বরিশালের বানারীপাড়ায় সন্ধ্যা নদীর করাল গ্রাসে বিলীন হচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম। বর্ষা মৌসুমের শুরুতে নদী ভাঙন যখন আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে, ঠিক তখনই প্রশাসন কর্তৃক নতুন করে বালুমহাল ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তে স্থানীয়দের মাঝে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।
নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে এই ইজারা দেওয়ায় ভাঙন পরিস্থিতি আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা করছেন নদীপাড়ের বাসিন্দারা।
বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার সলিয়াবাকপুর, বাইশারী, সৈয়দকাঠী, সদর ও চাখার ইউনিয়নসহ বিস্তীর্ণ এলাকার বহু গ্রাম এখন নদীগর্ভে। খেজুরবাড়ি, গোয়াইলবাড়ি, নাটুয়ার পাড়, দাসেরহাট ও জম্বুদ্বীপের মতো এলাকাগুলোর সিংহভাগই এখন সন্ধ্যার পেটে। ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি হারিয়ে শত শত পরিবার আজ সর্বস্বান্ত। পার্শ্ববর্তী উজিরপুর উপজেলার শিকারপুর ও ডাবেরকুল এলাকাতেও একই চিত্র দেখা গেছে।
নদী ভাঙনের তীব্রতায় ঝুঁকিতে রয়েছে শিয়ালকাঠী ফেরিঘাট, উত্তর নাজিরপুর জামে মসজিদ ও মসজিদবাড়ী স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ অন্তত ডজনখানেক সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে উত্তরকুল ও নলশ্রী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ৪-৫ বার পর্যন্ত স্থানান্তর করতে হয়েছে। স্থানীয় অনেক পরিবারকেও বসতভিটা রক্ষায় বারবার ঘর সরাতে হয়েছে।
স্থানীয়দের তীব্র প্রতিবাদ সত্ত্বেও বরিশাল জেলা প্রশাসন সম্প্রতি খেজুরবাড়ি ও মসজিদবাড়ী পয়েন্টে যথাক্রমে দুই ও সাত একর জমি বালুমহাল হিসেবে ইজারা দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, মুসলিম ট্রেডার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠান এই ইজারা পেয়েছে। অথচ ‘বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০’ অনুযায়ী— তীর ভাঙনের ঝুঁকি থাকলে বা পরিবেশ ও মৎস্য সম্পদের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকলে সেখান থেকে বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত অনুবাদক ও সাবেক এনবিআর সদস্য আলী আহমদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যেখানে নদী ভাঙন রোধে সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন, সেখানে প্রশাসন 'বালুখেকোদের' সুযোগ করে দিচ্ছে। মসজিদবাড়ী স্কুল অ্যান্ড কলেজটি ৪ বার বিলীন হওয়ার পর ফের নদীর কিনারায় চলে এসেছে।
ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. নজরুল ইসলাম ফিরোজ ও সহকারী শিক্ষক মো. খাইরুল ইসলাম রাসেল জানান, বারবার স্কুল-মাদরাসা সরিয়েও নদী থেকে নিস্তার পাওয়া যাচ্ছে না। এই মুহূর্তে বালু উত্তোলন মানে হলো প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া।
ইলিশসহ নানা মৎস্য সম্পদে সমৃদ্ধ সন্ধ্যা নদী। নির্বিচারে বালু উত্তোলনের ফলে মাছের প্রজনন ক্ষেত্রগুলো নষ্ট হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে স্থানীয় হাজারো জেলের জীবন-জীবিকার ওপর।
বালুমহাল ইজারা দেওয়ার যৌক্তিকতা তুলে ধরে বানারীপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. বায়েজিদুর রহমান বলেন, উন্নয়নমূলক কাজে বালুর চাহিদা রয়েছে। অবৈধভাবে বালু উত্তোলন রোধ করতেই মূলত বৈধ বালুমহাল ইজারা দেওয়া হয়েছে।
তবে এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক ও জেলা বালুমহাল কমিটির সভাপতি মো. খায়রুল আলম সুমনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অসহায় এলাকাবাসী এখন স্থানীয় সংসদ সদস্য এস সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টুর হস্তক্ষেপ কামনা করছেন। তাদের দাবি— বালুমহাল বাতিল করে ব্লক ও জিও ব্যাগ ফেলে স্থায়ীভাবে নদী ভাঙন রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক।
সময়ের আলো/জোই