রাজনীতি : পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা ও আমাদের দায়

সাঈদ বারী

মতামত

বাংলাদেশের রাজনীতি এক দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গড়ে উঠেছে। স্বাধীনতার পর থেকে নানা উত্থান-পতন, আশা-হতাশা, অর্জন-ব্যর্থতা মিলিয়ে এই রাজনীতির শরীর

2026-04-25T05:59:54+00:00
2026-04-25T05:59:54+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
মতামত
রাজনীতি : পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা ও আমাদের দায়
সাঈদ বারী
প্রকাশ: শনিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:৫৯ এএম   (ভিজিট : ২৫)
গ্রাফিক : সময়ের আলো
বাংলাদেশের রাজনীতি এক দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গড়ে উঠেছে। স্বাধীনতার পর থেকে নানা উত্থান-পতন, আশা-হতাশা, অর্জন-ব্যর্থতা মিলিয়ে এই রাজনীতির শরীর আজ যে জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। সময় বদলেছে, মানুষের প্রত্যাশা বদলেছে, রাষ্ট্রের কাঠামো ও বৈশ্বিক বাস্তবতাও বদলে গেছে। কিন্তু রাজনীতির ধরন কি সেই অনুপাতে পরিবর্তিত হয়েছে? এই প্রশ্ন থেকেই নতুন দিনের নতুন রাজনীতির প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে।

রাজনীতি কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়। এটি মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। একটি দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, বিচারব্যবস্থা এমনকি নাগরিকের ব্যক্তিগত নিরাপত্তাও রাজনীতির গুণগত মানের ওপর নির্ভর করে। সেই অর্থে রাজনীতির সংস্কার মানে কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রচেষ্টা। কিন্তু বাস্তবে আমরা প্রায়ই দেখি, রাজনীতি অনেক সময় জনকল্যাণের চেয়ে দলীয় স্বার্থের কাছে বন্দি হয়ে পড়ে।

নতুন দিনের রাজনীতি বলতে আমরা কী বুঝি? এটি মূলত এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে ক্ষমতা নয়, সেবা হবে মূল লক্ষ্য। যেখানে বিরোধিতা মানে শত্রুতা নয়, বরং মতভেদকে সম্মান করার চর্চা থাকবে। যেখানে নির্বাচন কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং জনগণের সত্যিকারের মতপ্রকাশের সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হবে। 

যেখানে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চা করবে এবং নেতৃত্বের বিকাশ ঘটবে স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ায়।

বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই নতুন রাজনীতির প্রয়োজনীয়তা আরও তীব্র। কারণ একদিকে যেমন রাজনৈতিক মেরুকরণ বেড়েছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মধ্যে রাজনীতি নিয়ে একধরনের অনাস্থা তৈরি হয়েছে। এই অনাস্থা গণতন্ত্রের জন্য শুভ লক্ষণ নয়। মানুষ যখন মনে করে তাদের ভোটের মূল্য নেই, তাদের মতামত গুরুত্ব পায় না, তখন তারা ধীরে ধীরে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে নিজেদের সরিয়ে নেয়। ফলে রাজনীতি হয়ে পড়ে কিছু গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রিত একটি ক্ষেত্র, যা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর।

নতুন রাজনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জবাবদিহিতা। ক্ষমতায় থাকা মানেই দায়মুক্তি নয়। বরং ক্ষমতার সঙ্গে দায়িত্বও বাড়ে। জনগণের কাছে জবাবদিহি করার সংস্কৃতি শক্তিশালী না হলে দুর্নীতি ও অপশাসনের ঝুঁকি বাড়ে। আমাদের দেশে দুর্নীতির প্রশ্নটি বহুদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে। 

কিন্তু কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। নতুন রাজনীতি সেই কাঠামোগত পরিবর্তনের কথা বলে, যেখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে।

তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণও নতুন রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বাংলাদেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ তরুণ। তাদের চিন্তা, উদ্যম ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু রাজনীতিতে তাদের অংশগ্রহণ এখনও সীমিত। অনেক সময় রাজনীতি সম্পর্কে তাদের মধ্যে বিরূপ ধারণা তৈরি হয়। এই অবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন। নতুন দিনের রাজনীতি এমন হতে হবে, যেখানে তরুণরা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে পারে।

এখানে একটি প্রশ্ন আসতে পারে, নতুন রাজনীতি কি কেবল নতুন নেতৃত্বের বিষয়? না, এটি কেবল ব্যক্তির পরিবর্তন নয়, বরং মানসিকতার পরিবর্তন। পুরোনো ধ্যানধারণা নিয়ে নতুন মুখ দিয়ে রাজনীতি করলে কাক্সিক্ষত পরিবর্তন আসবে না। প্রয়োজন চিন্তার পরিবর্তন, আচরণের পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির মৌলিক রূপান্তর।

গণমাধ্যমের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। একটি স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম রাজনৈতিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারে। একই সঙ্গে নাগরিক সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বুদ্ধিজীবীদেরও দায়িত্ব রয়েছে একটি সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে। রাজনীতি যদি কেবল রাজনীতিবিদদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে তা কখনোই পূর্ণাঙ্গ গণতান্ত্রিক রূপ পাবে না।

নতুন রাজনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সহনশীলতা। মতভেদ থাকতেই পারে, কিন্তু তা যেন সহিংসতায় রূপ না নেয়। আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে সহিংসতার বহু উদাহরণ রয়েছে, যা কেবল মানবিক ক্ষতিই বাড়ায়নি, বরং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকেও দুর্বল করেছে। নতুন দিনের রাজনীতি এমন হতে হবে, যেখানে ভিন্নমতকে দমন নয়, বরং সংলাপের মাধ্যমে সমাধান খোঁজা হবে।

বিশ্বায়নের এই যুগে আন্তর্জাতিক বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হয়। অর্থনীতি, পরিবেশ, প্রযুক্তি সবকিছুই এখন বৈশ্বিকভাবে সংযুক্ত। তাই একটি দেশের রাজনীতি যদি নিজস্ব সংকীর্ণতায় আবদ্ধ থাকে, তবে তা টেকসই উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। নতুন রাজনীতি হতে হবে বিশ্বদৃষ্টিসম্পন্ন, কিন্তু একই সঙ্গে স্থানীয় বাস্তবতার প্রতি সংবেদনশীল।

সবশেষে প্রশ্নটি আবার ফিরে আসে, এই নতুন রাজনীতি আমাদের জন্য কতখানি জরুরি? উত্তরটি সহজ নয়, কিন্তু স্পষ্ট। যদি আমরা একটি ন্যায়ভিত্তিক, সমৃদ্ধ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়তে চাই, তবে নতুন রাজনীতির বিকল্প নেই। এটি কোনো বিলাসিতা নয়, বরং সময়ের দাবি।

এই পরিবর্তন একদিনে আসবে না। এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া, যেখানে প্রয়োজন ধৈর্য, সচেতনতা এবং সম্মিলিত উদ্যোগ। রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। কারণ গণতন্ত্রের মূল শক্তি জনগণ। তারা যদি সচেতন ও সক্রিয় থাকে, তবে রাজনীতিও ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে বাধ্য।

নতুন দিনের নতুন রাজনীতি তাই কেবল একটি সেøাগান নয়। এটি একটি প্রয়োজন, একটি প্রত্যাশা এবং একটি সম্ভাবনা। সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। তা হলেই হয়তো আমরা এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারব, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ রেখে যাবে।

প্রকাশক ও কলাম লেখক

সময়ের আলো/আআ


  বিষয়:   রাজনীতি  পরিবর্তন  প্রয়োজনীয়তা  আমাদের  দায় 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: