স্মৃতি। কিন্তু আমজাদ হোসেনের বাড়িতে সেই সময় এখনো বেঁচে আছে।
আমজাদের বাবার মাইকের ব্যবসা থেকে কলের গানের নেশা এই গল্পের শুরু কয়েক দশক আগে। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমজাদ হোসেনের বাবা দেলওয়ার হোসেন এলাকায় ‘জনতা মাইক সার্ভিস’ নামে মাইকের ব্যবসা শুরু করেন। তখন আমজাদের বয়স ১২ বছর। মাইক ভাড়া নেওয়ার পর কখনো অপারেটর পাওয়া না গেলে কিশোর আমজাদকেই পাঠানো হতো।
আমজাদ হোসেন মাইক চালাতে গিয়েই কলের গানের সঙ্গে তার পরিচয়। পরে সেই পরিচয় কখন যে ভালো লাগায়, আর ভালো লাগা কখন নেশায় পরিণত হয়েছে, তা আর টের পাননি তিনি। পরে যেখানেই পুরোনো গানের রেকর্ডের খবর পেয়েছেন, সেখানেই ছুটে গেছেন। রেকর্ডটি পছন্দ হলে দাম নিয়ে খুব একটা ভাবেননি। একবার আব্বাসউদ্দীন আহমদের একটি গানের রেকর্ডের জন্য ৫ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। তখনকার সময়ে এই টাকা তার জন্য কম ছিল না।
আমজাদ হোসেন ১৯৯০ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বেসামরিক বিভাগে পেইন্টার পদে চাকরি নেন। তখন বিশ্বের অনেক দেশেই গ্রামোফোনের বাজার প্রায় শেষ। উৎপাদনও বন্ধের পথে। বাংলাদেশেও নতুন প্রযুক্তির কাছে ধীরে ধীরে জায়গা হারাচ্ছিল কলের গান। কিন্তু আমজাদের আগ্রহ তখন আরও বেড়েছে। তিনি অফিস সেরে পুরোনো গ্রামোফোন ও গানের রেকর্ডের খোঁজে ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ানো। পুরান ঢাকা, মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকার অলিগলিতে ঘুরে ঘুরে সংগ্রহ করেছেন তার প্রিয় যন্ত্র ও রেকর্ড। চাকরির বেতন থেকে সংসারে কম টাকা পাঠিয়ে বাকিটা দিয়ে রেকর্ড কিনেছেন। এভাবেই একসময় তার সংগ্রহে জমা হয় প্রায় ৫ হাজার রেকর্ড।
আমজাদ হোসেনের সহধর্মিণী মোছলেমা বেগম বলেন, সবাই চাকরি করে টাকা সঞ্চয় করেছে। আর আমার স্বামী ক্যাসেট প্লেয়ার সংগ্রহ করেছেন। তার কোনো সঞ্চয় নেই। এখন আমি অসুস্থ, অথচ চিকিৎসা করতে পারি না। গ্রামোফোনের জন্য লোকটা এতো ত্যাগ করলেন সেই ক্যাসেট রাখবার র্যাক আমাদের ঘরে নাই। অযত্নে অবহেলায় সব নষ্ট হচ্ছে।
আমজাদ হোসেন বলেন, অবসরে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ভাষণের রেকর্ড বাজাতাম। ২০২৪ সালে একদিন খবর পেলাম দুষ্কৃতকারীরা এই রেকর্ডগুলো ধ্বংস করে দেবে। এই ভয়ে রেকর্ড তিনটি পলিথিনে মুড়িয়ে মাটির নিচে পুঁতে রাখি। পরে আবার সেগুলো তুলে সংরক্ষণের চেষ্টা করি। এই দুর্লভ সংগ্রহগুলো সংরক্ষণের জন্য সরকারি কিংবা বেসরকারিভাবে একটি সংগ্রহশালা নির্মাণের দাবি জানাই।
ভাওয়াইয়া থেকে স্বাধীনতার ভাষণ, সংগ্রহে ইতিহাসের নানা দলিল ১৯৯৯ সালে মিরপুরের কালুবাড়ি-বাউনিয়া এলাকায় ‘জনতা অডিও-ভিডিও সেন্টার’ নামে একটি দোকানও দেন তিনি। সেখানে গানের রেকর্ড ও ভিডিও ক্যাসেট ভাড়া দেওয়া হতো। সেই সময়ের একটা ঘটনা এখনো মনে আছে তার। পরে নতুন মোড়ক তৈরি করে রেকর্ড তিনটি সংরক্ষণ করেন তিনি।
২০১৭ সালের ৫ জুলাই চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর আমজাদ হোসেন ফিরে আসেন নিজের গ্রামে। বাড়ির একটি টিনের ঘরেই তৈরি করেন সংগ্রহশালা। সাধ্যমতো কাঠের র্যাক বানিয়ে সাজিয়ে রাখেন গ্রামোফোন ও রেকর্ড। প্রতিদিন সেগুলোর যত্ন নেন। কোনো গ্রামোফোনে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে নিজেই সেটি ঠিক করার চেষ্টা করেন। প্রয়োজন হলে পুরোনো যন্ত্রাংশের বিকল্প পার্টস তৈরি করে নেন।
সরেজমিনে, বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) সকালে আমজাদ হোসেনের বাসায় গিয়ে তাকে সখের গ্রামোফোনের ক্যাসেট সংরক্ষণ করার জন্য কাগজ কেটে খাপ তৈরি করতে দেখা যায়। এসময় তিনি একে একে তার তিনটি কক্ষে এসব সংগ্রহশালা ঘুরিয়ে দেখান। টিনশেড ঘরে কোনো যন্ত্র বাঁশের র্যাকে রাখা, কোনোটি বিছানার পাশে আবার কোনোটি মাটিতে বস্তা বিছিয়ে রাখা হয়েছে। এতে ইতিহাসের পুরাতন এই ঐতিহ্যবাহী কলের গান যন্ত্র ও রেকর্ড প্লেয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তিনি বলেন, আমার প্রতিদিনের কাজ হলো গ্রামোফোনগুলো পরিষ্কার করা। বাজার থেকে মশার কয়েলের খালি প্যাকেট সংগ্রহ করে মোড়ক বানিয়ে শিল্পী ও অ্যালবামের নাম লিখে রেকর্ডগুলো সংরক্ষণ করি।
আমজাদ হোসেনের সংগ্রহে বিশেষ জায়গা করে আছে উত্তরবঙ্গের পুরোনো দিনের ভাওয়াইয়া গান। আব্বাসউদ্দীন, আব্দুল আলীমসহ বিভিন্ন শিল্পীর কণ্ঠে ধারণ করা অনেক পুরোনো ভাওয়াইয়া গান রয়েছে তার সংগ্রহে। এমন কিছু গানও আছে, যেগুলো এখন আর সহজে শোনা যায় না। আব্বাসউদ্দীন, আব্দুল আলীম, হৈমন্তী শুক্লা, কিশোর কুমার, আশা ভোঁসলে, অনুপ ঘোষাল, অনুপ জলোটা, পঙ্কজ উদাসসহ আরও অনেক শিল্পীদের।
সময়ের আলো/জোই