দেশের তীব্র জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় মাটির গভীর স্তরে নতুন করে গ্যাসের সন্ধানে নেমেছে সরকার। প্রথমবারের মতো সাধারণ খনন সীমা অতিক্রম করে প্রায় ৬ হাজার মিটার গভীর পর্যন্ত ‘ডিপ ড্রিলিং’ বা গভীর কূপ খনন শুরু হয়েছে, যা থেকে দেড় থেকে দুই ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) গ্যাস পাওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখছে পেট্রোবাংলা।
এই মহাপরিকল্পনার আওতায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস ও বাখরাবাদ, কুমিল্লার শ্রীকাইল এবং পাবনার মোবারকপুরে চারটি গভীর কূপ খনন করা হবে। এর মধ্যে গত ১৯ এপ্রিল থেকে তিতাস-৩১ নম্বর কূপে খনন কাজ পুরোদমে শুরু হয়েছে। বাপেক্সের ত্রিমাত্রিক জরিপে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, শ্রীকাইল ও তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে বিশাল মজুতের ইঙ্গিত পাওয়ায় এই উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে সাধারণত মাটির নিচে ৪ হাজার মিটার গভীরতা পর্যন্ত গ্যাস উত্তোলন করা হয়। তবে এবারই প্রথম ৫ হাজার ৬০০ মিটার থেকে ৬ হাজার মিটার গভীর শিলা স্তরের নিচে খনন চালানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই গভীরতায় গ্যাসের চাপ প্রায় ১৫ হাজার পিএসআই এবং তাপমাত্রা ৩৯০ ডিগ্রি ফারেনহাইট হতে পারে, যা বাংলাদেশের গ্যাস খাতের ইতিহাসে প্রথম কোনো উচ্চচাপ ও উচ্চ তাপমাত্রার কূপ হতে যাচ্ছে।
তিতাস ও বাখরাবাদের দুটি কূপ খননের জন্য ইতোমধ্যে চীনা প্রতিষ্ঠান সিসিডিসি’র সঙ্গে চুক্তি সই করেছে বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল)। প্রায় ৭৯৮ কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্পটির বাস্তবায়ন মেয়াদকাল ধরা হয়েছে ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে দেশীয় কোম্পানির সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়েছেন। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা শামসুল আলম বলেন, এটি অবশ্যই একটি ভালো খবর। তবে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়িয়ে তাদের দিয়েই কাজ করানো উচিত।
প্রয়োজনে বিদেশি পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু মূল কাজ দেশীয় সংস্থার হাতেই থাকা প্রয়োজন। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান এরফানুল হক জানিয়েছেন, এই গভীর খনন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হলেও সফল হলে দেশের বর্তমান গ্যাস সংকটের একটি বড় সমাধান মিলবে। এছাড়া জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে ইতিমধ্যে আরও ১৫০টি কূপ খনন ও সংস্কারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে সংস্থাটি।
নতুন এই স্তরে গ্যাস পাওয়া গেলে বাংলাদেশের গ্যাস খাতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা। তাদের মতে, বাপেক্সের থ্রিডি সিসমিক জরিপে শ্রীকাইলে ৯২৬ বিলিয়ন এবং তিতাসে ১ হাজার ৫৮৩ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সম্ভাব্য মজুত চিহ্নিত হয়েছে।
যদি এই মজুত থেকে গ্যাস উত্তোলন নিশ্চিত করা যায়, তবে শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা অনেকটাই কমে আসবে। বর্তমানে প্রতিদিন ১২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে এবং ভোলার নতুন কূপগুলো থেকেও ইতিবাচক ফল পাওয়ার আশা করছে পেট্রোবাংলা। দেশীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে এই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
সময়ের আলো/টিএইচ