সোশ্যাল মিডিয়া কি প্যারালাল সরকার হয়ে যাচ্ছে

অদিতি করিম

প্রযুক্তি

একটি সরকারি সংস্থায় মহাপরিচালক পদ শূন্য হলো। এই পদের জন্য যিনি যোগ্য, সিনিয়র এবং সৎ—তার পদোন্নতি প্রায় নিশ্চিত ছিল। কিন্তু

2026-04-29T17:18:39+00:00
2026-04-29T17:18:39+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
প্রযুক্তি
সোশ্যাল মিডিয়া কি প্যারালাল সরকার হয়ে যাচ্ছে
অদিতি করিম
প্রকাশ: বুধবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১৮ পিএম 
সুন্দর পিচাই, মার্ক জাকারবার্গ ও নীল মোহন। ছবি : সময়ের আলো
একটি সরকারি সংস্থায় মহাপরিচালক পদ শূন্য হলো। এই পদের জন্য যিনি যোগ্য, সিনিয়র এবং সৎ—তার পদোন্নতি প্রায় নিশ্চিত ছিল। কিন্তু যেদিন তার পদোন্নতির আদেশ জারি হওয়ার কথা, সেদিনই বিদেশে অবস্থানরত এক ইউটিউবার তার বিরুদ্ধে একটি কনটেন্ট প্রকাশ করে। মুহূর্তেই তা ভাইরাল হয়ে যায়। 

কনটেন্টটিতে কোনো তথ্য-প্রমাণ ছিল না—শুধু গালাগালি ও ভিত্তিহীন অভিযোগ। এমন সব কথা বলা হয়, যার সঙ্গে ওই কর্মকর্তার কোনো সম্পর্কই নেই। তবুও কনটেন্টটি প্রচারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার পদোন্নতি আটকে যায়।

ইউটিউবার বিদেশে থাকলেও বাংলাদেশে তার ব্যাপক দর্শকসংখ্যা রয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ আশঙ্কায় পড়ে যান—এ অবস্থায় তাকে পদোন্নতি দিলে হয়তো তাদের বিরুদ্ধেও কুরুচিপূর্ণ আক্রমণ হতে পারে। ফলে তাকে বাদ দিয়ে একজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তা ইউটিউবে প্রচারিত কনটেন্টের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিতে চেষ্টা করেন। কিন্তু আদালত তার মামলাটি গ্রহণই করে না। কারণ জানতে তিনি বিচারকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বিচারক তার পরিচিত ছিলেন। খাস কামরায় ডেকে চা পান করিয়ে বিচারক বলেন— এরা খুবই বিপজ্জনক। এদের বিরুদ্ধে মামলা নিলে আমারই বিপদ হবে। 

অবশেষে হতাশ হয়ে ওই কর্মকর্তা চাকরি থেকে ইস্তফা দেন। চাকরি ছাড়ার এক মাস পর তিনি জানতে পারেন, যিনি মহাপরিচালক হয়েছেন, তিনিই ইউটিউবারকে ম্যানেজ করে তার বিরুদ্ধে এই কনটেন্টটি তৈরি করিয়েছিলেন।

এই একটি ঘটনাই প্রমাণ করে—বাংলাদেশে সোশ্যাল মিডিয়া কতটা ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ার কোনো জবাবদিহিতা নেই, নেই কার্যকর নিয়ন্ত্রণ। অনেকের মতে, এটি যেন এক ধরনের সমান্তরাল ক্ষমতা কাঠামোতে পরিণত হয়েছে, যা সরকারি সিদ্ধান্তেও প্রভাব ফেলছে।

রাজনীতিবিদ, আমলা, পুলিশ, শিক্ষক, ব্যবসায়ী—সবাই এক ধরনের আতঙ্কে রয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ার আড়ালে চলছে ব্ল্যাকমেল ও চাঁদাবাজির মহোৎসব। গুজব ও অপতথ্য ছড়িয়ে সরকারকে বিব্রত করা হচ্ছে, ক্ষুণ্ন হচ্ছে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি।

ভিউনির্ভর এই কনটেন্ট ব্যবসায়ীরা প্রথমে কাউকে টার্গেট করে। এরপর তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে। যোগাযোগ সফল হলে সরাসরি চাঁদা দাবি করে। অনেক সময় এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া ছবি বা মিথ্যা অভিযোগ দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে ফেসবুক ও ইউটিউবে এসব ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।

অনেকে সামাজিক লজ্জার ভয়ে এসব চাপে নতি স্বীকার করেন। যেমন, একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হঠাৎ হোয়াটসঅ্যাপে একাধিক ছবি পান। তিনি বুঝতে পারেন, এগুলো ডিপফেক। কিন্তু লজ্জায় বিষয়টি আইটি বিভাগে না জানিয়ে শেষ পর্যন্ত টাকা দিয়ে বিষয়টি মীমাংসা করেন।

তবে সবাই এমন করেননি। এক বিচারপতি একই ধরনের হুমকি পেলে তিনি ইউটিউবারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন। কিন্তু দুই দিনের মধ্যেই তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে অপপ্রচার শুরু হয়। যাচাই-বাছাই না করেই সরকার তাকে অনির্দিষ্টকালের ছুটিতে পাঠায়। অপমানিত হয়ে তিনি পদত্যাগ করেন। এরপর থেকে অনেক বিচারকই সোশ্যাল মিডিয়া-সংক্রান্ত অভিযোগ নিতে অনীহা দেখান।

ফলে দেশে চরিত্রহননের এক ভয়াবহ প্রবণতা তৈরি হয়েছে। চাঁদাবাজি যেন এক স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করা হলেও নাগরিকদের সাইবার সুরক্ষার জন্য কার্যকর কোনো নতুন আইন করা হয়নি। ফলে মানুষ কার্যত আইনি সুরক্ষাহীন হয়ে পড়েছে। এতে সাইবার অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।

সাম্প্রতিক সময়ে দেখা গেছে, বহু মামলা শুধুমাত্র সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্টের ভিত্তিতে করা হচ্ছে। বিদেশে বসে কেউ ফেসবুক বা ইউটিউবে অভিযোগ তুললেই যাচাই ছাড়াই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আসামি করা হচ্ছে।

এ অবস্থায় অনেকেই মনে করছেন—বাংলাদেশে সোশ্যাল মিডিয়াই যেন আইন, তারাই তদন্তকারী, তারাই বিচারক। বর্তমানে দেশে একটি নির্বাচিত সরকার রয়েছে, যার ক্ষমতার উৎস জনগণ—সোশ্যাল মিডিয়া নয়। তাই এই অরাজকতা নিয়ন্ত্রণ করা এখন জরুরি হয়ে উঠেছে।


সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহারে ব্যবসায়ীরা আতঙ্কিত, আমলারা ভীত, সাধারণ মানুষ উদ্বিগ্ন। নারীরা লাঞ্ছনার শিকার হচ্ছেন, অনেকের সংসার ভেঙে যাচ্ছে, কেউ কেউ আত্মহত্যার পথও বেছে নিচ্ছেন।

বিশ্বের অন্যান্য দেশেও একসময় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। তবে তারা আইন প্রণয়ন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে। উদাহরণস্বরূপ, ভারতে সোশ্যাল মিডিয়া হয়রানির ঘটনায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সাইবার হয়রানির শিকার হওয়ার পর এক অভিনেতার মেয়ের ঘটনায় পুলিশ অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে।

ভারত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোকে আইনের আওতায় এনেছে। ফেসবুক ও ইউটিউবের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্থানীয় কার্যালয় খুলতে বাধ্য করেছে। ফলে ভুয়া বা ক্ষতিকর কনটেন্ট দ্রুত সরিয়ে ফেলা সম্ভব হচ্ছে।

তথ্যপ্রযুক্তি আইন ২০০০ এবং ২০২১ সালের আইটি রুলসের মাধ্যমে ভারত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বজায় রেখেও অপতথ্য ও গুজব প্রতিরোধে সফল হয়েছে। এছাড়া আয়ারল্যান্ড, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশ মেটা ও গুগলকে জরিমানা করেছে এবং কঠোর আইন প্রয়োগ করছে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশে এখনো এই প্ল্যাটফর্মগুলোর কোনো স্থানীয় অফিস নেই, যদিও দেশে কোটি কোটি ব্যবহারকারী রয়েছে। প্রতিবছর বিপুল অর্থ আয় করলেও তারা সরাসরি জবাবদিহিতার আওতায় নেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকার চাইলে এসব প্রতিষ্ঠানকে দেশে অফিস খুলতে বাধ্য করতে পারে এবং নাগরিকদের সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর আইন প্রণয়ন করতে পারে। তা না হলে সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহার একসময় রাষ্ট্রের জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।


/ইউএমএইচ


  বিষয়:   সুন্দর পিচাই  মার্ক জাকারবার্গ  নীল মোহন 


Loading...
Loading...
প্রযুক্তি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: