পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল কেবল একটি পরিসংখ্যানগত জয় নয়। এটি একটি গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক রূপান্তরও বটে। নবান্নে ক্ষমতার পালাবদলের যে চিত্রনাট্য গত সোমবার জনসমক্ষে এলো, তার খসড়া আসলে তৈরি হয়ে গিয়েছিল অনেক আগেই।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘ ১৫ বছরের তৃণমূল কংগ্রেস শাসনের অবসান ঘটিয়ে বিজেপির ২০৭টি আসনে জয়লাভ এবং একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি ছিল এক পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ। টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই পরিবর্তনের নেপথ্যে বেশ কিছু অমোঘ কারণ কাজ করেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
অঙ্ক কষে টার্গেট আসনে ফোকাস : বিজেপি এবার পরিকল্পিতভাবে সেইসব আসনে সবচেয়ে বেশি জোর দেয় যেখানে ২০২১ সালে ব্যবধান খুব কম ছিল। কারণ ২০২১ সালে টিএমসির ২১৫টি আসনের এক-তৃতীয়াংশে জয়ের ব্যবধান ছিল ২০ শতাংশেরও বেশি। এবার বিজেপি কঠিন আসনগুলো বাদ দিয়ে প্রতিযোগিতামূলক আসনগুলোকে একটি ‘সুইং’ স্ট্র্যাটেজি হিসেবে গ্রহণ করে।
দেখা গেছে যেখানে ২০২১ সালে মাত্র ৫-৭ শতাংশ ভোটের ব্যবধান ছিল, সেখানেই বিজেপি এবার বিপুল সাফল্য পেয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রবীণ রায় বলেন, এই ফলাফল ‘উল্লেখযোগ্যভাবে মোদির রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করবে এবং তৃতীয় মেয়াদের জন্য তার নীতি-এজেন্ডা বাস্তবায়নের রাজনৈতিক পুঁজি জোগাবে।’
তার মতে, বাংলার এই রায় দেখিয়েছে যে গণতান্ত্রিক ফলাফল শুধু দলীয় পারফরম্যান্স দিয়ে তৈরি হয় না। বরং পরিচিতি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, প্রাতিষ্ঠানিক আস্থা এবং ভোটারদের মনে অনুরণিত হওয়া আখ্যানের মাধ্যমেও নির্ধারিত হয়।
সেনা-কামান মোতায়েন : কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ প্রায় আড়াই লাখ আধা-সামরিক নিরাপত্তা রক্ষাকারী মোতায়েন করেন। তাদের সঙ্গে ছিল সাঁজোয়া যান। যেমনটা সাধারণত জম্মু ও কাশ্মির, নকশাল-অধ্যুষিত অঞ্চল বা মণিপুরের মতো সংঘাতপ্রবণ এলাকায় দেখা যায়।
ভোটাররা যাতে নির্ভয়ে ভোট দিতে পারেন, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে শাহ বারবার ‘নির্ভয়ে ভোট দিন’ এই বার্তা দিয়েছেন। ভোটগ্রহণের পরেও কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন থাকায় সাধারণ মানুষ বুঝতে পেরেছিলেন যে সত্যিকারের পরিবর্তন আসছে। এই ব্যবস্থা তৃণমূলের ‘বুথ দখল’এর সংস্কৃতিকে কার্যত অচল করে দিয়েছিল।
নারীরা মুখ ফেরানোতেই চিত্রনাট্যের ক্লাইম্যাক্স : নারী ভোটাররাই ছিল টিএমসির মূল ভরসা। কিন্তু এ বারের ভোটে সেই ভরসাই যেন সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা দিল। ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’-এর মতো প্রকল্প ভোটের আগে বাড়িয়ে সাধারণ্যে ১৫০০ টাকা ও সংরক্ষিত শ্রেণিতে ১৭০০ টাকা করা হলেও, বিজেপি তার ‘অন্নপূর্ণা’ প্রকল্পে ৩০০০ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে মহিলা ভোটারদের একটি বড় অংশকে আকৃষ্ট করে।
প্রথম দফায় নারী ভোটদানের হার ছিল ৯২.৬৯ শতাংশ, যা পুরুষদের ৯০.৯২ শতাংশ থেকে বেশি। কিন্তু এত ভোট পড়েও টিএমসির ভোট বাড়েনি, উল্টে কমেছে। অর্থাৎ নারীরা ভোট দিতে এসেছিলেন ‘পরিবর্তন’-এর পক্ষে। আরজি কর-কাণ্ড, সন্দেশখালির ঘটনা এসব মিলিয়ে নারী নিরাপত্তার প্রশ্নে টিএমসির ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ‘মা, মাটি, মানুষ’-এর স্লোগান ফিকে হয়ে যায়। নারী ভোটাররা এবার সরকারি ভাতার বাইরে গিয়ে নিরাপত্তা, চাকরি আর দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনার কথা ভেবেছেন।
ভুয়া ভোটার বাতিল ও ভোটকুঞ্জের কারসাজি : এই ভোটকুঞ্জের কারসাজির অন্যতম চাবিকাঠি ছিল ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর)। যার মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক ভুয়া ভোটারকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। প্রথমে ৬৩ লাখ নাম কাটা পড়ে, পরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯০ লাখেরও বেশি। এর মধ্যে শুধু মুর্শিদাবাদেই ৪ লাখ ৫৫ হাজার নাম বাদ পড়ে।
অনেকের অভিযোগ, এর মাধ্যমে সংখ্যালঘু ভোটারদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়। টিএমসি নেত্রী মহুয়া মৈত্র অভিযোগ করেছিলেন, ২৭ লাখ ভোটারকে তালিকা থেকে বাদ দিয়ে একটি রাজ্যের নির্বাচন কী করে হয়? (যদিও ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে মাত্র ১৩৯টি নাম পুনর্বহাল সম্ভব হয়েছিল।) অনেক ক্ষেত্রে একটি পরিবারের কিছু সদস্যের নাম থাকলেও অন্যদের নাম কাটা পড়েছে, যা নিয়ে মানুষের ক্ষোভ ছিল তীব্র।
এই বিপুলসংখ্যক ভোটার বাতিলের ঘটনা তৃণমূলের ভোটকেন্দ্রিক অঙ্কটাই বদলে দেয় এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলোতে টিএমসির ভোটকে বিপুলভাবে প্রভাবিত করে।
খোদ নিজের আসনেও হার মমতার : শেষ পর্যন্ত যা হওয়ার তা-ই হয়। তিনবারের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের ভবানীপুর কেন্দ্রেই বিজেপির শুভেন্দু অধিকারীর (যিনি একসময় মমতার ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত ছিলেন) কাছে ১৫ হাজার ১০৫ ভোটে পরাজিত হন। এই ফলাফল যেন প্রতীকী অর্থে পুরো রাজ্যের রায়কেই প্রতিফলিত করে। খোদ ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু নবান্নের দখলদারকেই সরিয়ে দিল বাংলার মানুষ।
উত্তরবঙ্গ থেকে পশ্চিমাঞ্চল সবখানেই সুনামি : ফলাফল নিছক একটা জয় নয়, বরং বাংলার আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা একটা স্পষ্ট বার্তা। উত্তরবঙ্গ, জঙ্গলমহল, সীমান্তবর্তী জেলা, শিল্পাঞ্চল এবং শহর কলকাতা সব জায়গায় বিজেপির উত্থান ছিল চোখে পড়ার মতো।
দলটি তাদের ভোটের ভাগ বাড়িয়ে ৪৫ শতাংশে নিয়ে যায়। যেখানে টিএমসির ভোট কমে দাঁড়ায় ৪০ দশমিক ৯৪ শতাংশে। ১৭৭টি আসনে, যেখানে অতীতের জয়ের ব্যবধান ভোটার কর্তনের চেয়ে কম ছিল, সেখানে বিজেপি জয়ী হয়েছে। ব্রাত্য বসু, শশী পাঁজা, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যসহ ২০ জনেরও বেশি মন্ত্রী এবং একাধিক শীর্ষ নেতা পরাজিত হয়েছেন। এর অর্থ স্থানীয় স্তর থেকে শুরু করে শীর্ষ নেতৃত্ব সবখানেই তৃণমূলের ভিত ধসে পড়েছে।
দুর্নীতির বোঝা ও প্রাতিষ্ঠানিক অনাস্থা : সারদা বা নারদা কেলেঙ্কারি অতীতে তৃণমূলকে বিপাকে ফেললেও, ২০২৪-২৫ সালের ‘শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি’ সাধারণ মানুষের মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছিল। সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক ২৫ হাজার চাকরি বাতিলের ঘটনা দুর্নীতিকে কেবল একটি রাজনৈতিক ইস্যুতে সীমাবদ্ধ রাখেনি। বরং তা হাজার হাজার মধ্যবিত্ত পরিবারের ব্যক্তিগত সংকটে পরিণত হয়েছিল।
মানুষের মনে এই ধারণা বদ্ধমূল হয়েছিল যে, মেধার চেয়ে ‘কাটমানি’ এবং ‘সিন্ডিকেট’ সংস্কৃতিই শাসনের মূল চালিকাশক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তা ছাড়া বাংলার শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের অভাব গত কয়েক বছরে এক ভয়াবহ রূপ নিয়েছিল। রাজ্যের যুবসমাজের একটি বড় অংশ কাজের সন্ধানে ভিনরাজ্যে পাড়ি দিতে বাধ্য হচ্ছিল।
বিজেপির ‘চক্রী’ (চাকরি) এবং শিল্প পুনরুজ্জীবনের প্রতিশ্রুতি সেই হাতাশাগ্রস্ত যুবসমাজের কাছে এক বিকল্প স্বপ্ন হিসেবে ধরা দেয়। পরিযায়ী শ্রমিকদের এই ক্ষোভ নির্বাচনের বাক্সে প্রতিফলিত হয়েছে উত্তরবঙ্গ থেকে শুরু করে কলকাতার শিল্পাঞ্চল পর্যন্ত।
বর্ণহীন ন্যারোটিভ ও প্রতিক্রিয়ার রাজনীতি : বিশ্লেষকদের মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার এবারের নির্বাচনে নিজেদের কোনো বলিষ্ঠ ন্যারোটিভ বা গল্প তৈরি করতে পারেনি। উল্টো তারা বিজেপির আক্রমণাত্মক প্রচারের পাল্টা প্রতিক্রিয়া দিতেই ব্যস্ত ছিল। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে সাধারণ মানুষের ধারণার এই পরিবর্তন শাসক দলের জন্য ‘ইরিডিম্যাবল’ বা অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে দাঁড়ায়।
‘অঙ্গ, কলিঙ্গ, বঙ্গ’ ও ‘ডাবল ইঞ্জিন’ : নরেন্দ্র মোদি এবং অমিত শাহের কাছে বাংলা ছিল এক অসমাপ্ত অধ্যায়। লোকসভা ভোটে কিছুটা ধাক্কা খাওয়ার পর ২০২৪ সাল থেকেই তারা ‘অঙ্গ, কলিঙ্গ, বঙ্গ’ (বিহার, ওড়িশা, বাংলা) এই পূর্বাঞ্চলীয় করিডোর দখলের কৌশল ঠিক করে ফেলেছিলেন। মোদি ও শাহ এই অভিযানের নেতৃত্ব দেন এবং ক্রমাগত ১৫ দিন বাংলায় থেকে প্রচার চালান। মোদি কলকাতার রাস্তায় ঝালমুড়ি খেয়ে, গঙ্গায় নৌকো ভ্রমণ করে ‘বহিরাগত’-এর তকমা ঘুচিয়ে বাংলার কাছের মানুষ হয়ে ওঠেন।
অন্যদিকে অমিত শাহ ভোটের মাস ছয়েক আগে থেকেই ‘পান্না প্রধান’ (প্রতি ৩০-৬০ ভোটারের জন্য একজন কর্মী) এবং ‘শক্তি কেন্দ্র’ (৫-৭টি বুথের ক্লাস্টার) ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। বুথভিত্তিক এই কাঠামো ভোটারদের বুথে আনার কাজ নিখুঁতভাবে করেছে। ‘ডাবল ইঞ্জিন সরকার’ (রাজ্য ও কেন্দ্র উভয় স্থানে একই দলের সরকার) গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে উন্নয়নের গতি আনার যে বার্তা বিজেপি দিয়েছিল, তা-ও ভোটাররা গ্রহণ করেছেন।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি : ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট শাসনের অবসান ঘটিয়ে ‘পরিবর্তন’ এনেছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে। ১৫ বছর পর, ২০২৬ সালে সেই একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটল। কংগ্রেস, সিপিআই ও স্থানীয় দলগুলোর (যেমন এজেইউপি) উত্থানের ফলে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলোতে (মুর্শিদাবাদ, মালদা, উত্তর দিনাজপুর) টিএমসির ভোট ভাগ হয়ে যায়, যা সরাসরি বিজেপিকে সুবিধা দেয়।
অন্যদিকে হিন্দু ভোটারদের মধ্যে বিজেপির পক্ষে ব্যাপক মেরুকরণ হয় এবং দলটি অভিবাসন-অনুপ্রবেশকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তার রাজনীতিকেও কাজে লাগায়। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) ও অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে মোদি ও অমিত শাহ হিন্দু ভোটারদের বিজেপির পক্ষে আরও সংহত করেন। সোজা বাংলায়, ১৫ বছর আগে মমতা বামফ্রন্টকে উৎখাত করে ‘পরিবর্তন’ এনেছিলেন। এবার ঠিক একই স্লোগান ‘পরিবর্তন’ হাতে নিয়ে বিজেপি উৎখাত করল টানা ক্ষমতায় থাকা তৃণমূল কংগ্রেসকে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২৬-এর এই রায় ‘পাথরে খোদাই করা’ হয়ে গিয়েছিল ভোটের আগেই। তৃণমূলের কল্যাণমুখী প্রকল্পগুলো যখন ‘গ্র্যাটিচিউড’ (কৃতজ্ঞতা) থেকে ‘ট্রানজ্যাকশনাল’ (লেনদেনভিত্তিক) প্রত্যাশায় রূপ নিল, তখনই পরিবর্তনের ভিত তৈরি হয়ে যায়।
এইচডব্লিউ নিউজ-এর নির্বাহী সম্পাদক সুজিত নায়ারের মতে, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয় নিছক একটি রাজ্যের সাফল্য নয়। এটি মোদি-শাহ নেতৃত্বের জন্য ২০১৪ সালের সমতুল্য এক প্রতীকী ‘মাইলফলক’। এই ফল দেশের অন্যতম শক্তিশালী বিরোধী মুখকে সরিয়ে দিয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের মানুষ কেবল ভাতার বদলে নিরাপত্তা, চাকরি এবং সুশাসনের নিশ্চয়তা চেয়েছিল। আর তাই ভোটের ফলাফল ঘোষণার অনেক আগেই বাংলার আমজনতার নীরবতা এবং প্রতিবাদের ভাষায় নবান্নে নতুন অধ্যায়ের চিত্রনাট্য লেখা সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল। গত সোমবারের ফলাফল ছিল সেই অমোঘ সত্যের আনুষ্ঠানিক শিলমোহর মাত্র।
/এসএকে