লক্ষ্য ছিল এশিয়ান গেমস হকির বাছাইপর্বে ভালো খেলার। ম্যাচ বাই ম্যাচ পরিকল্পনা করে এগুনোর। ফাইনাল খেলবে দল এমন স্বপ্ন খোদ বাংলাদেশ জাতীয় নারী হকি দল মেয়েরাও দেখেননি। গতকাল সেমিফাইনালে সিঙ্গাপুরকে ৩-১ গোলে হারিয়ে ইতিহাস রচনা করেন হকির মেয়েরা। আইরিন আক্তার রিয়ার হ্যাটট্রিকে জয় তুলে নেয় লাল-সবুজের দল। ম্যাচ জয়ের পর মোবাইল ফোনে ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা থেকে সময়ের আলোকে রিয়া যেমন বলছিলেন, ‘বাছাইপর্বের ফাইনাল খেলব এমন স্বপ্ন মনে মনে ছিল, সেটি আজ (গতকাল) বাস্তবে রূপ দিতে পারলাম। এখন ফাইনাল জিতে ট্রফি নিয়ে ঘরে ফিরতে চাই। আমাদের দলের সেই সামর্থ্য আছে।’
ভুল বলেননি জাতীয় দলের উদীয়মান ফরোয়ার্ড হ্যাটট্রিক কন্যা রিয়া। এবারের এশিয়ান গেমস বাছাইপর্বের প্রতিটি ম্যাচেই উন্নতির ছাপ রেখেছেন তারা। চাইনিজ তাইপের বিপক্ষে ৫-৫ গোলের ড্রয়ে শুরু। এরপর উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ৩-২ গোলে জিতে কোয়ালিফাইয়ের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখে। পরে গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচে হংকং চায়নাকে ২-১ গোলে হারিয়ে শুধু সেমিফাইনালে জায়গা করে নেয়নি, বাংলাদেশ পায় মূলপর্বের খেলার টিকেট। চলতি বছর সেপ্টেম্বরে জাপানে অনুষ্ঠিত হবে এশিয়ান গেমসের মূলপর্ব।
মূলপর্বের টিকেট পাওয়ার পর থেকেই বদলে যায় পুরো দলের চিত্র। জয়ের ক্ষুধা বেড়ে যায় মেয়েদের। সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে কাল সেমিফাইনালে সেই ক্ষুধা আর জয়ের নেশায় মত্ত মেয়েদের দুর্দান্ত প্রতাপ দেখল হকি বিশ্ব। ম্যাচের ৫৬ মিনিট পর্যন্ত বাংলাদেশ-সিঙ্গাপুরের স্কোর লাইন ছিল সমান ১-১ গোল। সেখান থেকে ৫৭ ও ৫৮ মিনিটে পরপর দুই গোল করে প্রতিপক্ষকে শুধু ম্যাচ থেকেই ছিটকে দেননি, হ্যাটট্রিক করে দলকে ফাইনালে তোলেন আইরিন রিয়া।
প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে খেলতে গিয়ে একের পর এক চমক দেখাল মেয়েরা। বাংলাদেশ নারী হকি দলের এটিই প্রথম আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট। ছেলেদের দল এশিয়ান গেমসের বাছাইপর্বে এখন পর্যন্ত চারবার ফাইনাল খেলে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে দুবার। মেয়েরা প্রথম আসরে করেছে বাজিমাত। জাকার্তার জিবিকে হকি মাঠে আজ প্রথম তিন কোয়ার্টারে বাংলাদেশকে বেশ ভুগিয়েছে সিঙ্গাপুর। যদিও বিশ্ব হকির র্যাঙ্কিংয়ে ৩৬ নম্বরে থাকা দলটির বিপক্ষে দশম মিনিটেই আইরিন রিয়ার ফিল্ড গোলে এগিয়ে যায় বাংলাদেশ। এর দুই মিনিট পরই পেনাল্টি কর্নার থেকে দলকে সমতায় ফেরান সিঙ্গাপুরের চিয়া চেরি।
গোল হজমের পর কিছুটা সতর্ক হয়েই আক্রমণ করে বাংলাদেশের মেয়েরা। ১৭ মিনিটে বাংলাদেশও একটি পেনাল্টি কর্নার পায়, কিন্তু নাদিরা সেটিকে গোলে রূপ দিতে পারেননি। ১-১ সমতায় শেষ হয় দ্বিতীয় কোয়ার্টার। তৃতীয় কোয়ার্টারে বাংলাদেশের আক্রমণগুলো সিঙ্গাপুরের গোলমুখেই ঘুরপাক খেয়েছে। ৪২ মিনিটে বাংলাদেশ দ্বিতীয় পেনাল্টি কর্নার পেলেও অধিনায়ক অর্পিতা পাল গোল করতে পারেননি। ৪৫ মিনিটে শারিকার দারুণ হিট থামিয়ে দেন প্রতিপক্ষ গোলরক্ষক ইলিয়া।
চতুর্থ কোয়ার্টারের ৪৭ ও ৪৮ মিনিটে দুটি পেনাল্টি কর্নার পেলেও বল জালে জড়াতে পারেনি বাংলাদেশ। তবে দেরিতে হলেও ম্যাচে ফেরে জাহিদ হোসেনের দল। ৫৭ মিনিটে কনা আক্তারের পাস থেকে ফিল্ড গোল করেন আইরিন। এক মিনিট পর আবারও ফিল্ড গোলে আইরিন নিজের হ্যাটট্রিকও পূর্ণ করেন। ম্যাচ শেষে বাংলাদেশের কোচ জাহিদ হোসেন রাজু মোবাইল ফোনে ইন্দোনেশিয়া থেকে সময়ের আলোকে জানান, মেয়েরা সত্যিই ইতিহাস গড়ে ফেলল। এটি ওদের টিম গেমের ফল। ওদের বন্ডিং এত চমৎকার যা ভাষায় প্রকাশের নয়। আমরা এবার প্রথম থেকেই একই ছন্দে খেলছি। আগের তিন ম্যাচের মতো আজও (গতকাল) শেষ কোয়ার্টারে গোল করে ম্যাচ জিতেছি। ফাইনালেও জিতব এবং ট্রফি নিয়ে দেশে ফিরব। আমার দলের সেই সামর্থ্য আছে।