হার্টের রোগ নিয়ে ১০টি মিথ, নীরবে বাড়ছে প্রাণঘাতী ঝুঁকি

সময়ের আলো ডেস্ক

ফিচার

বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হৃদরোগ। আধুনিক জীবনযাপন, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, মানসিক চাপ ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার কারণে এই ঝুঁকি দিন দিন

2026-05-02T19:38:15+00:00
2026-05-02T19:38:15+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
ফিচার
হার্টের রোগ নিয়ে ১০টি মিথ, নীরবে বাড়ছে প্রাণঘাতী ঝুঁকি
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২ মে, ২০২৬, ৭:৩৮ পিএম 
হার্টের রোগের প্রতীকী চিত্র। সংগৃহীত ছবি
বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হৃদরোগ। আধুনিক জীবনযাপন, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, মানসিক চাপ ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার কারণে এই ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু উদ্বেগজনক বিষয় হলো— এই রোগ নিয়ে এখনও সমাজে প্রচলিত রয়েছে অসংখ্য ভুল ধারণা বা ‘মিথ’। এসব মিথ অনেক সময় মানুষকে মিথ্যা নিরাপত্তাবোধে ভোগায়, ফলে সময়মতো সতর্ক হওয়া বা চিকিৎসা নেওয়া হয় না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সচেতনতার অভাবই হার্টের রোগকে আরও মারাত্মক করে তুলছে।

হার্টের স্বাস্থ্য নির্ভর করে শুধু বয়স বা পারিবারিক ইতিহাসের ওপর নয়, বরং এটি একটি সমন্বিত বিষয়, যেখানে জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস, ব্যায়াম, মানসিক চাপ এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞরা হার্টের রোগ নিয়ে প্রচলিত ১০টি বড় মিথ তুলে ধরে সেগুলোর বাস্তবতা ব্যাখ্যা করেছেন।

মিথ ১ : হার্টের রোগ শুধু বয়স্কদের হয়
এই ধারণাটি দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত। অনেক তরুণ মনে করেন, বয়স কম থাকায় তাঁরা নিরাপদ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অস্বাস্থ্যকর খাবার, অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত খাদ্য, ফাস্ট ফুড, ধূমপান, অ্যালকোহল গ্রহণ, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব এবং দীর্ঘসময় বসে থাকার অভ্যাস— এসব কারণে অল্প বয়স থেকেই ধীরে ধীরে রক্তনালীতে চর্বি জমতে শুরু করে। এর ফলে উচ্চ রক্তচাপ, কোলেস্টেরল ও ডায়াবেটিসের মতো সমস্যা দেখা দেয়, যা ভবিষ্যতে হৃদরোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। বর্তমানে তরুণদের মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের ঘটনাও আগের তুলনায় বেড়েছে।

মিথ ২ : হার্টের রোগ শুধুই পুরুষদের সমস্যা
অনেকেই মনে করেন নারীরা এই ঝুঁকি থেকে তুলনামূলকভাবে মুক্ত। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, এটি একটি বিপজ্জনক ভুল ধারণা। বিশ্বজুড়ে নারীদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণও হৃদরোগ। নারীদের ক্ষেত্রে সমস্যা হলো— তাদের উপসর্গ অনেক সময় ‘ক্লাসিক’ নয়। যেমন বুকে তীব্র ব্যথার বদলে তাঁরা ক্লান্তি, বমিভাব, হালকা শ্বাসকষ্ট বা ঘুমের সমস্যা অনুভব করতে পারেন। ফলে অনেক সময় বিষয়টি গুরুত্ব পায় না এবং চিকিৎসা নিতে দেরি হয়।

মিথ ৩ : কোনও উপসর্গ নেই মানেই হার্ট সুস্থ
এটি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ধারণাগুলোর একটি। উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ কোলেস্টেরল বা ব্লকেজ— এসব সমস্যা বছরের পর বছর কোনও লক্ষণ ছাড়াই শরীরে বাড়তে পারে। অনেকেই নিয়মিত পরীক্ষা না করানোর কারণে বিষয়টি জানতে পারেন না। একসময় হঠাৎ করেই হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের মতো গুরুতর ঘটনা ঘটে। তাই বিশেষজ্ঞরা নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, বিশেষ করে রক্তচাপ, রক্তের শর্করা ও কোলেস্টেরল মাপার পরামর্শ দেন।

মিথ ৪ : পারিবারিক ইতিহাস না থাকলে ঝুঁকি নেই
অনেকে মনে করেন, পরিবারে কারও হার্টের রোগ না থাকলে তাঁদের চিন্তার কারণ নেই। কিন্তু বাস্তবে জীবনযাপনই সবচেয়ে বড় নির্ধারক। প্রতিদিনের খাবার, শারীরিক কার্যকলাপের অভাব, ধূমপান, দূষণ এবং মানসিক চাপ— এসবই হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। অর্থাৎ, পারিবারিক ইতিহাস না থাকলেও অনিয়মিত জীবনযাপন একজন মানুষকে একইভাবে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।

