জোড়া ফুলে পদ্মের আঘাত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

তৃণমূল কংগ্রেসের সুদীর্ঘ ১৫ বছর শাসনের অবসান ঘটিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় এবার সরকার গঠন করছে বিজেপি। গতকাল সোমবার ঘোষিত বিধানসভা নির্বাচনের

2026-05-04T23:58:20+00:00
2026-05-04T23:58:20+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
জোড়া ফুলে পদ্মের আঘাত
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ৪ মে, ২০২৬, ১১:৫৮ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
তৃণমূল কংগ্রেসের সুদীর্ঘ ১৫ বছর শাসনের অবসান ঘটিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় এবার সরকার গঠন করছে বিজেপি। গতকাল সোমবার ঘোষিত বিধানসভা নির্বাচনের ফল অনুযায়ী জোড়া ফুল কিংবা ঘাস ফুল বিপর্যস্ত হয়েছে বিজেপির পদ্মের আঘাতে। গতকাল বাংলাদেশ সময় রাত ১০টার দিকে যখন এই খবর লিখছি, তখন ভারতের নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী ১৭১টি আসনে জয় নিশ্চিতের পাশাপাশি ৩৭টিতে এগিয়ে ছিল বিজেপি। ৫৯টি আসনে জয় নিশ্চিতের পাশাপাশি তৃণমূল এগিয়ে ছিল ২০টি আসনে।

চূড়ান্ত ফল ঘোষণার আগেই ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দাবি করেছেন, পশ্চিমবঙ্গে পদ্ম ফুল ফুটেছে। ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। জনগণের শক্তির জয় হয়েছে এবং বিজেপির সুশাসনের রাজনীতি জয়ী হয়েছে। আমি পশ্চিমবঙ্গের প্রত্যেক ব্যক্তিকে প্রণাম জানাই। জনগণ বিজেপিকে এক অভূতপূর্ব রায় দিয়েছেন এবং আমি তাদের আশ্বাস দিচ্ছি যে, আমাদের দল পশ্চিমবঙ্গের মানুষের স্বপ্ন ও আকাক্সক্ষা পূরণের জন্য সম্ভাব্য সবকিছু করবে। তবে তৃণমূলের শীর্ষ নেত্রী ও বিদায়ি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় সাংবাদিকদের বলেন, বিজেপি ১০০টিরও বেশি আসন চুরি করেছে। বিজেপি জালিয়াতি করেছে। নির্বাচন কমিশন এখন বিজেপি কমিশনে পরিণত হয়েছে। আমরা বারবার এ নিয়ে অভিযোগ জানিয়েছি। কিন্তু কেউ শোনেনি। 

মমতা আরও বলেন, বিজেপির এই জয় অনৈতিক। প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর যোগসাজশে নির্বাচন কমিশন যা করেছে তা পুরোপুরি অনৈতিক। তারা জোরপূর্বক এসআইআর পরিচালনা করেছে। তারা অত্যাচার চালিয়েছে। তারা কাউন্টিং এজেন্টদের গ্রেফতার করেছে। আমরা লড়াই চালিয়ে যাব।

এবারের নির্বাচনে মূল লড়াই ছিল তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিজেপির মধ্যে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একসময়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং বর্তমানে বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী এই নির্বাচনে বিজেপির প্রধান মুখ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক ভোটার বাদ পড়ার পর অনুষ্ঠিত এই প্রথম নির্বাচনেই রাজ্যের শাসক দল বড়সড়ো বিপর্যয়ের মুখে পড়ল।

গত নির্বাচনে নন্দীগ্রামে মুখ্যমন্ত্রীকে পরাজিত করার পর এবার তিনি মমতার খাসতালুক বলে পরিচিত ভবানীপুর কেন্দ্রে সরাসরি লড়াই করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন। গতকাল এই খবর লেখা পর্যন্ত ওই আসনে মমতা কিছুটা পিছিয়ে ছিলেন।

বিজেপি এবং তৃণমূল ছাড়াও এই লড়াইয়ে বাম-কংগ্রেস জোট এবং তৃণমূলের বহিষ্কৃত বিধায়ক হুমায়ুন কবিরের নবগঠিত দলও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে, যা অনেক ক্ষেত্রেই ভোটের সমীকরণকে প্রভাবিত করেছে। তারাও ২টি আসনে জয় পেতে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

