ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বলেছেন, পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে একটি নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। তার মতে, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই এই পরিবর্তনের প্রক্রিয়া গড়ে উঠছে।
এক লিখিত বার্তায় তিনি জানান, ইরান এই অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং হরমুজ প্রণালীতে শত্রুদের অপব্যবহার বন্ধ করবে। তার ভাষায়, এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথকে নিয়ন্ত্রণ ও সুরক্ষিত রাখা ইরানের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
মোজতবা খামেনি আরও বলেন, হরমুজ প্রণালীর নতুন ব্যবস্থাপনা চালু করা হলে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে শান্তি ফিরে আসবে। এর ফলে শুধু স্থিতিশীলতাই নয়, অর্থনৈতিক উন্নয়নও হবে এবং উপসাগরীয় দেশগুলো এর সুফল পাবে।
তিনি বোঝাতে চেয়েছেন—ইরান এই কৌশলগত জলপথে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে চায় এবং তাদের দাবি অনুযায়ী, এতে করে অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সুবিধা বাড়বে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি যুক্তরাষ্ট্রকে লক্ষ্য করে তীব্র ভাষায় মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, পারস্য উপসাগরে আমেরিকানদের জায়গা “শুধু এর পানির তলদেশে”—যা অঞ্চলটিতে নতুন এক উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির ইঙ্গিত দেয়।
বৃহস্পতিবার দেওয়া এক লিখিত বক্তব্যে তিনি জানান, ইরান তার পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কোনোভাবেই ছাড়বে না। একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই সামরিক সক্ষমতা দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এটি রক্ষা করতে তারা বদ্ধপরিকর। তার এই বক্তব্য এমন সময় এসেছে, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি নাজুক যুদ্ধবিরতিকে স্থায়ী করার জন্য নতুন চুক্তির চেষ্টা করছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলায় তার বাবা ও সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর থেকেই মোজতবা খামেনি জনসমক্ষে খুব কমই এসেছেন। এমনকি মার্চে ক্ষমতা নেওয়ার পরও তাকে ভিডিওতে দেখা যায়নি। যদিও বিভিন্ন সূত্র বলছে, গুরুতর আঘাত পাওয়ার পরও তিনি মানসিকভাবে সচল আছেন এবং অডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বৈঠক পরিচালনা করছেন। তবে কিছু প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, তার হাতে আগের মতো পূর্ণ ক্ষমতা নেই, বরং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস-এর শীর্ষ কর্মকর্তাদের প্রভাব বাড়ছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের কারণে ইরানের তেল রপ্তানি মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তেলবাহী জাহাজগুলো খোলা সমুদ্রে যেতে পারছে না, ফলে দেশটির অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে। একই সময় বৈশ্বিক বাজারেও প্রভাব পড়েছে—ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২৬ ডলারে পৌঁছেছে।
বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় অংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়—প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়ে যায়। এই পথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বর্তমান উত্তেজনা বিশ্ব অর্থনীতির ওপরও বড় চাপ সৃষ্টি করছে।
মোজতবা খামেনি তার বক্তব্যে বলেন, আল্লাহর সাহায্যে পারস্য উপসাগরের ভবিষ্যৎ হবে আমেরিকামুক্ত। তিনি দাবি করেন, ইরান ও তার প্রতিবেশীদের ভাগ্য একসূত্রে গাঁথা, তবে বাইরের শক্তিগুলোর এখানে কোনো জায়গা নেই।
তিনি আরও ইঙ্গিত দেন, ইরান হরমুজ প্রণালীকে তাদের “নতুন ব্যবস্থাপনার” অধীনে রাখতে চায়। কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই পথ দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য ইরান উচ্চ ফি (কখনও ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত) আদায় করছে। যদিও আন্তর্জাতিক মহল এই প্রণালীকে উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক জলপথ হিসেবে দেখে এবং এমন ফি আরোপের বিরোধিতা করে।
উপসাগরীয় দেশগুলো, বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরানের এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছে এবং এটিকে জলদস্যুতার সঙ্গে তুলনা করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে। একদিকে ওয়াশিংটন ইরানের অর্থনৈতিক শক্তি কমাতে চায়, অন্যদিকে তেহরান এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চাইছে—যা বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলছে।
/ইউএমএইচ