বর্তমান বিশ্ব এক ‘আত্মঘাতী’ পুঁজিবাদী মডেলের হুমকির মুখে। এই মডেল যুদ্ধ, ফ্যাসিবাদ বাড়াচ্ছে এবং মানবজাতিকে সম্ভাব্য বিলুপ্তির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় ৫৭টি দেশের সরকারকে নিয়ে এক সম্মেলন আহ্বান করে এ সতর্কবার্তা দিয়েছেন কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো। দ্য গার্ডিয়ান।
জীবাশ্ম জ্বালানির স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করে তিনি বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর ঠেকাতে তারা আরও অস্বাভাবিক পদক্ষেপ নিচ্ছে।
পেত্রো সতর্ক করে বলেন, এই প্রত্নতাত্ত্বিক জ্বালানি জীবাশ্ম জ্বালানির ক্ষমতা ও অর্থনীতিতে এক জড়তা রয়েছে, যা ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। নিঃসন্দেহে, এই পুঁজিবাদ আত্মঘাতী। আর সঙ্গে নিয়ে যেতে পারে মানবতা ও অন্যান্য প্রাণকে। প্রশ্নটি হলো, পুঁজিবাদ কি সত্যিই অ-জীবাশ্ম জ্বালানি মডেলের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে?
কলম্বিয়ার মানুষ আগামী মাসে নতুন নেতা নির্বাচনে ভোট দিতে যাচ্ছেন। ২০২২ সালে দেশটির প্রথম বামপন্থি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত পেত্রো সংবিধান অনুযায়ী টানা দ্বিতীয় মেয়াদে প্রার্থী হতে পারছেন না। সাবেক এই অর্থনীতিবিদ ও গেরিলা সদস্য মনে করেন, বিশ্ব এক বিপজ্জনক অবস্থার দিকে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, আমরা বর্বরতার দিকে ধাবিত হচ্ছি। আর এই বর্বরতাই ফ্যাসিবাদের সূচনা বা তার মূল উপাদান।
জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে উত্তরণে প্রথম বৈশ্বিক সম্মেলন : উপকূলীয় শহর সান্তা মার্তায় জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে উত্তরণে বিশ্বের প্রথম সম্মেলনটির আয়োজন করে কলম্বিয়া। গত মঙ্গলবার থেকে সরকারি মন্ত্রী ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দুই দিনের আলোচনা শুরু হয়। এর আগে ছিল চার দিনব্যাপী বেসামরিক সমাজের আলোচনা ও একাডেমিক কর্মশালার আয়োজন। কিছু দেশ ইতিমধ্যে জীবাশ্ম জ্বালানি বন্ধের কর্মপরিকল্পনা তৈরি শুরু করেছে।
কলম্বিয়া গত সপ্তাহে তাদের খসড়া পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। আর মঙ্গলবার ফ্রান্স প্রথম উন্নত দেশ হিসেবে জীবাশ্ম জ্বালানি বন্ধের জাতীয় রোডম্যাপ প্রকাশ করে। এতে রয়েছে, ২০২৭ সালের মধ্যে জাতীয় গ্রিড থেকে কয়লা অপসারণের সময়সীমা, ২০৪৫ সালের মধ্যে তেলনির্ভরতা শেষ করা এবং ২০৫০ সালের মধ্যে জীবাশ্ম গ্যাস নির্মূলের লক্ষ্য।
ফ্রান্সের দূত বেনোয়া ফারাকো বলেন, এটি প্যারিস চুক্তির অধীনে তাদের জাতীয় পরিকল্পনার চেয়েও এগিয়ে। তিনি গর্ব করে জানান, এই প্রক্রিয়া আমাদের উপলব্ধি করিয়েছে যে, আমরা একটি ‘ইলেক্ট্রো-সুপারপাওয়ার’ হতে চাই। আমরা বিদ্যুতের ক্ষেত্রে ইউরোপের ‘সৌদি আরব’ হতে চাই। ব্রিটেন, আয়ারল্যান্ড, জার্মানি ও অন্যান্য দেশে সবুজ ইলেকট্রন রফতানি করতে চাই।
বার্তা ‘ঋণমুক্তি ছাড়া জলবায়ু পদক্ষেপ অসম্ভব’ : দেশগুলো যখন কর্মপরিকল্পনার সময়সীমা ও নিম্নকার্বন প্রযুক্তি বৃদ্ধির বিস্তারিত আলোচনায় নামে, তখন উন্নয়নশীল দেশ ও অর্থবিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে একটি মূল বার্তা উঠে আসে– জলবায়ু পদক্ষেপের যেকোনো বৈশ্বিক কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে ঋণ সমস্যার সমাধান। জীবাশ্ম জ্বালানি চুক্তি উদ্যোগের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ার সিৎপোরাহ বারমান বলেন, বৈশ্বিক দক্ষিণের অনেক জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশকে তাদের ঋণ পরিশোধের জন্য আরও বেশি জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদন বাড়াতে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্বের দক্ষিণে একটি ক্রমবর্ধমান ঋণ সংকট তৈরি হয়েছে। এত সীমিত আর্থিক জায়গায় দেশগুলোর পক্ষে জ্বালানি রূপান্তরের কথা কল্পনাও করা অসম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, শুধু আফ্রিকার ঋণ গত পাঁচ বছরে দ্বিগুণ হয়ে ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে (যার আংশিক কারণ জীবাশ্ম জ্বালানি সংকট) সুদহার বাড়িয়েছে, যা ঋণের বোঝা আরও বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানি ও খাদ্যের আকাশছোঁয়া দাম বিপর্যস্ত অর্থনীতিগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
জীবাশ্ম জ্বালানি চুক্তি উদ্যোগের বিশেষ দূত ও কলম্বিয়ার সাবেক পরিবেশমন্ত্রী সুজানা মুহামাদ বলেন, যেসব দেশ ঋণের সুদ পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছে, তারা জীবাশ্ম জ্বালানি রফতানি আয় ছাড়া ওষুধ, সার ও প্রযুক্তির মতো পণ্য আমদানি করতে পারে না।
তিনি বলেন, এটি দেশগুলোর অর্থনীতি টিকিয়ে রাখার জন্য রাজস্ব আয়ের ওপর অর্থনৈতিক নির্ভরতার সমস্যা, পাশাপাশি বাণিজ্য ভারসাম্যেরও সমস্যা। দক্ষিণের অনেক প্রতিনিধিই একই রকম সমস্যার কথা বলেছেন। উচ্চঋণ পরিশোধ তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ খেয়ে ফেলেছে, আর উচ্চ সুদহার নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের জন্য ঋণ নেওয়া কঠিন করে তুলেছে।
ঋণমুক্তির দাবি : বেশ কয়েকজন বেসামরিক সমাজের কর্মী ঋণমুক্তির আহ্বান জানিয়েছেন। এশীয় জনগণের ঋণ ও উন্নয়ন আন্দোলনের সমন্বয়ক লিডি নাকপিল বলেন, সান্তা মার্তার উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিদের অবস্থানকে আমরা তা স্বাগত জানাই।
তিনি আরও বলেন, তাদের জনগণ যে ঋণ পরিশোধ করতে বাধ্য হচ্ছে, তার বেশিরভাগই তাদের কোনো উপকারে আসেনি বরং জনগণ ও গ্রহের ক্ষতি করেছে। যেমন জীবাশ্ম জ্বালানি প্রকল্পের বিপুল ঋণ।
যদিও এই সম্মেলন উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ঋণফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসতে ও ‘ন্যায্য রূপান্তরে’ অর্থায়নের জন্য নতুন অঙ্গীকার ঘোষণা করবে না। তবে এটি এমন কিছু আর্থিক সংস্কারের ধারণা দিতে পারে, যা বিনিয়োগ উৎসাহিত করবে।
ই-থ্রি-জি থিঙ্কট্যাঙ্কের শক্তি রূপান্তরের ভারপ্রাপ্ত সহযোগী পরিচালক লিও রবার্টস বলেন, সান্তা মার্তা কখনোই জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে উত্তরণের অর্থায়নে বড় নতুন অঙ্ক ঘোষণার স্থান ছিল না। তবে এটি এমন একটি জায়গা যেখানে কথোপকথন হতে পারে। যেমন– ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের (বার্ষিক) ভর্তুকি সংস্কার করে সেগুলো অন্য খাতে পুনঃনির্ধারণ করা।
ওয়ার্ল্ড রিসোর্সেস ইনস্টিটিউট থিঙ্কট্যাঙ্কের অর্থ ও বেসরকারি খাত বিভাগের সিনিয়র ডিরেক্টর নিক রবিন্স বলেন, দেশগুলোর উচিত ‘জীবাশ্ম জ্বালানির আর্থিক অক্সিজেন বন্ধ করে দেওয়া’। যা করা যেতে পারে ব্যাংকিং নিয়ন্ত্রণ সংস্কারের মাধ্যমে। তার মতে, এতে জীবাশ্ম জ্বালানি শিল্পকে নিজেদের জলবায়ু ঝুঁকি নিজেরাই মূল্যায়ন করতে পারবে না এমন নির্দেশনাও অন্তর্ভুক্ত থাকা উচিত।
এফআর