রাজ্যের ২৯৪টি আসনের বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে প্রয়োজন ১৪৮টি আসন। বুথফেরত সমীক্ষাগুলো কোনো নির্দিষ্ট দলের নিরঙ্কুশ জয়ের আভাস দিতে না পারলেও গণনার শুরু থেকেই বিজেপি বড় ব্যবধানে এগিয়ে যেতে শুরু করে। ২০২১ সালের নির্বাচনে যেখানে তৃণমূল ২১৫টি আসন পেয়ে ক্ষমতা দখল করেছিল এবং বিজেপি ৭৭টি আসনে থমকে গিয়েছিল, সেখানে এবারের ফলাফল সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী চিত্র তুলে ধরছে। গতবার বাম এবং কংগ্রেস কোনো আসন না পেলেও এবার তাদের প্রাপ্তি বা ভোট কাটাকাটির প্রভাব শাসক দলের জন্য চড়া মূল্য নিয়ে এসেছে।

তৃণমূলের পরাজয়ের নেপথ্য কারণ : এবারের নির্বাচনি প্রচারে তৃণমূলের পক্ষ থেকে জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বিজেপির পক্ষ থেকে মতাদর্শগত পরিবর্তন, উন্নয়ন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ডাক দেওয়া হয়েছিল। বামফ্রন্ট সরকারের পতনের ১৫ বছর পর বাংলা আবারও এক বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সাক্ষী হতে যাচ্ছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

বিবিসির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তৃণমূল কংগ্রেসের বিপর্যয়ের মূল কারণ পাঁচটি। 

এক. পশ্চিমবঙ্গের নারী ভোটের (যা ৫০ শতাংশেরও বেশি) বেশিটাই যে এতকাল মমতা ব্যানার্জীর দল পেয়ে এসেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। লক্ষ্মীর ভান্ডার, কন্যাশ্রী বা সবুজ সাথির (ছাত্রীদের মধ্যে সাইকেল বিতরণ) মতো প্রকল্প তৃণমূল সরকারকে নারী ভোটারদের কাছে তুমুল জনপ্রিয় করে তুলেছিল। কিন্তু এবার সেই ভোটব্যাংকে অবধারিত ফাটল ধরেছে, যার একটা বড় কারণ হতে পারে নারী সুরক্ষার মতো ইস্যুতে তৃণমূল কংগ্রেসের চরম ব্যর্থতা। দুই বছর আগেকার আরজিকর আন্দোলন এবারের ভোটে অবশ্যই প্রভাব ফেলেছে, যার একটা বড় প্রমাণ পানিহাটির মতো তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটিতেও আরজিকর নির্যাতিতার মা বিজেপি প্রার্থী হিসেবে বিপুল ভোটে এগিয়ে রয়েছেন। 

দুই. এসআইআর বা ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের ফলে যে ৯০ লাখেরও বেশি নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, তাতে তৃণমূল কংগ্রেসই যে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত তা এখন দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। এই তালিকায় লাখ লাখ বৈধ ভোটার বাদ পড়েছেন সেটা যেমন ঠিক, কিন্তু বহু ভুয়া বা মৃত ভোটারেরও নাম যে বাদ পড়েছে তাতেও কোনো সন্দেহ নেই। 

তিন. পনেরো বছরের তৃণমূল কংগ্রেস শাসনে যে পরিমাণ দুর্নীতি, অপশাসন, দৈনন্দিন জীবনে কাটমানি ও ‘সিন্ডিকেট রাজে’র বাড়বাড়ন্ত এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগে উঠেছে, তা পশ্চিমবঙ্গে আর কোনো আমলে উঠেছে কি না সন্দেহ। এবারেও এসআইআরের কারণে রাজ্যজুড়ে লাখ লাখ বৈধ ভোটারের যে অমানুষিক ভোগান্তি হয়েছে সেটাকে প্রচারের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জী, তার জন্য কোনো চেষ্টাই বাদ রাখেননি তিনি। কিন্তু দেখা গেল দুর্নীতি ও ব্যর্থতার অভিযোগকে ঢাকতে সেটা যথেষ্ঠ হলো না। 