মিথ ৫ : বুকে ব্যথাই হার্ট অ্যাটাকের একমাত্র লক্ষণ
হার্ট অ্যাটাক মানেই বুক চেপে ধরা ব্যথা— এমন ধারণা অনেকের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু এটি সবসময় সত্য নয়। অনেক সময় উপসর্গগুলো হয় সূক্ষ্ম—যেমন শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত ঘাম, মাথা ঘোরা, বমিভাব, অস্বাভাবিক ক্লান্তি বা ঘাড়, চোয়াল ও পিঠে ব্যথা। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে এই ‘নীরব’ উপসর্গ বেশি দেখা যায়। ফলে অনেকে বিষয়টি হজমের সমস্যা বা ক্লান্তি ভেবে অবহেলা করেন, যা বিপজ্জনক হতে পারে।


মিথ ৬ : আমি রোগা, তাই আমার ঝুঁকি নেই
শরীর পাতলা মানেই সুস্থ— এই ধারণা অনেকের। কিন্তু শরীরের ওজন কম হলেও যদি খাদ্যাভ্যাস খারাপ হয়, নিয়মিত ব্যায়াম না করা হয় বা কোলেস্টেরল বেশি থাকে, তাহলে ঝুঁকি থেকেই যায়। অনেক রোগা মানুষ ‘স্কিনি ফ্যাট’ অবস্থায় থাকেন, যেখানে শরীরের ভেতরে চর্বি জমে থাকে এবং তা হার্টের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

মিথ ৭ : শুধু ওষুধই যথেষ্ট
অনেকে মনে করেন, একবার ওষুধ শুরু করলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, ওষুধ কেবল একটি অংশ। এর পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন, লবণ ও চর্বি নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত ব্যায়াম, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং মানসিক চাপ কমানো অত্যন্ত জরুরি। শুধু ওষুধ খেয়ে জীবনযাপনে কোনও পরিবর্তন না আনলে দীর্ঘমেয়াদে সুফল পাওয়া যায় না।

মিথ ৮ : সব ধরনের ফ্যাট খারাপ
ফ্যাট শব্দটি শুনলেই অনেকেই ভয় পান। কিন্তু সব ফ্যাট সমান ক্ষতিকর নয়। বাদাম, মাছ, অলিভ অয়েল বা অ্যাভোকাডো থেকে পাওয়া ‘ভালো ফ্যাট’ হার্টের জন্য উপকারী এবং কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। তবে ট্রান্স ফ্যাট (প্রসেসড খাবার) ও অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড ফ্যাট (অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার) এড়িয়ে চলা উচিত।

মিথ ৯ : উচ্চ রক্তচাপ হলে বুঝতে পারবেন
উচ্চ রক্তচাপকে ‘নিঃশব্দ ঘাতক’ বলা হয় কারণ এটি সাধারণত কোনও লক্ষণ ছাড়াই বাড়তে থাকে। অনেক মানুষ স্বাভাবিক অনুভব করলেও ভেতরে ভেতরে রক্তনালীর ক্ষতি হতে থাকে। দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণে না থাকলে এটি হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক বা কিডনির সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়। তাই নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মিথ ১০ : হার্টের রোগ থাকলে ব্যায়াম করা উচিত নয়
অনেকে ভয় পান যে ব্যায়াম করলে হার্টের ওপর চাপ বাড়বে। কিন্তু সঠিক নিয়মে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যায়াম করলে বরং হার্ট আরও শক্তিশালী হয়। হাঁটা, হালকা দৌড়, সাঁতার বা যোগব্যায়ামের মতো কার্যকলাপ রক্ত সঞ্চালন বাড়ায় এবং শরীরকে সুস্থ রাখে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ভুল ধারণা দূর করা এখন অত্যন্ত জরুরি। কারণ সচেতনতা না থাকলে মানুষ দেরিতে চিকিৎসা নেয় এবং ঝুঁকি বেড়ে যায়। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সুষম খাদ্যাভ্যাস, ধূমপান পরিহার, পর্যাপ্ত ঘুম এবং সক্রিয় জীবনযাপন—এই সহজ অভ্যাসগুলোই হৃদরোগ প্রতিরোধে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

তাদের স্পষ্ট বার্তা— হার্টের যত্ন নেওয়ার জন্য বড় কোনও পরিবর্তনের অপেক্ষা নয়, বরং ছোট ছোট সচেতন পদক্ষেপই পারে একটি সুস্থ ও দীর্ঘ জীবনের ভিত্তি গড়ে তুলতে।

/ইউএমএইচ



  বিষয়:   হার্ট অ্যাটাক  হৃদরোগ 


Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: