টানটান উত্তেজনা আর নজিরবিহীন ভোটদানের রেকর্ডকে সঙ্গী করে যবনিকা পড়ল বঙ্গ ভোটযুদ্ধের। বুধবার (২৯ এপ্রিল) রাজ্যের দ্বিতীয় তথা শেষ দফার ভোট মিটতেই এখন সবার নজর বুথফেরত সমীক্ষার দিকে। অধিকাংশ সংস্থার ইঙ্গিত, বাংলার মসনদে এবার পরিবর্তনের হাওয়া প্রবল। বিজেপি সংখ্যাগরিষ্ঠতার জাদুসংখ্যা ছুঁয়ে ফেলতে পারে বলে দাবি করা হয়েছে অধিকাংশ সমীক্ষায়। যদিও পাল্টা রণহুঙ্কার দিয়ে তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ রিপোর্ট বলছে, ফের বিপুল ব্যবধানে ক্ষমতায় ফিরছে ঘাসফুলই। ২৯৪ আসনের বিধানসভায় ম্যাজিক ফিগার ১৪৮। আগামী ৪ মে ভাগ্য নির্ধারিত হবে প্রার্থীদের।
২০১১ সালের পরিবর্তনের নির্বাচনের সেই ৮৪.৩৩ শতাংশ ভোটদানের রেকর্ড এবার ভেঙে চুরমার। দুই দফা মিলিয়ে রাজ্যে ভোটদানের হার দাঁড়িয়েছে ৯১.৬৮ শতাংশে। বুধবার দ্বিতীয় দফায় বিকেল ৫টা পর্যন্ত ১৪২টি আসনে ভোট পড়েছে ৯০ শতাংশের উপরে। প্রথম দফায় ১৫২টি আসনে ভোটের হার ছিল ৯৩.১৩ শতাংশ। বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে যা সর্বকালের সেরা রেকর্ড। এই বিপুল জনজোয়ার কার দিকে যাবে, তা নিয়ে শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
কমিশনের তথ্য বলছে, রাজ্যে এবার মোট ভোটার ৬ কোটি ৮২ লক্ষ ৫২ হাজার ৬০৩। যার মধ্যে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ৬ কোটি ২৫ লক্ষ ৭৬ হাজারের বেশি মানুষ ভোট দিয়েছেন।
বুথফেরত সমীক্ষায় ম্যাট্রিজের দাবি, বিজেপি এবার পেতে পারে ১৪৬ থেকে ১৬১টি আসন। তৃণমূলের ঝুলিতে যেতে পারে ১২৫ থেকে ১৪০টি। চাণক্য স্ট্র্যাটেজির হিসেবে বিজেপি ১৫০ ছাড়িয়ে ১৬০ পর্যন্ত যেতে পারে, যেখানে তৃণমূলের জন্য ধরা হয়েছে ১৩০ থেকে ১৪০টি আসন। পি-মার্ক আরও একধাপ এগিয়ে বিজেপিকে ১৫০ থেকে ১৭৫টি আসন দিচ্ছে। পোল ডায়েরির সমীক্ষা অনুযায়ী বিজেপি ১৪২ থেকে ১৭১ এবং তৃণমূল ৯৯ থেকে ১২৭টি আসনে জিততে পারে। প্রজা পোল গেরুয়া শিবিরের জন্য আরও বড় ঝড়ের পূর্বাভাস দিয়ে ১৭৮ থেকে ২০৮টি আসনের ইঙ্গিত দিয়েছে। অধিকাংশ সমীক্ষাতেই বিজেপিকে জয়ী দেখানো হয়েছে। তবে সব সমীক্ষাই যে বিজেপির পালে হাওয়া দিচ্ছে তা নয়। পিপল্স পাল্স-এর সমীক্ষায় তৃণমূল অনেকটাই এগিয়ে। তাদের মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল পেতে পারে ১১৭ থেকে ১৮৭টি আসন। এখানে বিজেপির আসন সংখ্যা নামিয়ে আনা হয়েছে ৯৫ থেকে ১১০-এর ঘরে।
বাম-কংগ্রেসের ঝুলি সর্বত্রই প্রায় শূন্য। কোনও কোনও সমীক্ষায় সংযুক্ত মোর্চাকে বড়জোর ৪ থেকে ১০টি আসন দেওয়া হয়েছে। অধিকাংশ সমীক্ষায় বামেরা শূন্য থেকে এক এবং কংগ্রেসকে ১ থেকে ৫টি আসনের মধ্যে রাখা হয়েছে। পি-মার্কের সমীক্ষায় অন্যান্যেরা কোনও আসনই পাচ্ছে না।
ভোট মিটতেই তৃণমূলের অন্দর থেকে উঠে এসেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ছবি। ঘাসফুল শিবিরের অভ্যন্তরীণ রিপোর্ট দাবি করছে, এবার তারা ২৩০টি আসন পেতে চলেছে। তৃণমূলের তরফে দাবি করা হয়েছে, ‘নন্দীগ্রাম এবং ভবানীপুর, উভয় কেন্দ্রেই শুভেন্দু অধিকারীর পরাজয় নিশ্চিত।’ জয়ের বিষয়ে এতটাই আত্মবিশ্বাসী শাসক শিবির যে, রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুরের সঙ্গে ডিজে বাজিয়ে বর্ণাঢ্য উদযাপনের প্রস্তুতিও সেরে রাখা হয়েছে। সামাজিক ও রাজনৈতিক ইস্যুকে হাতিয়ার করে তারা বড় জয়ের প্রত্যাশা করছে।
রাজনীতির কারবারিদের একাংশ মনে করাচ্ছেন, বুথফেরত সমীক্ষা সবসময় মেলে না। হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের এই আবহে শেষ হাসি কে হাসবে, তা জানা যাবে আগামী শনিবার। একদিকে গেরুয়া শিবিরের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার দাবি, অন্যদিকে তৃণমূলের বিপুল জয়ের প্রত্যাশা—সব মিলিয়ে ৪ মে-র আগে বাংলা এখন রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষায়। ভোটদানের যে নজির বাংলা গড়ল, তা শেষ পর্যন্ত কার কপালে জয়ের তিলক পরায়, সেটাই এখন কোটি টাকার প্রশ্ন। তবে সমীক্ষার ফল যাই হোক না কেন, বাংলার মসনদ দখলের লড়াইতে এক ইঞ্চি জমিও কেউ কাউকে ছাড়েনি। ভোট শেষের এক ঘণ্টা বাকি থাকতেই নজির গড়েছে বাংলা। এবার পালা কেবল চূড়ান্ত হিসাবের। ৪ মে স্পষ্ট হবে কোন সমীক্ষা টিকল আর কোন দাবি ধোপে টিকল না। ‘পরিবর্তন’ নাকি ‘প্রত্যাবর্তন’, উত্তরের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে গোটা দেশ।
/ইউএমএইচ