চার. রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন মমতা ব্যানার্জীর একটানা নির্বাচনি সাফল্যের পেছনে একটা বড় কারণ হলো রাজ্যের মুসলিমদের প্রায় একচেটিয়া সমর্থন তিনি পেয়ে এসেছেন। পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যার মোটামুটি ৩০ শতাংশের কাছাকাছি মুসলিম। আর এর মধ্যে ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ ভোটই বরাবর তৃণমূল কংগ্রেস পেয়ে এসেছে। কিন্তু এবারে সেই প্রক্রিয়ার পাল্টা একটা হিন্দু ভোটের ‘কনসলিডেশন’ হয়েছে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। যার সুফল বিজেপি পেয়েছে, যে কারণে তারা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলা মালদা বা মুর্শিদাবাদেও বেশ কিছু আসন পেতে চলেছে। 

পাঁচ. পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাজ্যের শাসক দল ভোটের সময় কিছু বাড়তি সুবিধা পেয়েই থাকে, যেটা এবারে তৃণমূল কংগ্রেস পায়নি বলেলই চলে। নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার পরের মুহূর্ত থেকেই জাতীয় নির্বাচন কমিশন রাজ্য প্রশাসনের হাত রাশে তুলে নিয়েছে, ঢালাওভাবে জেলা শাসক ও পুলিশ সুপারদের তারা বদলে দিয়েছে। সেই সঙ্গে ভোটের বেশ কয়েক দিন আগে থেকেই রাজ্যে মোতায়েন করা হয়েছে ২ লাখ ৪০ হাজারের বেশি কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী, যে সংখ্যা ছিল অভূতপূর্ব। 

অনেকেই বলছেন, এই বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতির কারণেই ভোট এত শান্তিপূর্ণ হয়েছে এবং মানুষ এত নিশ্চিন্তে ভোট দিতে পেরেছেন।

অন্যভাবে বললে, নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভূমিকাও তৃণমূল কংগ্রেসের বিপক্ষেই গেছে।

আসামে সরকার গঠন করছে বিজেপি জোট : আসামের মোট আসন ১২৬টি। গতকাল বাংলাদেশ সময় রাত ৯টায় এই খবর লেখা পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ৯১টি আসনে জয় নিশ্চিত করেছে বিজেপি নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স (এনডিএ) জোট। তারা এগিয়ে ছিল আরও একটি আসনে।  এই রাজ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস (আইএনসি) ও তার মিত্ররা। তারা মোট ২১টি আসনে এগিয়ে আছে। কংগ্রেসের চূড়ান্ত জয় ১৫টি আসনে এবং ৪টি আসনে তারা এগিয়ে আছে।

তামিলনাড়ুতে থালাপতির চমক : তামিলনাড়ু রাজ্যে এবার চমক দেখিয়েছে অভিনেতা থালাপতি বিজয়ের নেতৃত্বাধীন নতুন দল তামিলাগা ভেটরি কাজাগম (টিভিকে)। রাজ্যের মোট ২৩৪ আসনের মধ্যে দলটি নিশ্চিত জয় পেয়েছে ৮৭ টিতে, আর জয়ের দ্বারপ্রান্তে ছিল ২০টি আসনে। সরকার গঠন করতে তাদের দরকার ১১৮টি আসন।

এ রাজ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে দ্রাভিডা মুন্নেত্রা কাজাগাম (ডিএমকে) ও ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস (আইএনসি) নির্বাচনি জোট। ৪৭টি আসনে জয় নিশ্চিত দলটির। এগিয়ে ছিল ১৮টি আসনে।

কেরালায় পরিবর্তন : কেরালায় সরকার গঠন করতে যাচ্ছে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস (আইএনসি) নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউডিএফ) জোট। রাজ্যের মোট ১৪০টি আসনের মধ্যে এই জোট ৬৩টিতে জয় নিশ্চিত করেছে। আর দ্বিতীয় অবস্থানে আছে বামপন্থি রাজনৈতিক জোট লেফট ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (এলডিএফ)। তারা এ পর্যন্ত ২৬টি আসনে জয় পেয়েছে। এই রাজ্যে সরকার গঠন করতে লাগবে ৭১টি আসন।


  বিষয়:   তৃণমূল কংগ্রেস  বিজেপি  পশ্চিমবঙ্গ  বিধানসভা 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: