ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকার বেশি ঋণ নেওয়ায় বাধগ্রস্ত হচ্ছে বেসরকারি খাত। বিশেষ করে নতুন বিনিয়োগে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। তা ছাড়া নতুন টাকা ছাপিয়ে সরকর যে হারে ঋণ নিচ্ছে তাতে মূল্যস্ফীতির ওপরও চাপ বাড়ছে। অপরদিকে সরকারের মোট ঋণ আরও বেড়েই চলেছে।
জানা গেছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল সরকার। গত বছরের জুলাই থেকে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত সরকার মোট ঋণ নিয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ৭৬১ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার ১০৮ শতাংশ। এর মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার (গত ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত) ঋণ নিয়েছিল ৬৮ হাজার ২২৯ কোটি টাকা। দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ৫২ দিনে নতুন সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ৪৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, যা পুরো অর্থবছরের বাজেটীয় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
চলতি অর্থবছরের এখনও আড়াই মাস বাকি। তাই ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ কোথায় গিয়ে ঠেকে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। সরকার আরও ঋণ করলে বেসরকারি খাত চাঙ্গা করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তা বাধাগ্রস্ত হবে। কারণ বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি ইতিমধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত তথ্যে দেখা যায়, গত অর্থবছরে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় সরকারের ঋণের স্থিতি ছিল ৪ লাখ ৫২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা, যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৪১ হাজার ৬৫৯ কোটি টাকায়। একই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার ৭ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত ব্যাংক খাত থেকে সরকারের মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬৩ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা।
এদিকে নতুন টাকা ছাপিয়েও ঋণ নিচ্ছে সরকার। মূলত সরকারের হিসাব রক্ষণাবেক্ষণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। রাজস্ব আয় ও ঋণ পেলে তা সরকারের হিসাবে জমা হয়। সরকারের চাহিদামতো বেতন-ভাতা, ঋণ ও সুদ পরিশোধ, ভর্তুকি, প্রকল্প খরচের জন্য ঠিকাদারদের সেই হিসাব থেকে বিল পরিশোধ করা হয়। মাঝেমধ্যে সরকারের সেই হিসাব শূন্য হয়ে পড়ে। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারের ওয়েজ অ্যান্ড মিনস ও ওভারড্রাফট দুটি হিসাবে ১২ হাজার কোটি করে ২৪ হাজার কোটি টাকা ঋণের সীমা দিয়ে রেখেছে।
আয়-ব্যয়ের ঘাটতি মেটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরকারের স্বল্পমেয়াদি অগ্রিম ঋণ নেওয়াই হচ্ছে ওয়েজ অ্যান্ড মিনস অ্যাডভান্স। সরকার যখন সাময়িকভাবে টাকার ঘাটতিতে পড়ে, অর্থাৎ রাজস্ব আসার আগেই খরচ মেটানোর দরকার পড়ে তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে খুব অল্প সময়ের জন্য ঋণ নেয় সরকার। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মাসের শুরুতে সরকারের কিছু বড় খরচ আছে, যেমন কর্মচারীদের বেতন, উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় পরিশোধ এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানির বিল পরিশোধ ইত্যাদি। এ ধরনের ব্যয় মেটাতে সরকার স্বল্প সময়ের জন্য এ ঋণ নেয়। একই কারণে ওভারড্রাফটের মাধ্যমেও ঋণ নেওয়া হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ৯ এপ্রিল পর্যন্ত ওয়েজ অ্যান্ড মিনস হিসাবে ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হলেও ওভারড্রাফট ঋণ পৌঁছেছে ২২ হাজার ৪৭৪ কোটি টাকায়। এ ছাড়া ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে ট্রেজারি বিল ও বন্ড কিনে বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারকে ঋণ দিয়েছিল। যেটা এখন দাঁড়িয়েছে ৬৮ হাজার ১৩২ কোটি টাকায়। ফলে সব মিলিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে সরকারের ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার ৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে চলতি অর্থবছরে নেওয়া হয়েছে ২৩ হাজার ৫৮৩ কোটি টাকা।
একটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাধারণত সেই দেশের মোট জিডিপি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে টাকা ছাপায়। দেশের ভেতরে পণ্য ও সেবা উৎপাদন যে হারে বাড়ে, তার সঙ্গে মিল রেখে টাকা ছাড়া হলে অর্থনীতি স্থিতিশীল থাকে। সীমার বেশি টাকা ছাপালে ও পণ্যের উৎপাদন না বাড়লে মানুষের হাতে টাকা বেড়ে যায়। এতে পণ্যের চাহিদা বাড়ে, কিন্তু জোগান সীমিত থাকে। ফলে হুহু করে দ্রব্যমূল্য বাড়ে। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়।
এছাড়া বাজারে টাকার সরবরাহ কৃত্রিমভাবে বেড়ে গেলে বৈদেশিক মুদ্রার বিপরীতে টাকার মান কমে যায়। এতে আমদানি করা পণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে। নতুন ছাপানো টাকা যখন বাজারে ঘুরে, তখন তা বাজারে পাঁচ গুণ বেশি ‘মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট’ তৈরি করে, যা বাজারব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তোলে। অতিরিক্ত টাকা ছাপানো অনেকটা তরল দুধে জল মেশানোর মতো। পরিমাণ বাড়ে ঠিকই, কিন্তু ঘনত্ব বা পুষ্টিগুণ কমে যায়।