সাম্প্রতিক দিনগুলোয় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে টানাপড়েন আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তেলের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। আর আলোচনার সব দরজাই যেন একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ইরানের শীর্ষ নেতারা বলছেন, আমেরিকার তুরুপের তাস ফুরিয়ে আসছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটন দাবি করছে, তারা ইরানকে কখনো পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে দেবে না। মাঝখানে সমঝোতার চেষ্টা চালাচ্ছে রাশিয়া ও পাকিস্তানের মতো মধ্যস্থতাকারীরা। বিশ্লেষকরা বলছেন, হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা চরমে। তেলবাহী জাহাজ আটক হচ্ছে হরদম। তারই মধ্যে আলোচনা নিয়ে তৈরি হয়েছে জটিল অনিশ্চয়তা। আর এ অনিশ্চয়তাই বাড়াচ্ছে বড় হামলার ঝুঁকি।
যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত দাবিতে আলোচনা ব্যর্থ হচ্ছে : গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই পাকিস্তানের ইসলামাবাদে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা চলছিল। তবে সেই আলোচনা সফল না হওয়ার জন্য ওয়াশিংটনকেই দায়ী করছে তেহরান। রোববার রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে পৌঁছে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সাফ জানিয়ে দেন, যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত দাবির কারণেই অগ্রগতি সত্ত্বেও আলোচনা লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।
এর আগেই শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পাকিস্তানে তাদের প্রতিনিধি পাঠানোর পরিকল্পনা বাতিল করে দেন। তার বক্তব্য ছিল, আলোচনায় ‘অনেক বেশি সময় নষ্ট হচ্ছে’। তবে ট্রাম্প একই সঙ্গে ইরানের নেতাদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘আলোচনা করতে চাইলে তারা আমাদের কাছে আসতে পারে, অথবা ফোন করতে পারে।’
কিন্তু হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে কোনো ‘প্রকাশ্য মাধ্যমে’ আলোচনা করবে না। তার ভাষ্য, এগুলো অত্যন্ত সংবেদনশীল কূটনৈতিক আলোচনা। আমরা সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে দরকষাকষি করব না। অর্থাৎ যেখানে ইরান পাকিস্তানের মতো তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতায় আলোচনা চালিয়ে যেতে চায়, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি আলোচনার ডাক দিয়েও সেই আলোচনার পথ নিজেই সংকুচিত করছে।
হরমুজ প্রণালি প্রতিশোধ নাকি চ্যালেঞ্জ : এই কূটনৈতিক অচলাবস্থার মাঝেই সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে। ইরানের জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য আলি নিকজাদ এক বিবৃতিতে স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ‘যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরে যেতে তেহরান অনুমতি দেবে না।’ প্রণালিটি কৌশলগতভাবে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে বিশ্বের মোট সমুদ্রবাহিত তেলের এক-পঞ্চমাংশের বেশি এখান দিয়েই যায়। ইরান কার্যকরভাবে এই প্রণালিতে মার্কিন নৌ-অবরোধ মোকাবিলা করছে। আর তার প্রভাব পড়েছে তেলের বাজারে। গতকাল পর্যন্ত ব্রেন্ট ক্রুডের দাম উঠেছে ১০৭.৫০ ডলারে।
যুক্তরাষ্ট্রও পিছিয়ে নেই। সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) দাবি করেছে, তারা ইতিমধ্যে ৩৮টি জাহাজকে ইরানি বন্দরে প্রবেশ বা প্রস্থানে বাধা দিয়েছে এবং পথ পরিবর্তন করতে বা ফিরে যেতে নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো এতে কি ইরানের তেল রফতানি বন্ধ হয়েছে? তথ্য বলছে, উল্টো ইরান তেল রফতানি বাড়িয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের চোখরাঙানি, ইরানের তেল প্রবাহ অব্যাহত : সামুদ্রিক বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ট্যাঙ্কার ট্র্যাকার্স জানিয়েছে, ইরান তাদের টার্মিনালে ৪.৬ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল লোড করেছে। আরও আনুমানিক ৪ মিলিয়ন ব্যারেল ইরানি তেল যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ উপেক্ষা করেই গন্তব্যের দিকে ছুটেছে।
ট্রেড ইন্টেলিজেন্স প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ মাসে ইরানের দৈনিক তেল রফতানি ছিল ১.৮৪ মিলিয়ন ব্যারেল। চলতি এপ্রিলেও তা ১.৭১ মিলিয়ন ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে, যা ২০২৫ সালের গড় ১.৬৮ মিলিয়ন ব্যারেলের চেয়েও বেশি। মানে যুক্তরাষ্ট্র যেমন চাচ্ছে তেমন ইরানের তেল প্রবাহ বন্ধ হয়নি, বরং বাড়তি কৌশলের মাধ্যমে রফতানি অব্যাহত আছে।
ইরানের হাতে এখনও অব্যবহৃত অস্ত্র : ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ রোববার রাতে এক্সে (সাবেক টুইটার) একটি চমকপ্রদ বিশ্লেষণ দিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের চাহিদাভিত্তিক হাতিয়ারগুলো (ডিমান্ড কার্ড) অনেকটাই শেষ, অথচ ইরানের সরবরাহভিত্তিক হাতিয়ার (সাপ্লাই কার্ড) এখনও অক্ষত। তার দেওয়া সমীকরণটি হলো; ইরানের হরমুজ প্রণালি (আংশিক ব্যবহৃত) + বাব এল-মান্দেব (অব্যবহৃত) + পাইপলাইন (অব্যবহৃত)। আর যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে কৌশলগত মজুদ থেকে তেল ছাড় (ব্যবহৃত) + চাহিদা হ্রাস (আংশিক ব্যবহৃত) + মূল্য সমন্বয় (ভবিষ্যতে)। গালিবাফ বিদ্রুপ করে লিখেছেন, চাহিদার সমীকরণে গ্রীষ্মকালীন ছুটির বাড়তি চাহিদা তারা কীভাবে মোকাবিলা করবে? যদি না তারা (আমেরিকা) ছুটি বাতিল করতে চায়!
অর্থাৎ ইরানের দাবি ওয়াশিংটন ইতিমধ্যে তার অর্থনৈতিক অস্ত্রের পূর্ণ ব্যবহার করে ফেলেছে। এখন বাকি কেবল সামরিক অপশন, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অন্যদিকে তেহরানের হাতে এখনও বাব এল-মান্দেব প্রণালি ও বিকল্প পাইপলাইন বন্ধ করার মতো ‘ট্রাম্প কার্ড’ মজুদ আছে।
রাশিয়া ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতা : এই অচলাবস্থা কাটাতেই ইরান কূটনীতির নতুন পথ খুঁজছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি বর্তমানে রাশিয়া সফর করছেন। সেন্ট পিটার্সবার্গে তার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে। রুশ দূত মিখাইল উলিয়ানভ এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ব্ল্যাকমেইল ও আলটিমেটামের নীতি ছাড়তে’ পরামর্শ দিয়েছেন। তার ভাষ্য, ‘যুক্তরাষ্ট্র শক্তির অবস্থান থেকে আলোচনা করতে অভ্যস্ত, কিন্তু সেটা ইরানের ক্ষেত্রে কাজ করছে না।’
অপরদিকে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি নতুন প্রস্তাব দিয়েছে। অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই প্রস্তাবে বলা হয়েছে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া যেতে পারে এবং যুদ্ধবিরতি হতে পারে, তবে বিনিময়ে পারমাণবিক ইস্যুতে আলোচনা আপাতত স্থগিত রাখতে হবে। কারণ ইরানের শীর্ষ নেতাদের মধ্যেই পারমাণবিক বিষয়ে ছাড় দেওয়া নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে।
এ ছাড়া ইরান পাকিস্তানের কাছে ‘রেড লাইন’ (চূড়ান্ত সীমারেখা) সংবলিত একটি তালিকাও দিয়েছে, যাতে ইসলামাবাদ তা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পৌঁছে দেয়। এই তালিকায় আছে হরমুজ প্রণালি ও পারমাণবিক ইস্যু। তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম দাবি করছে, এটি আলোচনার অংশ নয়, বরং আঞ্চলিক অবস্থান পরিষ্কার করার একটি প্রচেষ্টা।
কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা : বিশ্লেষকদের মতে, এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো উভয় পক্ষই মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার পথ খুঁজছে না। ট্রাম্প প্রশাসন যতই ‘পরমাণু ইরান চায় না’ বলে দাবি করুক, ইরানের কাছে সেটি এখন গৌণ বিষয়। তেহরানের মূল লক্ষ্য নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও জ্বালানি রফতানি স্বাভাবিক রাখা। রাশিয়াও এই পরিস্থিতিকে নিজের কৌশলগত সুবিধায় ব্যবহার করছে। পুতিনের সঙ্গে আরাগচির বৈঠককে ‘স্বাধীন ও ন্যায়বিচারকামী দেশগুলোর জোট’ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। উলিয়ানভের বক্তব্যে স্পষ্ট, ইরানের পাশে থাকার বার্তাই দিচ্ছে মস্কো।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্পের পরিচালক আলি ভায়েজ সতর্ক করে দিয়েছেন, ‘আমরা শিগগিরই পুনরায় উত্তপ্ত যুদ্ধের দিকে ফিরে যেতে পারি, কারণ ইরান তার প্রতিশোধ নেওয়ার সক্ষমতা অক্ষুণ্ন রেখেছে।’ তিনি বলছেন যে, ট্রাম্প প্রশাসন বারবার হুমকি ও চাপ বাড়িয়ে ইরানকে দুর্বল করার চেষ্টা করলেও এটি তেমন কাজ করছে না। তবে ভায়েজ মনে করেন যে ইরানি শাসনব্যবস্থা চাপের মুখে ‘টিকে থাকার কৌশল’ গ্রহণ করেছে, যা তাদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিভাজনের চেয়ে সংহতিই বেশি জাগিয়ে তুলছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ও ‘ইম্প্রিন্ট’ থিংক ট্যাঙ্কের প্রতিষ্ঠাতা রোবিন্দর সাচদেব সতর্ক করে বলেছেন, ‘এখনকার আলোচনা যত দীর্ঘায়িত হবে, ততই বড় আকারে হামলার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। নেতানিয়াহুর মতো নেতারা ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারেন এবং এটি কেবল ঝড়ের আগের আপাত শান্ত অবস্থা।’
তিনি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাম্প্রতিক রাশিয়া সফরকে ‘সুইং ডিপ্লোমেসি’ (কূটনৈতিক দোলাচল) হিসেবে উল্লেখ করেন, যার মাধ্যমে তেহরান মস্কোর কাছ থেকে প্রযুক্তি ও গোলাবারুদের নিশ্চয়তা আদায়ের চেষ্টা করছে। তার মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইরান এখনও ইউরেনিয়াম সমর্পণের বিষয়ে এক ইঞ্চি জমি ছাড়তে রাজি নয়।
সামনে পথ কী : আপাতদৃষ্টিতে কূটনীতির সব পথ যেন বন্ধ হয়ে গেছে। তবু ইরান রাশিয়া ও পাকিস্তানের দরজায় কড়া নাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র বলছে, ‘কেবল সেই চুক্তিতে সই হবে যা আমাদের জনগণের স্বার্থে।’ ইরান বলছে, ‘হুমকি ও আলটিমেটামের জবাব নেই।’ এই অবস্থায় হরমুজ প্রণালি খোলার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। আর একটি ভুল পদক্ষেপ যুদ্ধের আগুন ছড়িয়ে দিতে পারে পুরো অঞ্চলে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সবচেয়ে বড় প্রশ্ন থেকে যায়, গালিবাফ কি ঠিক বলেছেন? যুক্তরাষ্ট্রের তুরুপের তাস কি সত্যিই ফুরিয়ে এসেছে? নাকি ডোনাল্ড ট্রাম্প কোনো না কোনো বিস্ময় সামনে আনবেন? আপাতত অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছু করার নেই।