বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে গত তিন দশকের পথযাত্রায় পোলট্রি শিল্প ইতিমধ্যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৬০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় নিজস্ব অবস্থান তৈরি করেছে এবং পোলট্রি শিল্পের (ব্যাকওয়ার্ড-ফরোয়ার্ড) উৎপাদন ও বিপণন চেইনে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার একটি স্বতন্ত্র অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেম গড়ে তুলেছে।
প্রান্তিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিরা হলো পোলট্রি শিল্পের মূল প্রাণভোমরা। লক্ষাধিক প্রান্তিক পোলট্রি উদ্যোক্তাদের স্বল্প পুঁজি, দ্রুত উৎপাদন চক্র (রিটার্ন) এবং গ্রামীণ পর্যায়ে সহজে ব্যবসা বিস্তারের সুযোগ থাকায় এ খাত লাখো মানুষের জীবিকার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হতে পেরেছে।
দেশের স্বল্পমূল্যের উন্নত প্রাণিজ প্রোটিনের চাহিদার বড় একটি অংশ এখন ডিম ও মুরগির মাংস থেকেই পূরণ হচ্ছে; ফলে ভোক্তার পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য হ্রাস এবং গ্রামের তরুণ ও নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নেও পোলট্রি শিল্পের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত সমস্যার কারণে দেশের পোলট্রি শিল্প বহুমুখী চাপে রয়েছে, আসন্ন জাতীয় বাজেটে যথাযথ নীতিগত ও আর্থিক সহায়তা না পেলে পোলট্রি শিল্পের মতো সম্ভাবনাময় খাত অদূর ভবিষ্যতে বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে।
বর্তমানে পোলটি খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো উৎপাদন ব্যয়ের লাগামহীন বৃদ্ধি। ফিডের কাঁচামাল যেমন ভুট্টা, সয়াবিন মিল, ডি-ওয়েল্ড কেক, এডিটিভস, সাপ্লিমেন্টস ইত্যাদির অধিকাংশই আমদানিনির্ভর। বর্তমানে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, ডলার সংকট, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং শুল্ক-কর কাঠামোর কারণে ফিডের দাম ক্রমাগত বাড়ছে।
বর্তমানে পোলট্রি উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি, শ্রম ব্যয়, পরিবহন খরচসহ অন্যান্য ব্যবস্থাপনা খরচ বৃদ্ধি এবং ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো প্রান্তিক খামারিরা প্রচলিত ব্যাংক খাত ও অন্যান্য তফসিলভুক্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে সহজে ঋণ না পাওয়ায় খামার চালু রাখতে এনজিও এবং মহাজন/দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নেওয়ার ফলে উৎপাদন ব্যয় এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারি তাদের খামার বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছেন। ছোট ও মাঝারি খামারিদের এই বাস্তবতার প্রভাব শুধু উৎপাদনে নয়, সরবরাহ ব্যবস্থাতেও পড়ছে, যা ডিম ও মুরগির বাজারে অনেক সময় অস্থিরতা সৃষ্টি করছে।
দেশের বৃহত্তম সুসংগঠিত কর্মসংস্থান খাত পোলট্রি শিল্পের বর্তমান সংকট মোকাবিলা ও সুরক্ষায় আসন্ন বাজেটে কিছু বাস্তবমুখী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ ও বিশেষ বরাদ্ধ রাখা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে পোলট্রি শিল্পের উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থায় টার্নওভার ট্যাক্স হ্রাস, পোলটি ফিডের কাঁচামাল আমদানির ওপর শুল্ক প্রত্যাহার বা হ্রাস এবং ফিড উপাদানের স্থানীয় কাঁচামাল ক্রয় পর্যায়ে ভ্যাট প্রত্যাহার- এই মুহূর্তে বাস্তবায়ন করা গেলে ফিড উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়বে বাজারে ফিডের দামে।
ফিডের দাম কমে গেলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিরা উৎপাদনে টিকে থাকতে পারবেন, একই সঙ্গে গ্রামীণ অর্থনীতিতে পোলট্রি খাতের মাধ্যমে যে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে তা সুরক্ষিত থাকবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের পথও উন্মুক্ত থাকবে।
দেশে স্থানীয়ভাবে ফিডের কাঁচামাল উৎপাদনে উৎসাহ দেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন; ভুট্টা ও সয়াবিন চাষে প্রণোদনা, গবেষণা সহায়তা, সংরক্ষণ এবং বাজার নিশ্চয়তা প্রদান করা গেলে আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে। দীর্ঘমেয়াদে এটি ফিডের মূল্য স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হবে এবং দেশের কৃষি খাতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
পোলট্রি খামারিদের জন্য সহজ শর্তে স্বল্পসুদে ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; বর্তমানে ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার অনেক খামারিকে বিনিয়োগ থেকে বিরত রাখছে। একটি বিশেষায়িত ‘পোলটি উন্নয়ন তহবিল’ গঠন করে ৪-৫ শতাংশ সুদে ঋণ প্রদান করা হলে খামারিরা উৎপাদন অব্যাহত রাখতে পারবেন এবং নতুন উদ্যোক্তারাও এই খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন।
পোলট্রি বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করাও জরুরি; অনেক সময় ডিম ও মুরগির দামের অস্বাভাবিক ওঠানামা মধ্যস্বত্বভোগী বা অসাধু চক্রের কারণে ঘটে। সরকারিভাবে বাজার মনিটরিং জোরদার, ডিজিটাল সাপ্লাই চেইন ও ট্রেসাবিলিটি সিস্টেম গড়ে তোলা এবং উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সরাসরি সংযোগ বৃদ্ধি করা গেলে এই সমস্যা অনেকাংশে সমাধান করা সম্ভব।
পোলট্রি খাতে রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ; বার্ড ফ্লুসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগ খামারিদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে। পোলট্রি শিল্পের বর্তমান সংকট থেকে বেরিয়ে আগামী দিনে আরও বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে মিল রেখে ডিম-মুরগির উৎপাদন বৃদ্ধিকল্পে আসন্ন বাজেটে আধুনিক ভেটেরিনারি সেবার বিস্তার, উপজেলা পর্যায়ে ল্যাব স্থাপন, লাইভস্টক উৎপাদনে সম্প্রসারণ কার্যক্রম জোরদার এবং দ্রুত রোগ নির্ণয় ও ঝুঁকিপূর্ণ রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা প্রয়োজন। পাশাপাশি খামারিদের প্রশিক্ষণ ও বায়োসিকিউরিটি ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখতে হবে।
বাংলাদেশের পোলট্রি শিল্পজাত পণ্য রফতানি সম্ভাবনাও এ খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক; আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে ডিম ও প্রসেসড পোলটি পণ্য উৎপাদন ও রফতানি করা গেলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন সুযোগ তৈরি হবে। এ জন্য মান নিয়ন্ত্রণ, সার্টিফিকেশন এবং আধুনিক প্রসেসিং সুবিধা উন্নয়নে বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন।
পোলট্রি শিল্পকে শুধু একটি বাণিজ্যিক খাত হিসেবে দেখলে চলবে না, পোলট্রি শিল্প একটি সেবা খাতও বটে। কারণ খামারিরা অনেক ঝুঁকি নিয়ে নিজের জন্য নয়, বরং ভোক্তা-সাধারণের জন্য, দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে ডিম ও মাংস উৎপাদন করেন। দেশের পোলট্রি শিল্পকে জাতীয় খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার একটি কৌশলগত খাত হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। সমন্বিত নীতি সহায়তা, কর কাঠামোর সংস্কার এবং উৎপাদকবান্ধব পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে এই খাতকে টেকসই করা সম্ভব।
জনবান্ধব বর্তমান সরকার দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আসন্ন বাজেটে যদি পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজের টার্নওভার ট্যাক্স হ্রাস, পোলটি ফিডের কাঁচামালের আমদানি এবং স্থানীয় পর্যায়ে ফিড উৎপাদন আইটেম (কাঁচামাল) ক্রয়ে শুল্ক ও ভ্যাট কমানোসহ বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেয় তবে তা শুধু পোলট্রি খাতকেই সুরক্ষা দেবে না, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাবে।
পোলট্রি শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়া মানে গ্রামীণ অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং দেশের ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করা। এই সত্যটি অনুধাবন করেই পোলট্রি খাতের সুরক্ষা ও উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সুনির্দিষ্ট প্রণোদনাসহ পোলট্রি খাতের উন্নয়নে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ রাখা সময়ের দাবি।
লেখক : সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন
/কেএইচও