জয়দেবপুর স্টেশনে সাধারণত থামে না পঞ্চগড় এক্সপ্রেস। কিন্তু শেষ নভেম্বরের রাতে কেন যেন থেমে গেল। আর থামল তো থামল, তারপর চলার নাম নেই। প্রায় ১৫ মিনিট হয়ে গেছে। রাত একটা পার হয়েছে। ঢাকা থেকে ছাড়ার সময় মনে হয়নি কিন্তু এখন শীত করছে জুয়েলের। শীত করার বিষয়টা আবার আসলে যতটা না বাস্তব, তারচেয়ে বেশি মানসিক অনুভূতি। মোতালেব স্যার ওদের এটাই শিখিয়েছে। স্কুলের রসায়ণের এই শিক্ষকের স্বভাব ছিল এমন। পড়ানোর সাথে সাখে আরো নানা বিষয় মাথায় ঢোকাতেন। তিনি নিজেই বলতেন, ‘আমার আসলে কেমিস্ট্রি না, সাইকোলজি পড়া উচিত ছিল।’
জয়দেবপুর স্টেশনে কেন মোতালেব স্যারের কথা মনে পড়বে সেটা নিয়ে জুয়েল বিরক্ত বোধ করে। তারপর মনে হয় চায়ের তৃষ্ণা হয়েছে। ভার্সিটি পড়ুয়া আর দশটা আড্ডাবাজ ছেলের মতো কাপের পর কাপ চা খাওয়ার অভ্যাস হয়েছে জুয়েলেরও। বিশেষ পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত ক্রেভিং হয়। ট্রেনে উঠেছে আর চা খাবে না তা তো হয় না। সাধারণত ট্রেন ছাড়ার পরপরই ট্রেনের লোকেরা চা, নাস্তা, পোলাও, বিরিয়ানি নিয়ে ঘুরতে থাকে। এদেরও কোনো খবর নেই আজকে।
জুয়েল বুঝতে পারে, চায়ের বেপারিদের আনাগোনা না থাকাই তার মধ্যে চায়ের তৃষ্ণা বাড়িয়েছে। এটাই সাইকোলজি। মস্তিষ্ক তাকে বলছে, এখন চা খেতেই হবে! তার প্রয়োজন নেই চায়ের কিন্তু সে চা খেতে চাইছে। মোতালেব স্যার থাকলে এই ব্যাখ্যাই দিতেন। ট্রেনও দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ২০ মিনিট। গতিশীল থাকার কথা যে মানুষের, থেমে থাকলে তার নানাকিছু করতে মন চায়। জুয়েলের মন চাইছে—চা। অগত্যা প্ল্যাটফর্মে নামল জুয়েল।
নভেম্বরের রাত একটা পরও জয়দেবপুর স্টেশন সজাগ। কেবল ভবঘুরে বা ছিন্নমূল মানুষ না, আরো কিছু মানুষ দেখা যায়। এদের কেউ যাত্রী, কেউ মাতাল, কেউ চোর। এসব দেখে অভ্যস্ত জুয়েল। তিন চারটা চায়ের দোকান, স্টেশন মাস্টারসহ রেলের আরো কিছু ঘর এখনো কর্মব্যস্ত। ২০২৫ সালে এসে রাতের স্টেশন নিয়ে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আর জুয়েল এক কাপ চা খেয়েই চলে যাবে।
কালো শার্টের ওপর বুক খোলা হুডি পরা চা দোকানদার কাচের গ্লাসে লিকার ঢেলেছিল। তারপর মেশাল কনডেন্সড মিল্ক। চায়ে বাদামি রঙ আসতে না আসতেই ট্রেনে হুইসেল শোনা গেল। মুখ খারাপ করতে মন চাইল জুয়েলের। চা খুব না খেলেও যখন খায়, আয়েশ করেই খায়। সেটা মাঠে মারা যাওয়ার উপক্রম। দোকানদার হুইসেল শুনেই একটা পেপার কাপ বের করে তাতে চা ঢালতে ঢালতে বলল, ‘ওয়ান টাইমে দিলাম মামা। উইঠা যান ট্রেনে। দশ টাকা দেন।’
