লোডশেডিংয়ের থাবায় অর্থনীতি ও জনজীবন

মো. জসিম উদ্দিন

মতামত

আধুনিক সভ্যতায় বিদ্যুৎ কেবল বিলাসিতা নয়, বরং টিকে থাকার অক্সিজেন। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের মানুষ ও অর্থনীতি যে

2026-04-27T03:46:13+00:00
2026-04-27T03:46:13+00:00
 
  সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬,
৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬
মতামত
লোডশেডিংয়ের থাবায় অর্থনীতি ও জনজীবন
মো. জসিম উদ্দিন
প্রকাশ: সোমবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২৬, ৩:৪৬ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
আধুনিক সভ্যতায় বিদ্যুৎ কেবল বিলাসিতা নয়, বরং টিকে থাকার অক্সিজেন। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের মানুষ ও অর্থনীতি যে সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে, তার নাম লোডশেডিং। কখনো জ্বালানি সংকট, কখনো যান্ত্রিক ত্রুটি, আবার কখনো ডলার সংকটের দোহাই দিয়ে অন্ধকার নেমে আসছে জনপদে। এই অন্ধকার শুধু ঘরে বা রাস্তায় নয়, এই অন্ধকার থাবা বসিয়েছে দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্রে। শিল্পোৎপাদন থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ব্যবসা, শিক্ষা থেকে চিকিৎসা- সর্বত্রই আজ হাহাকার। যা আজ আর কোনো কাব্যিক অতিশয়োক্তি নয়, বরং এখনকার নিষ্ঠুর বাস্তবতা।

বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ঘাটতির চিত্র
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২৫,০০০ মেগাওয়াটের বেশি হলেও প্রকৃত উৎপাদন চাহিদার তুলনায় অনেক কম। গ্রীষ্মকালে বা সেচ মৌসুমে যখন চাহিদাও ১৬,০০০ থেকে ১৭,০০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়, তখন ২,০০০ থেকে ৩,০০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে। ডলার সংকটের কারণে কয়লা ও এলএনজি আমদানিতে বিঘ্ন ঘটায় বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ ক্ষমতায় চলতে পারছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুৎ খাতের বিশাল অঙ্কের বকেয়া পাওনা এবং কারিগরি ত্রুটি, যা গ্রিড ব্যবস্থাপনায় সংকট সৃষ্টি করছে। পরিসংখ্যান বলছে, শহর ছাড়িয়ে গ্রামাঞ্চলে দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না, যা প্রান্তিক অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিচ্ছে।

শিল্পোৎপাদনে ধস : অর্থনীতির রক্তক্ষরণ
শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যাহত ও প্রতিযোগিতা সংকট : লোডশেডিংয়ের সবচেয়ে বড় ধাক্কা পড়ছে শিল্প খাতে। তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, চামড়া এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলো বিদ্যুতের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে উৎপাদন প্রক্রিয়া থেমে যায়, যা সময়মতো অর্ডার সরবরাহে বাধা সৃষ্টি করে। অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করছে, যার ফলে উৎপাদন ব্যয় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যাচ্ছে এবং রফতানি প্রবৃদ্ধি ঝুঁকির মুখে পড়ছে। ছোট ও মাঝারি শিল্পগুলো, যাদের পক্ষে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার ব্যয়বহুল, তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে কর্মসংস্থানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে এবং বেকারত্বের ঝুঁকি বাড়ছে।

কৃষি খাতে হাহাকার : খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি
বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ হওয়া সত্ত্বেও সেচ মৌসুমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না থাকায় ফসল উৎপাদন চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে আমন ও বোরো মৌসুমে সেচ পাম্প চালানো না যাওয়ায় কৃষকের উৎপাদন খরচ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পোলট্রি ও ডেইরি শিল্পের ওপরও। খামারে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে পড়ায় হাজার হাজার মুরগি মারা যাচ্ছে এবং গরুর দুধ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। পরিসংখ্যান মতে, নিয়মিত লোডশেডিংয়ের কারণে পোলট্রি খাতে মাসিক ক্ষতির পরিমাণ শতকোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে।

বিপর্যস্ত জনজীবন ও স্বাস্থ্যঝুঁকি
মানুষের দৈনন্দিন জীবনে লোডশেডিং এখন এক নীরব অভিশাপে পরিণত হয়েছে। প্রচণ্ড তাপপ্রবাহের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষজন। ঘরের ভেতর অসহনীয় গরমে শারীরিক অস্বস্তি যেমন বাড়ে, তেমনি হিটস্ট্রোক, ডিহাইড্রেশনসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়। স্বাস্থ্যসেবা খাতে এর প্রভাব আরও উদ্বেগজনক। অপারেশন থিয়েটার থেকে শুরু করে আইসিইউ- সবখানেই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের প্রয়োজন অপরিহার্য। যদিও অধিকাংশ হাসপাতালেই ব্যাকআপ জেনারেটর রয়েছে, তবু দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিংয়ের সময় এসব ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে, যা জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা কার্যক্রমকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়। 

অন্যদিকে শিক্ষাক্ষেত্রেও লোডশেডিংয়ের নেতিবাচক প্রভাব ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে। বিদ্যুৎ না থাকলে অনলাইন ক্লাস, ডিজিটাল লার্নিং কিংবা ইন্টারনেটভিত্তিক শিক্ষার সব কার্যক্রম ব্যাহত হয়। বিশেষ করে পরীক্ষার মৌসুমে গভীর রাতের লোডশেডিং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ধারাবাহিকতা নষ্ট করে দেয় এবং তাদের মধ্যে মানসিক চাপ ও ক্লান্তি তৈরি করে। এতে করে শিক্ষার মান যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তেমনি দীর্ঘমেয়াদে দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

ডিজিটাল বাংলাদেশ ও ফ্রিল্যান্সিং ক্ষতি
সরকার স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অভাব সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে বড় বাধা। বাংলাদেশের কয়েক লাখ ফ্রিল্যান্সার বিশ্ববাজারে আইটি সেবা দিয়ে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেন। কিন্তু বিদ্যুতের অভাবে ইন্টারনেটের ধীরগতি এবং ডিভাইসের চার্জ না থাকায় তারা সময়মতো কাজ জমা দিতে পারছেন না। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সারদের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হচ্ছে। একইভাবে আইটি প্রতিষ্ঠানগুলোর অপারেশনাল কস্ট জেনারেটর ব্যবহারের কারণে বহুগুণ বেড়ে গেছে, যা এই বিকাশমান খাতকে পেছনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

সংকটের মূল কারণ : জ্বালানি ও নীতি দুর্বলতা
বিদ্যুৎ সংকটের পেছনে অন্যতম কারণ হলো আমদানিনির্ভর জ্বালানি কাঠামো। স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান পর্যাপ্তভাবে না বাড়িয়ে এলএনজি ও কয়লার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে দুর্বল করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি এবং ডলার সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এর পাশাপাশি কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে, যা অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার অদক্ষতা এবং সিস্টেমলসও এই সংকটকে তীব্র করছে।

বিদ্যুৎ খাতে আর্থিক চাপ ও ভর্তুকি
বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান সংকট শুধু সরবরাহ ঘাটতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির ওপর একটি বড় আর্থিক চাপ তৈরি করছে। সরকারকে প্রতি বছর বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ বজায় রাখতে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। জ্বালানি আমদানির উচ্চমূল্য, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন এবং ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ-সব মিলিয়ে এই খাতে ব্যয় ক্রমেই বেড়ে চলেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে জাতীয় বাজেটে। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা সামাজিক নিরাপত্তা খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দ সীমিত হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে বারবার বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিচ্ছে।

দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব : বিনিয়োগ ঝুঁকি
লোডশেডিংয়ের এই চলমান সংকট দীর্ঘমেয়াদে দেশের বিনিয়োগ পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহকে একটি মৌলিক শর্ত হিসেবে বিবেচনা করেন। বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা নতুন শিল্প স্থাপনে নিরুৎসাহিত করছে এবং বিদ্যমান শিল্পগুলোকে সম্প্রসারণে বাধাগ্রস্ত করছে। এর ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমে যেতে পারে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হতে পারে। পাশাপাশি, স্মার্ট বাংলাদেশ বা উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার লক্ষ্যমাত্রাও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। তাই এই সংকটকে অবহেলা না করে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

উত্তরণের পথ : কী করা প্রয়োজন?
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অপরিহার্য। প্রথমত জ্বালানি উৎসের বহুমুখীকরণ করতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি- বিশেষ করে সৌর ও বায়ুশক্তির ব্যবহার বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। দ্বিতীয়ত দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করতে হবে, যাতে আমদানিনির্ভরতা কমানো যায়। তৃতীয়ত আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে জলবিদ্যুৎ আমদানির সুযোগ বাড়াতে হবে।

চতুর্থত বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করে সিস্টেম লস কমাতে হবে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ ব্যবহারে দক্ষতা বাড়াতে সচেতনতা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন জরুরি। পঞ্চমত বিদ্যুৎ অপচয় রোধ ও সঠিক বণ্টন নিশ্চিত করতে সারা দেশে স্মার্ট গ্রিড ও প্রিপেইড মিটারিং ব্যবস্থা স্থাপন এখন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

সর্বোপরি লোডশেডিং আজ আর কেবল একটি সাময়িক সমস্যা নয়, এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি গভীর কাঠামোগত সংকট। শিল্প, কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য- প্রতিটি খাতেই এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট। এই সংকট নিরসনে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই প্রয়োজন সুশাসন, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং টেকসই জ্বালানি নীতি। দেশের মানুষ এখন অপেক্ষায়- কবে এই অন্ধকার কাটিয়ে একটি স্থিতিশীল ও আলোকিত ভবিষ্যতের পথে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে।

লেখক : প্রভাষক, অর্থনীতি বিভাগ, জয়পুরা এসআরএমএস স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রামগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর

/কেএইচও


  বিষয়:   লোডশেডিং  অর্থনীতি  জনজীবন 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: