আওয়ামীপন্থী শিক্ষক-কর্মকর্তারা মাফ পেলেও মাফ পাননি ৩৩ ছাত্রলীগ নেতাকর্মী

জিসান নজরুল, ইবি

শিক্ষা

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) জুলাই আন্দোলন বিরোধী ভূমিকার অভিযোগে বরখাস্ত হওয়া আওয়ামীপন্থী ১৯ শিক্ষক ও ১১ কর্মকর্তা-কর্মচারীর শাস্তি

2026-04-27T21:20:02+00:00
2026-04-27T21:36:12+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
শিক্ষা
ইবিতে জুলাই বিরোধিতার অভিযোগে শাস্তি
আওয়ামীপন্থী শিক্ষক-কর্মকর্তারা মাফ পেলেও মাফ পাননি ৩৩ ছাত্রলীগ নেতাকর্মী
জিসান নজরুল, ইবি
প্রকাশ: সোমবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২৬, ৯:২০ পিএম  আপডেট: ২৭.০৪.২০২৬ ৯:৩৬ পিএম
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়। ছবি : সময়ের আলো
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) জুলাই আন্দোলন বিরোধী ভূমিকার অভিযোগে বরখাস্ত হওয়া আওয়ামীপন্থী ১৯ শিক্ষক ও ১১ কর্মকর্তা-কর্মচারীর শাস্তি মওকুফ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

গত ১৮ মার্চ অনুষ্ঠিত জরুরি সিন্ডিকেট সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শাস্তি মওকুফের এক মাসের বেশি সময় পেরোলেও একই ইস্যুতে বহিষ্কার ও সনদ বাতিলের সিদ্ধান্ত হওয়া ৩৩ জন শিক্ষার্থী ও শাখা ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। এতে তাদের শিক্ষাজীবন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্ট্রার সূত্রে জানা গেছে, গত ৩০ অক্টোবর অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৭১তম সিন্ডিকেট সভায় জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানবিরোধী ভূমিকায় থাকার অভিযোগে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) ১৯ জন শিক্ষক এবং ১১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ মোট ৩০ জনকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামীপন্থী শিক্ষক সংগঠন ও কর্মকর্তা ইউনিটের সদস্য। একই অপরাধে ৩৩ জন শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে যাদের পড়াশোনা শেষ হয়েছে তাদের সনদ বাতিল এবং অধ্যয়নরতদের বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

তবে এখন পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের বহিষ্কার ও সনদ বাতিল কার্যকর করা হয় নি। পরবর্তীতে তাদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। এর মধ্যে অধিকাংশ শিক্ষার্থীই নোটিশের জবাব দিয়েছেন। কিন্তু বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে।

যেহেতু এখনো তাদের বহিষ্কার কার্যকর হয়নি, সে হিসেবে তারা নিয়মিত ক্লাস ও পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন বলে জানা গেছে। তবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের মধ্যে কেউ কেউ বিভাগের অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম—ক্লাস ও পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন, আবার কিছু শিক্ষার্থীকে ক্লাস ও পরীক্ষায় অংশ নিতে দেওয়া হচ্ছে না। এদিকে গত ১৮ মার্চের জরুরি সিন্ডিকেট সভায় শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শাস্তি মওকুফ করা হলেও শিক্ষার্থীদের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ফলে একই অপরাধে অভিযুক্ত হয়েও দুই পক্ষের ক্ষেত্রে ভিন্ন আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন শিক্ষার্থীরা।

তারা বলেন, একই অপরাধে বরখাস্ত শিক্ষক-কর্মকর্তারা যদি নির্দোষ বিবেচনায় শাস্তি থেকে মওকুফ পেয়ে থাকেন, তাহলে শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সিদ্ধান্ত কেন প্রযোজ্য হচ্ছে না। 

ভুক্তভোগীরা বলেন, শাস্তি বহাল থাকায় তারা একদিকে যেমন অ্যাকাডেমিক ক্লাস-পরীক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে সনদ বাদিল হওয়ায় সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন চাকরির আবেদনও করতে পারছেন না। ফলে তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে। এ বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।

ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের বহিষ্কারের বিষয়টি নিয়ে ক্যাম্পাসের ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে কথা হয় প্রতিবেদকের। তারা জানান, সাংগঠনিকভাবে তারা কাউকেই বহিষ্কারের জন্য প্রশাসনকে বলেনি। তাদের অপরাধ বিবেচনা করে দ্রুত বিষয়টি সুরাহা করতে কর্তৃপক্ষকে আহ্বান জানিয়েছেন ছাত্র নেতারা।

অভিযোগ রয়েছে, এই ৩৩ জনের মধ্যে অনেক নিরপরাধ শিক্ষার্থীও শাস্তির আওতায় পড়েছেন। তাদের মধ্যে একজন তানভীর হাসান। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। প্রায় ছয় মাস ধরে তিনি বহিষ্কৃত অবস্থায় আছেন। মাস্টার্সের প্রথম সেমিস্টার চলাকালীন তার অনার্সের সনদ বাতিল করে তাকে বহিষ্কার করা হয়। তার সহপাঠীরা মাস্টার্সের শেষ পর্যায়ে থাকলেও তিনি শিক্ষাজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছেন। ফলে মাস্টার্সে পরীক্ষা দিতে না পারায় সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন চাকরির আবেদনও করতে পারছেন না বলে দাবি তানভীরের।

ওই শিক্ষার্থী অভিযোগ করে বলেন, জুলাই আন্দোলনের পর ক্লাস শুরু হওয়ার পর থেকেই আমি নিয়মিতভাবে ক্যাম্পাসে ও ক্লাসে উপস্থিত ছিলাম। সবকিছু স্বাভাবিকই চলছিল। কিন্তু কিছুদিন পর অর্থনীতি ক্লাবের নির্বাচনে সেক্রেটারি পদে প্রার্থী হওয়ায় আমার জন্য সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।


নির্বাচনের আগের দিন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একটি পেজে আমার বিরুদ্ধে একটি পোস্ট করা হয়। এরপর আমার বিভাগের একজন সিনিয়র এবং সহ-সমন্বয়ক নাহিদ হাসান আমাকে ফোন করে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে বলেন এবং জানান, নির্বাচন করলে আমার জন্য সমস্যা হতে পারে। পরবর্তীতে বাধ্য হয়ে আমি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াই। কিছুদিন পরই আমি বহিষ্কৃত ৩০ জনের তালিকায় আমার নাম দেখতে পাই। আমি মনে করি, শুধু মাত্র এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই আমাকে ফাঁসানো হয়েছে। বহিষ্কৃত ৩০ জনের মধ্যে আমি একমাত্র ব্যক্তি, যার কোনো ছাত্রলীগে পদ-পদবি নেই।

তিনি আরও বলেন, আমি জুলাই আন্দোলন বা ছাত্রলীগ কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেই সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলাম না। তবে জুলাইয়ের প্রতি মৌন সমর্থন ছিল। তবে প্রথম বর্ষে হলে সিট পাওয়ার জন্য ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। এখন আমার শিক্ষাজীবন হুমকিতে আছে। আমাকে মাস্টার্সে ক্লাস-পরীক্ষা দিতে সুযোগ দেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষের অনুরোধ জানাচ্ছি।

কেন তানভীর হাসানকে পরীক্ষায় অংশ নিতে দেওয়া হয়নি, এ বিষয়ে অর্থনীতি বিভাগের সভাপতি ড. পার্থ সারথি লস্কর বলেন, এ মুহূর্তে কিছু বলা সম্ভব নয়। ডকুমেন্ট দেখেই বলতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ড. মনজুরুল হক বলেন, তাদের বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তবে সেটি এখনো কার্যকর করা হয়নি। সিদ্ধান্তটি বর্তমানে ঝুলে আছে। পরবর্তীতে সিন্ডিকেট সভায় এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ বলেন, বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া শিক্ষার্থীদেরও ভবিষ্যৎ রয়েছে। তাই আমরা বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখছি। তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো পুনরায় পর্যালোচনা করা হবে এবং অপরাধের মাত্রা বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

উল্লেখ্য, বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত হওয়া শিক্ষার্থীরা হলেন, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের বিপুল খান, অর্থনীতি বিভাগের ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ও শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহমেদ জয়, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের মেহেদী হাসান হাফিজ ও শাহীন আলম, ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের রতন রায়, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের মুন্সী কামরুল হাসান অনিক, মার্কেটিং বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের হুসাইন মজুমদার, বাংলা বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের তরিকুল ইসলাম।

ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের মৃদুল রাব্বী, ইংরেজি বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের ফজলে রাব্বী, ল অ্যান্ড ল্যান্ড ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শাকিল, ব্যবস্থাপনা বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিমুল খান, আইন বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের কামাল হোসেন, ইংরেজি বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের মাসুদ রানা, আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের মেজবাহুল ইসলাম, সমাজকল্যাণ বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের অনিক কুমার, বাংলা বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের আব্দুল আলিম, ল অ্যান্ড ল্যান্ড ম্যানেজমেন্ট ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের বিজন রায়, শেখ সোহাগ ও শাওন।

অর্থনীতি বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের তানভীর ও শেখ সাদি, সমাজকল্যাণ বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের মাজহারুল ইসলাম, ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের মনিরুল ইসলাম আসিফ, সমাজকল্যাণ বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের মারুফ ইসলাম, চারুকলা বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের পিয়াস, বাংলা বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের ফারহান লাবিব ধ্রুব, আল-ফিকহ অ্যান্ড ল বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের প্রাঞ্জল, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের নাবিল আহমেদ ইমন।

ফিনান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের রাফিদ, লোক প্রশাসন বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের আদনান আলি পাটোয়ারি, ল অ্যান্ড ল্যান্ড ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের লিয়াকত ইসলাম রাকিব এবং ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের ইমামুল মুত্তাকী শিমুল।

সময়ের আলো/জোই



  বিষয়:   ইবি  জুলাই বিরোধিতা  শাস্তি 


Loading...
Loading...
শিক্ষা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: