পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক সময়ের অপ্রতিরোধ্য নেতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর উত্থান ও পতন এখন রাজ্য রাজনীতির সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ছিলেন বাংলার “স্ট্রিট ফাইটার” মুখ, যিনি মিছিল, আন্দোলন এবং গণ-রাজনীতির মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে হারিয়ে ক্ষমতায় উঠেছিলেন।
রাস্তার রাজনীতি থেকে মুখ্যমন্ত্রীত্ব
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে “রাস্তার রাজনীতি” বা আন্দোলননির্ভর রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এই ধারাতেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেকে একজন তৃণমূল স্তরের নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। ১৯৮৪ সালে জাদবপুর লোকসভা আসনে সিপিআই(এম)-এর প্রবীণ নেতা সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে পরাজিত করে তিনি জাতীয় রাজনীতিতে আলোচনায় আসেন।
পরবর্তীতে কংগ্রেস ছেড়ে তিনি তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করেন এবং ধীরে ধীরে বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলেন। নন্দীগ্রাম ও সিঙ্গুরের জমি আন্দোলন তার রাজনৈতিক শক্তিকে আরও দৃঢ় করে তোলে, যা শেষ পর্যন্ত ২০১১ সালে বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটায়।
১৫ বছরের ক্ষমতা ও উন্নয়ন-অভিযোগের দ্বন্দ্ব
২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একাধিক সামাজিক প্রকল্প চালু করেন—নারী ভাতা, ছাত্র-ছাত্রী সহায়তা, কৃষক ও প্রবীণদের জন্য ভাতা ইত্যাদি। তবে একই সঙ্গে তার সরকারের বিরুদ্ধে ওঠে দুর্নীতি, স্বজনপোষণ এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার অভিযোগ।
তার শাসনকালে সারা রাজ্যে রাজনৈতিক সংঘর্ষ, বিরোধী দল দমন এবং একদলীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠার অভিযোগও ওঠে। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, এই কারণেই ধীরে ধীরে জনমনে অসন্তোষ বাড়তে থাকে।
রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও পরিবর্তন
নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা সংশোধন এবং লক্ষাধিক নাম বাদ পড়া নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস অভিযোগ তোলে যে বিরোধী ভোট কমানোর চেষ্টা হয়েছে। অন্যদিকে, বেকারত্ব ও শিল্পহীনতার অভিযোগও ভোটে বড় ইস্যু হয়ে ওঠে।
একই সঙ্গে রাজনৈতিক মেরুকরণ বাড়তে থাকে। কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন দল নরেন্দ্র মোদি-এর নেতৃত্বে ভারতীয় জনতা পার্টি ধীরে ধীরে পশ্চিমবঙ্গে সংগঠন বিস্তার করে এবং শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে আসে।
ধর্মীয় ও সামাজিক ইস্যু
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একদিকে এনআরসি, সিএএ এবং ইউসিসির বিরোধিতা করেন, অন্যদিকে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করেন। তবে বিজেপি তার বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু ভোটব্যাংক রাজনীতির অভিযোগ তোলে।
অন্যদিকে, বিভিন্ন ধর্মীয় প্রকল্প ও মন্দির নির্মাণ নিয়েও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়, যা ভোটের সময় নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়।
জনসমর্থনের পতন
বিশ্লেষকদের মতে, এক সময় নারী ভোটার এবং সাধারণ মানুষ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বড় শক্তি ছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ শাসন, কর্মসংস্থানের অভাব এবং পরিবর্তনের দাবি ধীরে ধীরে জনসমর্থনে প্রভাব ফেলে।
ভোটের ফলাফলে দেখা যায়, অনেক আগের সমর্থক গোষ্ঠীও এবার বিকল্পের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এতে করে তার দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে এবং রাজ্যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা হয়।
/ইউএমএইচ