বিজ্ঞানসম্মত ও মানবকেন্দ্রিক উদ্যোগ গ্রহণ

মো. শামীম মিয়া

মতামত

বাংলার আকাশে মেঘ জমা নতুন কোনো দৃশ্য নয়; বরং এটি ঋতুচক্রের স্বাভাবিক ছন্দেরই অংশ। কালবৈশাখীর ঝড়, বিদ্যুতের ঝলকানি কিংবা গর্জনমুখর

2026-04-29T15:39:23+00:00
2026-04-29T15:39:23+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬,
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
মতামত
বিজ্ঞানসম্মত ও মানবকেন্দ্রিক উদ্যোগ গ্রহণ
মো. শামীম মিয়া
প্রকাশ: বুধবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬, ৩:৩৯ পিএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
বাংলার আকাশে মেঘ জমা নতুন কোনো দৃশ্য নয়; বরং এটি ঋতুচক্রের স্বাভাবিক ছন্দেরই অংশ। কালবৈশাখীর ঝড়, বিদ্যুতের ঝলকানি কিংবা গর্জনমুখর মেঘ- এসবের সঙ্গে এই ভূখণ্ডের মানুষের সহাবস্থান বহু শতাব্দীর। কিন্তু যে প্রশ্নটি এখন ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছে, তা হলো- এই চিরচেনা প্রাকৃতিক ঘটনাটি কখন এবং কীভাবে এক নীরব মৃত্যুফাঁদে পরিণত হলো? কেন বজ্রপাত, যা একসময় ছিল ক্ষণস্থায়ী ভীতি, আজ গ্রামবাংলার মানুষের জন্য এক অনিবার্য মৃত্যুঝুঁকির প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে? ২০২৬ সালের এপ্রিল মাস সেই প্রশ্নকে শুধু নতুন করে উত্থাপনই করেনি, বরং রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতি ও বাস্তবতার মধ্যে গভীর ব্যবধানকেও নির্মমভাবে উন্মোচিত করেছে। 

চলতি বছরের বজ্রপাতজনিত প্রাণহানির পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যার হিসাব নয়; এটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার এক নিরাবরণ প্রতিচ্ছবি। ২৬ এপ্রিল, ২০২৬ তারিখে দেশের বিভিন্ন জেলায় অন্তত ১৪ জন মানুষের মৃত্যু। যার মধ্যে গাইবান্ধার চরাঞ্চলে একসঙ্গে ৫ জন শ্রমজীবী মানুষের প্রাণহানি- একটি বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়, বরং একটি কাঠামোগত সংকটের বহিঃপ্রকাশ। এর আগেই এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে মৃতের সংখ্যা ৬০ ছাড়িয়ে গেছে, যা প্রমাণ করে এই দুর্যোগ কোনো আকস্মিকতা নয়, বরং একটি ধারাবাহিক ও পূর্বানুমানযোগ্য বিপর্যয়। ফলে প্রশ্নটি অনিবার্য হয়ে ওঠে- এই মৃত্যুগুলো কি সত্যিই অনিবার্য, নাকি এগুলো প্রতিরোধযোগ্য ছিল, যদি রাষ্ট্র তার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে কার্যকর ভূমিকা রাখত? বজ্রপাতজনিত মৃত্যুর ভৌগোলিক বণ্টন বিশ্লেষণ করলে একটি স্পষ্ট বৈষম্য সামনে আসে। 

উত্তরবঙ্গের গাইবান্ধা, সিরাজগঞ্জ, জামালপুর, ঠাকুরগাঁওসহ বিভিন্ন জেলা যেন এই দুর্যোগের স্থায়ী কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এর পেছনে রয়েছে ভৌগোলিক ও পরিবেশগত বাস্তবতা- চরাঞ্চল ও হাওড়ের বিস্তীর্ণ খোলা ভূমি, যেখানে উঁচু গাছ বা নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব রয়েছে। ফলে বজ্রপাতের সময় মানুষ কার্যত উন্মুক্ত লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। এই বাস্তবতা নতুন নয়; বহু বছর ধরেই বিশেষজ্ঞরা এই ঝুঁকির কথা বলে আসছেন। কিন্তু সেই অনুযায়ী কোনো টেকসই অবকাঠামোগত ব্যবস্থা গড়ে না ওঠা রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের সীমাবদ্ধতাকেই স্পষ্ট করে।
আরও পড়ুন

২০১৬ পরিকল্পনার গোলকধাঁধা
সরকার ২০১৬ সালে বজ্রপাতকে ‘জাতীয় দুর্যোগ’ হিসেবে ঘোষণা করে। সেই সময় ঢাকঢোল পিটিয়ে বলা হয়েছিল, এবার সাধারণ মানুষের জীবন বাঁচবে। ঘোষণার রেশ কাটতে না কাটতেই ২০১৬ সালে নেওয়া হয় সেই বিতর্কিত ও উচ্চাভিলাষী ‘তালগাছ রোপণ প্রকল্প’। দেশজুড়ে ১০ লাখ তালগাছ লাগানোর কথা বলা হয়েছিল এই যুক্তিতে যে, উঁচু তালগাছ বজ্রপাত শোষণ করে নেবে। আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে যদি সেই প্রকল্পের ময়নাতদন্ত করা হয়, তবে দেখা যাবে কয়েক কোটি টাকা খরচ হলেও সুফল আসেনি। সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সিংহভাগ চারা আজ অস্তিত্বহীন। আর বৈজ্ঞানিকভাবে একটি তালগাছ বজ্রপাত প্রতিরোধের উপযোগী হতে সময় নেয় ২০ থেকে ৩০ বছর। তা হলে প্রশ্ন জাগে, এই দীর্ঘ সময়ে যারা মারা যাচ্ছেন, তাদের জীবনের দায়ভার কে নেবে? যখন খোদ সরকারি নথিতেই প্রকল্পের সাল এবং লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে বিভ্রান্তি থাকে, তখন মাঠ পর্যায়ের বাস্তবায়নে শৈথিল্য থাকাটাই স্বাভাবিক। 

পেশাভিত্তিক বিশ্লেষণ আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। নিহতদের প্রায় ৭০ শতাংশই কৃষক ও মৎস্যজীবী- অর্থাৎ সমাজের সেই অংশ, যারা দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করে। এই তথ্য শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি উন্নয়ন কাঠামোর একটি অন্তর্নিহিত বৈষম্যের প্রতিফলন। শহরের মানুষ যেখানে বজ্রপাতের সময় নিরাপদ আশ্রয়ে অবস্থান করতে পারে, সেখানে গ্রামীণ শ্রমজীবী মানুষ জীবিকার প্রয়োজনে খোলা আকাশের নিচে কাজ করতে বাধ্য হয়। ফলে বজ্রপাত এখানে কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; এটি একটি সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নও হয়ে দাঁড়ায়। রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়ার দিকে তাকালে একটি পুনরাবৃত্ত চিত্র দেখা যায়। প্রতিটি বড় দুর্ঘটনার পর প্রশাসনিক তৎপরতা বৃদ্ধি পায়- মিটিং, সেমিনার, প্রকল্প প্রস্তাব এবং গণমাধ্যমে প্রতিশ্রুতির বন্যা। বজ্রপাত নিরোধক দণ্ড স্থাপন, তালগাছ রোপণ, আগাম সতর্কবার্তা প্রেরণ- এসব উদ্যোগ বারবার ঘোষিত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এই উদ্যোগগুলো ধারাবাহিকতা হারিয়েছে। ‘লাইটিং অ্যারেস্টার’ স্থাপন বা গ্রামীণ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের মতো কার্যকর প্রকল্পগুলো পরিকল্পনার স্তরেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। ফলে প্রশ্ন জাগে- সমস্যার সমাধানে আমরা কি সত্যিই আগ্রহী, নাকি কেবল প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির চক্রেই আবদ্ধ?

প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ পিছিয়ে নেই। আবহাওয়া পূর্বাভাসের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বজ্রপাতের সম্ভাবনা আগাম শনাক্ত করা সম্ভব। কিন্তু এই তথ্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে। একটি কার্যকর আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা- যেখানে মোবাইল বার্তা, সাইরেন বা স্থানীয় সম্প্রচার ব্যবস্থার মাধ্যমে অন্তত ৩০ মিনিট আগে সতর্কতা পৌঁছানো যাবে- এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও তার সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না, যা মূলত ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকেই নির্দেশ করে। 

বৃক্ষরোপণ উদ্যোগও এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। তালগাছ লাগানোর কর্মসূচি একসময় ব্যাপক প্রচার পেয়েছিল এবং এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তিও রয়েছে। উঁচু গাছ বজ্রপাতকে আকর্ষণ করে এবং মানুষের ঝুঁকি কমায়। কিন্তু এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে পরিকল্পনার অভাব ছিল প্রকট। বিচ্ছিন্নভাবে গাছ লাগানো হলেও একটি সমন্বিত, দীর্ঘমেয়াদি এবং বৈজ্ঞানিক কর্মসূচির অভাবে এর কার্যকারিতা সীমিত হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে দ্রুত বর্ধনশীল অন্যান্য বৃক্ষ প্রজাতি অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়নি। বজ্রপাতের প্রভাব কেবল প্রাণহানিতে সীমাবদ্ধ নয়; এর অর্থনৈতিক অভিঘাতও গভীর। গবাদিপশুর মৃত্যু, সেচ যন্ত্রপাতির ক্ষতি এবং কৃষিকাজে বিঘ্ন- সব মিলিয়ে গ্রামীণ অর্থনীতি বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হয়। একটি গরু হারানো একটি পরিবারের জন্য আর্থিক বিপর্যয়ের সমান, আর একটি সেচ পাম্প নষ্ট হওয়া পুরো মৌসুমের উৎপাদনকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়। কিন্তু এই ক্ষতির জন্য কার্যকর ক্ষতিপূরণ বা পুনর্বাসন ব্যবস্থার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

এই প্রেক্ষাপটে সমাধানের পথ নির্ধারণ করা জরুরি। প্রথমত অবকাঠামোগত উন্নয়ন-প্রতিটি ইউনিয়নের খোলা মাঠে বজ্রপাত নিরোধক টাওয়ার এবং ছোট আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত প্রযুক্তিনির্ভর আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী দ্রুত তথ্য পেতে পারে। তৃতীয়ত, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে-স্কুল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় সংগঠনগুলোকে সম্পৃক্ত করে মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাবিষয়ক জ্ঞান ছড়িয়ে দিতে হবে। চতুর্থত একটি সমন্বিত বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হবে। সবশেষে একটি মৌলিক সত্য স্বীকার করা প্রয়োজন- বজ্রপাত একটি প্রাকৃতিক ঘটনা, কিন্তু এর ফলে প্রাণহানি অনেকাংশেই প্রতিরোধযোগ্য। এই প্রতিরোধে ব্যর্থ হলে তা প্রাকৃতিক নয়, বরং মানবসৃষ্ট ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচিত হবে। আমরা যদি এখনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থ হই, তা হলে প্রতি বছর একই ধরনের শোকাবহ দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটবে। গাইবান্ধার কৃষক, সুনামগঞ্জের মৎস্যজীবী কিংবা সিরাজগঞ্জের শ্রমজীবী মানুষ- তারা কেউই মৃত্যুকে বেছে নেয় না; তারা কেবল জীবিকার প্রয়োজনে ঝুঁকির মধ্যে কাজ করে। রাষ্ট্র যদি তাদের জন্য ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারে, তবে উন্নয়নের সব অর্জনই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। সময় এখনও আছে, কিন্তু তা দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। এখনই যদি কার্যকর, বিজ্ঞানসম্মত এবং মানবকেন্দ্রিক উদ্যোগ গ্রহণ করা না হয়, তা হলে ইতিহাস এই সময়কে প্রাকৃতিক দুর্যোগের নয়, বরং রাষ্ট্রীয় উদাসীনতার এক নির্মম অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত করবে। তখন বজ্রপাত আর কেবল আকাশের বিদ্যুৎ হয়ে থাকবে না; এটি হয়ে উঠবে আমাদের পরিকল্পনাহীনতা, অবহেলা এবং ব্যর্থতার এক উজ্জ্বল প্রতীক।

লেখক ও শিক্ষার্থী, ফুলছড়ি সরকারি কলেজ, গাইবান্ধা 

এএডি/


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: