আসন্ন বাজেটে নীতিগত দিকনির্দেশনা থাকতে হবে। যেহেতু আমাদের সম্পদ সঞ্চালন কম, সে কারণে ব্যয় সাশ্রয়ী বাজেট হতে হবে। বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকার ব্যাংকিং খাত থেকে প্রচুর পরিমাণে ঋণ নেয়। শুধু বাণিজ্যিক ব্যাংক নয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকেও সরকার ঋণ নেয়, যা অর্থনীতির জন্য আত্মঘাতী। বাজেটে ঘাটতি পূরণে আন্তর্জাতিক উৎসগুলোর প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে।
গতকাল শনিবার এফডিসিতে জীবনযাত্রায় জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব নিয়ে এক ছায়া সংসদে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ।
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক অস্থির পরিস্থিতিতে সাধারণ জনগণকে স্বস্তি দিতে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর ভ্যাট-ট্যাক্স সাময়িক তুলে দেওয়া যেতে পারে। তবে বাজার ব্যবস্থাপনা দুর্বল থাকলে এর ফলাফল পুরোপুরি পাওয়া যাবে না। রোজার মাসে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর ভ্যাট-ট্যাক্স কমানোতে ভোক্তারা কিছুটা স্বস্তি পেয়েছিল। বর্তমান সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড প্রদান আশাব্যাঞ্জক পদক্ষেপ।
তবে এর সুফল পেতে উপকারভোগী নির্বাচন ও ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। অতীতে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে অনেক অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। নিম্নবিত্তের জীবনকে সহায়তা করতে ভতুর্কি দেওয়া প্রয়োজন। তবে ভতুর্কি লক্ষ্যভিত্তিক হতে হবে। কৃষি, সেচ ও গণপরিবহনের মতো খাতগুলোতে ভর্তুকি প্রদানে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
ফাহমিদা খাতুন জানান, জ্বালানি ভর্তুকি সর্বজনীন না করে কেবল কৃষি, সেচ ও গণপরিবহন খাতে দেওয়া দরকার। বর্তমানে জ্বালানির ভর্তুকি দেশের উচ্চবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্তরাও ভোগ করছে, অথচ সর্বজনীন জ্বালানি ভর্তুকি দেওয়ার সক্ষমতা সরকারের নেই। সবার ভর্তুকি পাওয়া উচিতও নয়।
জ্বালানি খাতের অব্যবস্থাপনা নিয়ে ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, জ্বালানির মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতা দেখাতে হবে। আইএমএফের শর্ত হিসেবে সরকার প্রতি মাসে জ্বালানির দাম নির্ধারণের উদ্যোগ নিলেও আন্তর্জাতিক বাজারে যখন দাম কমে, তখন সরকার দাম না কমিয়ে মুনাফা করেছে। এই খাতে দুর্নীতিও আছে। তাই দাম নির্ধারণের পদ্ধতি স্বচ্ছতার সঙ্গে কার্যকর করতে হবে।
তিনি সরকারের অপ্রয়োজনীয় ব্যয় ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করে জ্বালানি অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি জ্বালানি মজুদ সক্ষমতা বাড়ানোর পরামর্শ দেন। নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধানের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, বিভিন্ন স্টাডিতে উঠে এসেছে যে কূপ খননের মাধ্যমে বাংলাদেশে গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।
আসন্ন বাজেট নিয়ে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক বলেন, আগামী বাজেটকে নিছক সরকারের এক বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব হিসেবে প্রণয়ন না করে ভঙ্গুর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার হাতিয়ার হিসেবে প্রণয়ন করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতার মধ্যে নিজস্ব অর্থনীতির ভিত্তি মজবুত করা এবং সরকারের নীতিমালার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠায় বাজেটে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার পক্ষে মত দেন।
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ৩০ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পর্যাপ্ত নয়। রফতানি কমে যাচ্ছে, শুধু রেমিট্যান্স দিয়ে রিজার্ভ বাড়ানো সম্ভব নয়। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ কমে জিডিপির অনুপাতে ২২ শতাংশে নেমে এসেছে, বৈদেশিক বিনিয়োগ নেই বললেই চলে। ফলে কর্মসংস্থান হচ্ছে না। তা হলে কীভাবে অর্থনীতির ভিত্তি মজবুত হবে?
এই পরিস্থিতি উত্তরণে বিনিয়োগের পরিবেশ নিশ্চিত করা, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং সামাজিক নিরাপত্তায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তিনি।
সভাপতির বক্তব্যে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ বলেন, দেশের অর্থনীতি একটা কঠিন সময় পার করছে। করোনা মহামারির ধাক্কা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও বিগত শাসনামলের অর্থনীতির ক্ষত, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতি, জ্বালানি সংকট, ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের নিম্নহার, কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা, উচ্চ ঋণখেলাপিসহ বৈদেশিক ঋণের চাপ মাথায় নিয়ে বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধ বিশ্বের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে উলটপালট করে দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম ও দেশে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি পাওয়ায় আমাদের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে। বৈশ্বিক মন্দা পরিস্থিতিতে সরকারের ওপর অহেতুক চাপ সৃষ্টি না করে কীভাবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা সহনশীল রাখা যায় তার জন্য রাজনৈতিক ঐক্য দরকার। এর জন্য সরকার ও বিরোধীদল কেউ কাউকে ব্যর্থ করার চেষ্টা না করে অতীত ইতিহাস থেকে অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশ পরিচালনায় দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, অন্যদিকে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করা সরকারকে তার জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে সাধারণ মানুষকে স্বস্তিতে রাখতে হবে। তাই বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় কিছু সময়ের জন্য নিত্যপণ্যের ওপর ভ্যাট-ট্যাক্স কমিয়ে ওএমএস এবং টিসিবির মাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্যে খাদ্য সরবরাহ বাড়ানো উচিত। সামাজিক সুরক্ষা খাতের কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়নে সরকারের প্রতিশ্রুতি নিমোর্হভাবে অব্যাহত রাখতে হবে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডের মতো আরও ফ্ল্যাগশিপ প্রোগ্রাম গ্রহণের মাধ্যমে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
‘জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নয়, বৈশ্বিক পরিস্থিতি জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার প্রধান কারণ’ শীর্ষক ছায়া সংসদ বিতর্ক প্রতিযোগিতায় ঢাকা কলেজের বিতার্কিকদের পরাজিত করে কবি নজরুল সরকারি কলেজের বিতার্কিকরা বিজয়ী হয়। প্রতিযোগিতায় বিচারক ছিলেন অধ্যাপক আবু মোহাম্মদ রইস, ড. এসএম মোর্শেদ, ড. তাজুল ইসলাম চৌধুরী তুহিন, সাংবাদিক আবুল কাশেম ও মাইদুর রহমান রুবেল। প্রতিযোগিতা শেষে অংশগ্রহণকারী দলকে ট্রফি, ক্রেস্ট ও সনদপত্র প্রদান করা হয়। ছায়া সংসদটি আয়োজন করে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি।
সময়ের আলো/আআ