পেপার কাপে চা ঢাললে স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়। জুয়েলের পছন্দ না একদমই। কিন্তু এখন চা খেতেই হবে। এদিকে ট্রেনের চাকাও গড়াতে শুরু করেছে। জুয়েল এক হাতে কাপ ধরে আরেক হাতে বগির হাতল ধরে উঠে গেল ‘ছ’ বগিতে। খুব বেশি সমস্যা হয়নি। ব্যাগপত্র নিয়ে ওঠার অভ্যাস আছে। দরজায় দাঁড়িয়েই চুমুক দিল একটা। স্বাদ নষ্ট হয়েছে অনেকটাই। তবু চা পাওয়া গেল। ট্রেনও চলছে। মনটা ভালো লাগে জুয়েলের। তারপর গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেল সিটের দিকে। সেখানে পৌঁছেই চমক। একটা মেয়ে বসে আছে তার পাশের সিটে।
পঞ্চগড় এক্সপ্রেসে সিট ফাঁকা থাকে খুবই কম। জুয়েল খুশি হয়েছিল নিজের পাশের সিটটা ফাঁকা দেখে। কিন্তু বেশিক্ষণ থাকল না ফাঁকা। সম্ভবত মেয়েটা শেষ মুহূর্তের যাত্রী। গার্ড বা রেল পুলিশকে ধরে সিটটা নিয়েছে। আর যা হয়, নারী যাত্রী মানেই সে উইন্ডো সিটটা চাইবে। জুয়েল আবারো চুমুক দিল চায়ে। আরো বিস্বাদ ঠেকল পেপার কাপের চা।
কিন্তু মেয়েটা সিট চাইল না। বরং সপ্রভিত হয়ে জুয়েলকে তার উইন্ডো সিটে যেতে দিল। জুয়েল বসল। কোনো কথা বলল না কেউ। শেষ চুমুক দিয়ে জুয়েল কাপটা ছুঁড়ে ফেলল জানালার বাইরে।
খানিকটা তন্দ্রা এসেছিল জুয়েলের। এমন সময় মেয়েটা বলল, ‘কিছু মনে করবেন না...’
মেয়েটা ‘এক্সকিউজ মি’ বলেনি। বলার কথাও না। তার বেশবাস সাধারণ। দেখে জুয়েলের মনে হলো মফস্বলের মেয়ে হবে। বয়স বিশের কিছু বেশি হলেও হতে পারে। গায়ে সাধারণ সালোয়ার কামিজ। একটা শাল জড়ানো। সাবেকি একটা ভাব আছে সর্বাঙ্গে। তবে খেয়াল করেছিল, মেয়েটার চোখ দুটো। ভারতের অভিনেত্রী মীণাক্ষী শেষাদ্রির কথা মনে করিয়ে দিয়েছে চোখদুটো।
জুয়েল খানিকটা মুখ ঘোরাল। কোনো কথা বলল না। কেবল একটু ‘হু’ করল। ট্রেনে অপরিচিত প্রায়-সুন্দরী নারীর সঙ্গে আলাপ পাড়া বিপজ্জনক হতে পারে—তার সেটাই ভাবনা।
মেয়েটা বলল, ‘আমি ফ্লাস্কে চা এনেছি। চা খাব। আপনি কি একটু খাবেন?’
যাত্রাপথে অপরিচিত কারো দেয়া কিছু খাওয়া যাবে না, সেকথা বহু আগেই তাকে তার বাবা মা শিখিয়ে দিয়েছিল। জুয়েল জানে, যাত্রাপথে সুন্দরী মেয়েরাও থাকে অজ্ঞানপার্টির হয়ে কাজ করার জন্য। সুতরাং সে, ‘না না, ধন্যবাদ। আমি কেবলই খেলাম। আপনি খান’ বলে ভদ্রভাবে নাকোচ করে দিল।
মেয়েটাও বুঝল। মিষ্টি করে হাসল সে। তারপর ব্যাগ হাতড়ে বের করল রূপারঙের একটা ফ্লাস্ক। একটা পেপার কাপও বের করে নিল। জুয়েল খেয়াল করল কয়েকটা পেপার কাপ আছে মেয়েটার কাছে। জুয়েল ভেবে নিল, ওই কাপের নির্দিষ্ট কোনো একটাতে হয়ত ওষুধ মেশানো। কিন্তু সে থমকে গেল মেয়েটার চা ঢালার দৃশ্যে।
২.
