মার্কিন ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টা বোর্ডের সব সদস্যকে একযোগে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় বিতর্ক শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে আটকে নেই; বড় হয়ে উঠেছে বিজ্ঞানের স্বাধীনতা, গবেষণা নীতিতে রাজনৈতিক প্রভাব এবং হোয়াইট হাউসের নিয়ন্ত্রণ প্রশ্ন। গবেষণায় তহবিল দেয়, নীতিনির্ধারণে পরামর্শ দেয়, ভবিষ্যৎ বিজ্ঞান কৌশল গঠনে ভূমিকা রাখে এমন একটি ঐতিহাসিক বোর্ডকে হঠাৎ সরিয়ে দেওয়ায় বিজ্ঞানীরা বলছেন, বিষয়টি কেবল পদচ্যুতি নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের বৈজ্ঞানিক পরামর্শ কাঠামোর ওপর আস্থার পরীক্ষাও। বিশেষ করে যখন এনএসএফ বাজেট কাটছাঁট, কর্মী সংকোচন ও গবেষণা অনুদান স্থবিরতার মধ্যে আছে, তখন এই পদক্ষেপের প্রভাব শুধু ওয়াশিংটনেই সীমিত থাকবে না তার অভিঘাত পড়তে পারে বিশ্ববিজ্ঞানের ক্ষমতার ভারসাম্যেও।
স্বাধীন বৈজ্ঞানিক পরামর্শব্যবস্থায় ধাক্কা : যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের ন্যাশনাল সায়েন্স বোর্ডের ২২ সদস্যকে একযোগে অপসারণকে অনেকেই দেখছেন বিজ্ঞান পরামর্শব্যবস্থায় নজিরবিহীন আঘাত হিসেবে। ২৪ এপ্রিল সদস্যরা একটি সংক্ষিপ্ত ই-মেইল পান। তাতে জানানো হয়, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষে তাদের দায়িত্ব ‘তাৎক্ষণিকভাবে’ শেষ করা হয়েছে। কেন এমন সিদ্ধান্ত, তার ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
বোর্ড সদস্যরা ছয় বছরের জন্য নিয়োগ পান। মেয়াদ এমনভাবে বিন্যস্ত থাকে যাতে একযোগে পুরো বোর্ড বদলে না যায়। ফলে পুরো বোর্ড একসঙ্গে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনা অভূতপূর্ব। ২০২২ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত বোর্ড চেয়ারম্যান ড্যান রিড বলেছেন, স্বাধীন ও শক্তিশালী বোর্ড ছাড়া বিজ্ঞান ও প্রকৌশল খাতের প্রতিনিধিত্ব দুর্বল হবে। ক্যালিফোর্নিয়ার কংগ্রেসওম্যান জো লফগ্রেন এই সিদ্ধান্তকে বিজ্ঞানের জন্য ক্ষতিকর বলেছেন। তার মতে, এটি মার্কিন উদ্ভাবনকেও আঘাত করছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই বোর্ড : ১৯৫০ সালে কংগ্রেস এনএসএফ ও ন্যাশনাল সায়েন্স বোর্ড গঠন করে। বোর্ড বছরে পাঁচবার বৈঠক করে। যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞান ও প্রকৌশলের অবস্থা নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করে প্রেসিডেন্ট ও কংগ্রেসকে পরামর্শ দেয়। আগামী ৫ মে বোর্ডের বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। সদস্যদের মতে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র চীনের কাছে বৈজ্ঞানিক অগ্রগামিতা হারাচ্ছে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন প্রকাশের প্রস্তুতি ছিল।
ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির জীববিজ্ঞানী রজার বিচি প্রশ্ন তুলেছেন এখন পরামর্শ আসবে কোথা থেকে? তার মতে, এটি শুধু বোর্ড নয়, যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞান ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন। ভ্যান্ডারবিল্ট ইউনিভার্সিটির জ্যোতির্পদার্থবিদ কেইভান স্টাসুন বলছেন, এটি বিজ্ঞানভিত্তিক পরামর্শ কাঠামোকে ‘ব্যবস্থাগতভাবে ক্ষয়’ করার বড় ধারার অংশ।
হোয়াইট হাউসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে শঙ্কা : বোর্ডের অন্যতম আইনি দায়িত্ব এনএসএফ বাজেট অনুমোদন। কিন্তু বরখাস্ত হওয়া সদস্যরা বলছেন, হোয়াইট হাউসের অফিস অব ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড বাজেট এনএসএফ নেতৃত্বকে বাজেট পরিকল্পনা বোর্ডের সঙ্গে ভাগ না করতে বলেছিল। সাবেক বোর্ড চেয়ারম্যান ভিক্টর ম্যাকক্রারি বলেছেন, বোর্ডকে কার্যত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থেকে দূরে রাখা হচ্ছিল। এ ঘটনাই অনেকের মনে প্রশ্ন তুলেছে এনএসএফ কি বিজ্ঞানীদের দ্বারা পরিচালিত স্বাধীন সংস্থা থাকবে, নাকি হোয়াইট হাউস নির্দেশিত সংস্থায় রূপ নেবে?
রজার বিচির ভাষায়, মূল প্রশ্ন এখন বিজ্ঞান কি বিজ্ঞানীরাই চালাবে? এই আশঙ্কা আরও বাড়ছে কারণ কংগ্রেসের আইনে প্রতিষ্ঠিত বোর্ড আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত করতে পারে কেবল কংগ্রেসই। তবু পুরো বোর্ড অপসারণের ঘটনা আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্ক উসকে দিয়েছে।
বাজেট কাটছাঁট ও প্রাতিষ্ঠানিক চাপ : বোর্ড অপসারণ এমন এক সময়ে হলো, যখন এনএসএফ নিজেই অস্থিরতার মধ্যে। ট্রাম্প প্রশাসন পরপর দুই বছর এনএসএফ বাজেট অর্ধেকের বেশি কমানোর প্রস্তাব দিয়েছিল, যদিও কংগ্রেস তা মানেনি। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে সংস্থাটি কর্মীর ৩০ শতাংশের বেশি হারিয়েছে। নতুন গবেষণা অনুদানও অনেক কমে গেছে। বিভাগগুলো বড় কাটছাঁটের প্রস্তুতিতে। সদর দফতরও অন্য সংস্থার কাছে ছেড়ে দিতে হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে বোর্ড সরিয়ে দেওয়া অনেকের চোখে কেবল প্রশাসনিক রদবদল নয় বরং গবেষণা তহবিল ও নীতিনির্ধারণে কেন্দ্রীভূত নিয়ন্ত্রণের সম্ভাব্য ধাপ। কিছু বরখাস্ত সদস্যের ধারণা, নতুন এনএসএফ পরিচালক মনোনীত জিম ও’নিলের জন্য নতুন উপদেষ্টা কাঠামো বানানোর পথ পরিষ্কার করতেই এটি হতে পারে। অন্যরা মনে করেন, ২০২৭ অর্থবছরের বাজেট রক্ষায় বোর্ডের কংগ্রেস-লবিং ঠেকাতেও এমন করা হয়ে থাকতে পারে।
আগেও ছিল এমন নজির : এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় এই যুক্তিও উঠছে। গত বছর ট্রাম্প প্রশাসন ভ্যাকসিন নীতিসংশ্লিষ্ট ১৭ সদস্যের উপদেষ্টা কমিটি ভেঙে দেয়। এনএসএফের ১৪ উপদেষ্টা কমিটিও বাতিল হয়। দীর্ঘ কোভিডবিষয়ক কমিটিসহ কয়েকটি ফেডারেল কমিটিও বিলোপ করা হয়।
ফলে সমালোচকদের মতে, সাম্প্র্রতিক পদক্ষেপ একটি ধারাবাহিকতার অংশ। যেখানে বিজ্ঞানভিত্তিক উপদেশব্যবস্থাকে ছোট করা হচ্ছে। তবে সমালোচনা শুধু প্রশাসনের দিকেই নয়। সামাজিকমাধ্যমে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, এনএসএফ বোর্ড নিজেই আগেভাগে আরও জোরালো প্রতিবাদ করলে কি পরিস্থিতি অন্যরকম হতে পারত?
মারভি মাতোস রদ্রিগেজ, যিনি বরখাস্ত সদস্যদের একজন। তিনি বলেছেন, সমালোচনায় যুক্তি আছে। তার ভাষায়, বোর্ডের আরও আগে উচ্চকণ্ঠ হওয়া উচিত ছিল।