মহান আল্লাহর আনুগত্য ছাড়া প্রকৃত মুসলমান হওয়া সম্ভব না। মানুষকে তিনি তাঁর আনুগত্যের জন্য সৃষ্টি করেছেন। তিনি দেখতে চান, কে তাঁর সবচেয়ে উত্তম আনুগত্য করতে পারে। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘তিনি ওই সত্তা যিনি জীবন-মরণ সৃষ্টি করেছেন, যেন পরীক্ষা করতে পারেন তোমাদের মধ্যে কর্মে শ্রেষ্ঠ কে! তিনি পরাক্রমশালী ও ক্ষমাময়’ (সুরা মুলক : ২)। একাধিক জায়গায় আল্লাহ নিজের ও তাঁর রাসুলের আনুগত্যের নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন- সুরা মুহাম্মদের ৩৩ নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের অনুসরণ করো আর নিজেদের নেক আমলকে নষ্ট করো না।’ অন্য জায়গায় নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, ‘তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করো, যেন তোমরা রহমতপ্রাপ্ত হও।’ (সুরা আলে ইমরান : ১৩২)
একই সঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বিভিন্ন মাখলুক ও সৃষ্টির আনুগত্যের নির্দেশনাও দিয়েছেন। যেমন- শাসকের আনুগত্য করতে বলা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে ঘোষিত হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করো আর আনুগত্য করো তোমাদের নীতিনির্ধারকদের’ (সুরা নিসা : ৫৯)। অনেক মুফাসসিরের মতে, নীতিনির্ধারক দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছেন শাসক। হোন তিনি রাষ্ট্রীয় কিংবা সামাজিক। এমনিভাবে মা-বাবার আনুগত্যের নির্দেশ এসেছে কুরআনের একাধিক স্থানে। যেমন-‘আর আপনার প্রভু নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা কেবল তাঁরই ইবাদত করবে এবং মা-বাবার সঙ্গে সদাচরণ করবে’ (সুরা বনি ইসরাইল : ২৩)। আর বলাবাহুল্য যে, আনুগত্য সদাচরণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। যদি তাদের আনুগত্যই না করা হয় তা হলে সদাচরণ পূর্ণতা পাবে না।
একইভাবে ওলামায়ে কেরাম, শিক্ষক ও বড়দের কথা মান্য করার কথাও এসেছে শরিয়তে। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা না জানলে আলেমদের কাছে জিগ্যেস করো’ (সুরা আম্বিয়া : ৭)। এ আয়াতে আলেমদের কথা মান্য করাকে আবশ্যক করা হয়েছে। অন্যথায় তাদের কাছে জিগ্যেস করার নির্দেশ দেওয়ায় কোনো যৌক্তিকতা নেই। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি বড়দের হক সম্পর্কে জানে না এবং ছোটদের প্রতি স্নেহশীল হয় না সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়’ (মুসনাদে আহমদ : ১২/২৯)। আর বড়দের হকের মধ্যে অন্যতম হলো, তাদের আনুগত্য করা। শিক্ষক ও ওস্তাদের কথা মান্য ও আনুগত্য করা তো ইলম পাওয়ার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। ইলম অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ আদবও এটা।
তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর বিরুদ্ধে গিয়ে এদের কারও আনুগত্য করা যাবে না। সেটা হারাম হবে। হজরত ইমরান বিন হুসাইন (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘স্রষ্টার অবাধ্যতা করে সৃষ্টির কোনো আনুগত্য হতে পারে না’ (জামিউস সগির : ৯৮৮৪)। হজরত আনাস বিন মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে আল্লাহর অনুগত নয় তার জন্য কোনো আনুগত্য নেই’ (জামিউস সগির : ৯৮৮২)। আরও অসংখ্য সাহাবি থেকে অনুরূপ হাদিস বর্ণিত হয়েছে। হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) খেলাফত লাভের পর প্রদত্ত ঐতিহাসিক ভাষণে বলেছিলেন, ‘আমি যদি ভালো কাজ করি তা হলে আপনারা আমার সহযোগিতা করবেন। আর যদি মন্দপথে ধাবিত হই তা হলে আমাকে সোজা পথে ফিরিয়ে নিয়ে আসবেন।’ তিনি আরও বলেছিলেন, ‘যদি আমি আল্লাহ ও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবাধ্য হয়ে যাই তা হলে আমার আনুগত্য করা আপনাদের জন্য জায়েজ হবে না।’ (খোলাফায়ে রাশেদিন : পৃষ্ঠা ৫০)
বর্তমানে দেখা যায়, মানুষের কথায় অনেকে শরিয়তবিরোধী কাজে লিপ্ত হয়ে যায়। মা-বাবা পছন্দ করে না বলে অনেকে নির্দ্বিধায় দাড়ি কেটে ফেলে। আরও জঘন্য হচ্ছে, অবৈধ প্রেমের সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে দাড়ি রাখে না অনেক তরুণ। নামাজে নিয়মিত হয় না। তাকওয়ার পোশাকে সজ্জিত হয় না। দ্বীন পালনে সচেষ্ট হয় না। কারণ তার সঙ্গিনী এসব পছন্দ করে না! প্রভাবশালী অসৎ নেতার কথায় অনেক ছেলে যেকোনো অপকর্মে রাজি হয়ে যায়।
একটুখানি আশীর্বাদ পেতে তথাকথিত নেতার নির্দেশে খুন-জখম থেকে শুরু করে হেন কোনো কাজ নেই যা করে না। তার সামান্য এক ইশারায় নিজের জীবন পর্যন্ত দিতে কুণ্ঠাবোধ করে না এরা। এতে আল্লাহর আনুগত্য হচ্ছে নাকি অবাধ্যতা সেটা একটু ভেবে দেখার সময় তাদের হয় না। কেমন যেন তার কথাই সব ঐশীবাণী। তার আনুগত্যই সবকিছু। তার অন্যথা করা যাবে না। এসব অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়। কোনো মুসলমানের জন্য এসব শোভা পায় না।
কারণ প্রকৃত মুসলমান কাউকে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর ওপরে রাখতে পারে না। কারো আনুগত্যকে আল্লাহ ও রাসুল (সা.)-এর আনুগত্যের ওপর প্রাধান্য দিতে পারে না। কারো কথায় তাঁদের অবাধ্য হতে পারে না। আল্লাহ তায়ালা আমাদের প্রকৃত অর্থে তাঁর অনুগত হওয়ার তওফিক দান করুন।
সময়ের আলো/ আআ