আজকের দিনে এসে চারপাশে যা ঘটছে, মানুষকে বিশ্বাস করা কঠিন। তবু মানুষ সামাজিক জীব। সহযাত্রীর সঙ্গে পরিচয় হয়। কথা হয়। দুই থেকে চার ঘন্টার যাত্রায় একজন জেনে যায় আরেকজন সম্পর্কে। জুয়েল জানল মাইশার কথা। না, সে মফস্বলের মেয়ে না। ইডেন কলেজের ছাত্রী। বড় হয়েছে ঢাকাতেই। তবে তার এই সাদামাটা বেশবাস, কম কথা বলার একটা কারণ আছে। সেটা জুয়েল বুঝতে পেরেছিল চা ঢালার দৃশ্য থেকেই।
তার পরবর্তী দুই ঘন্টায় বেশকিছু কথাই হয়েছে মাইশার সঙ্গে। তার পড়াশোনা ইংরেজি নিয়ে। বাবার মধ্যম মানের সরকারি চাকরি। সীমিত বেতন। বোন আছে একটা ছোট। মা মারা গেছে তিন বছর আগে। সংসারের দায়িত্ব মাইশার ওপর। কিন্তু কেন যেন বছরখানেক আগে থেকে চোখের জ্যোতি কমতে শুরু করল। তারপর এক সময় ডাক্তার জানাল চোখে তার ছানি। এখন খুব বেশি দূর অবধি দেখতে পায় না সে। ছবি আঁকতে খুব ভালোবাসে কিন্তু এখন আঁকতে গেলে চোখের ওপর চাপ পড়ে। ছেড়েই দিয়েছে এক রকম!
টার্গেটকে ম্যানিপুলেট করতে এরকম অনেক গল্পই ফাঁদা যায়, জুয়েল জানে। কিন্তু তার পরও তার মন আর্দ্র হয়। দ্বিতীয়বার মাইশা চা ঢাললে সে নিজেই চেয়ে নিল এক কাপ। ফ্লাস্কে রাখা পেপার কাপের দিকে তাকাল একবার। তারপর চুমুক দিলো। ট্রেনটা তখন চলছে খুব দ্রুত। থেমে থাকার সময়টা মেকআপ করার চেষ্টা সম্ভবত।
জুয়েল ঘুমিয়ে ছিল অনেকক্ষণ। তার মধ্যে কয়েকবার ঘুম ভেঙেও গেছে। ঘুমের মধ্যেই তার মনে হয়েছিল চা খেয়ে ভুল করেছে সে। ঘুমটা পুরোপুরি ভাঙলেই দেখবে তার ফোন, মানিব্যাগ, ল্যাপটপ না-ই হয়ে গেছে।
কিন্তু সকালের আলো ফুটতেই ঘুম যখন ভাঙল জুয়েলের, ফোনটা তার ডান পকেটেই আছে। ল্যাপটপের ব্যাগটাও আছে ল্যাপটপসহ। মাইশা নেই। কিন্তু তাদের রাতের চায়ের দুটো পেপার কাপ পড়ে আছে পায়ের কাছে। রাতের বাতাসে পড়ে গেছে সম্ভবত। একটা কাপে চোখ আটকাল জুয়েলের। কাপের সাদা অংশে লাল আর নীল কালি দিয়ে আঁকতে চেষ্টা করা হয়েছে কোনো দৃশ্য—জানলার পাশে ঘুমন্ত এক যুবকের মাথার সাইড ভিউ। মাইশার দৃষ্টির মতোই ঝাপসা সেই ছবি সকালের আলোয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে পেপার কাপের ওপর।