গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় ৮ কোটি ৬০ লাখ টাকার দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পে মাত্র ৪০টি কলাম নির্মাণ করেই দায় সেরেছে ঠিকাদার। প্রায় এক বছর ধরে কাজ ফেলে রাখা হয়েছে। বন্ধ থাকা এই প্রকল্পে ঠিকাদার এবং উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাসহ (পিআইও) সংশ্লিষ্টদের কোনো খোঁজ মিলছে না।
এ অবস্থায় হাজারো শ্রমিক মজুরি অনিশ্চয়তায় পড়ে চরম ভোগান্তিতে আছেন। আসন্ন বর্ষা মৌসুমে বন্যা দেখা দিলে বানভাসি মানুষের দুর্ভোগ ভয়াবহ রূপ ধারণ করার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দায়িত্বশীলদের গাফিলতি ও অবহেলার কারণেই রাষ্ট্রীয় এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প আজ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ভাটি বোচাগাড়ি গ্রামের পোড়ারচর এলাকায় নির্মাণাধীন এই দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্র ঘিরে তৈরি হয়েছে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কাপাসিয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. হাফিজার রহমান বলেন, কাজটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। বন্যার সময় যদি বানভাসি মানুষ এখানে আশ্রয়ই নিতে না পারে তা হলে এই জমি নেওয়ারই বা কী প্রয়োজন ছিল? দ্রুত কাজটি শেষ করার জন্য সরকারের কাছে আমরা জোরালোভাবে আহ্বান জানাচ্ছি।
ওয়ার্ক অর্ডারের তারিখ এবং কাজ শেষ হওয়ার সময় সম্পর্কে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য না দিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, প্রকল্পের বরাদ্দ ৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা। কাজের মেয়াদ শেষ হয়েছে, এখন সময় বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে। সে অপেক্ষাতেই আছি।
অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা পাওনার বিষয়টি সঠিক নয়। লেবারদের কিছু টাকা পাওনা থাকতে পারে যা হেড মিস্ত্রির কাছে থাকতে পারে। আমার কাছে নেই।
কাজটি তদারকির দায়িত্বে থাকা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. মশিউর রহমানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। তার দফতরে কয়েক দিন গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। তাকে না পেয়ে এ ব্যাপারে কথা হয় গাইবান্ধা জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ শফিকুল ইসলামের সঙ্গে।
আলাপকালে তিনি বলেন, এই প্রকল্প সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য আমার কাছে নেই। কাজটি বন্ধ থাকার বিষয়টি জানি। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় কাজ বন্ধ আছে। আগামী অ্যাকটিং মিটিংয়ে মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে। এ বিষয়ে জানার জন্য যোগাযোগ করা হলে দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্রের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি এবং সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলি বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সরেজমিন দেখা যায়, আশ্রয়কেন্দ্রের জন্য নির্ধারিত জায়গাটি বালু ভরাট করা হলেও কাজের অগ্রগতি প্রায় থমকে আছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী এখানে তিন তলা একটি ভবন এবং গবাদিপশুর জন্য একটি এক তলা স্থাপনা নির্মাণের কথা থাকলেও বাস্তবে গবাদিপশুর ভবনের জন্য মাত্র ৪০টি কলাম নির্মাণ করেই কাজ থেমে গেছে। প্রকল্প এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে নির্মাণসামগ্রী। কোথাও বাঁশ, কোথাও ইটের খোয়া, আবার কোথাও শাটারের তক্তা পড়ে আছে। পড়ে আছে মিক্সচার মেশিনও। টিউবওয়েলে ধরেছে মরিচা, শ্রমিকদের থাকার ঘরটিও ভেঙে গেছে। দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ থাকায় পুরো এলাকায় এক ধরনের ভূতুড়ে পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
সরেজমিন কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দা মো. ফজলু মিয়ার সঙ্গে। এ সময় তিনি বলেন, কাজটা শুরু হয়েছিল ২০২৪ সালের শেষ দিকে। ছয় মাস চলার পর থেকেই বন্ধ আছে। পিআইও, ঠিকাদার কেউ আর আসেন না। ফোন দিলেও রিসিভ করেন না। কাউকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা ৫-৬ মাস এখানে লেবার হিসেবে কাজ করেছি। চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা পাওনা আছে।
কিন্তু সেই টাকাও পাচ্ছি না। এখন আমরা চরম অসহায় অবস্থায় আছি, কে শুনবে আমাদের কথা। তিনি অভিযোগ করে আরও বলেন, ঠিকাদার অনিয়ম করবে এটি এক ধরনের বাস্তবতা হয়ে গেছে। কিন্তু পিআইও অফিসের লোকজন যদি দায়িত্বশীল হতো তা হলে আজ এই অবস্থা সৃষ্টি হতো না। বরং তারা অনিয়মে ঠিকাদারকে সহযোগিতা করেছে বলেই প্রকল্পটি এভাবে পড়ে আছে।
আরেক ভুক্তভোগী বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. এন্তাজ আলীর সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, এই আশ্রয়কেন্দ্রের জন্য ১২ বিঘা জমি দেওয়া হয়েছে। আগে আমরা এসব জমিতে আবাদ করতাম। বন্যার সময় এলাকার মানুষ আশ্রয় নিতে পারবে এই আশায় এসব জমি প্রকল্পে দিয়েছি।
তিনি আরও বলেন, এক বিঘা জমিতে এবারও ৪০ থেকে ৫০ মণ ভুট্টা হয়েছে। তা হলে ১২ বিঘা জমিতে কতটা ফসল পাওয়া যেত সেটি সহজেই বোঝা যায়। ২০২৪ সালের আগেই এসব জমি ছেড়ে দিয়েছি। একদিকে আবাদ থেকে বঞ্চিত হচ্ছি, অন্যদিকে আশ্রয়কেন্দ্রও হয়নি। এতে আমরা চরম ক্ষতির মুখে পড়েছি। দ্রুত কাজ শেষ করার জোর দাবি জানাচ্ছি।
স্থানীয়রা জানান, তারা বন্যার সময় গবাদিপশু, আসবাবপত্র ও পরিবার নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েন। সেই কষ্ট লাঘবের আশায় ফসলি জমি ছেড়ে তারা আশ্রয়কেন্দ্রের জন্য জায়গা দিয়েছেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হওয়ার পরও প্রকল্পটি বাস্তবে রূপ না নেওয়ায় এখন তারা হতাশ।
তাদের অভিযোগ, জমি দিয়ে ফসল থেকেও বঞ্চিত হয়েছেন, আবার আশ্রয়কেন্দ্রও হয়নি। শ্রমিক হিসেবে কাজ করেও অনেকেই পারিশ্রমিক পাননি। দায়িত্বশীলদের গাফিলতির কারণেই এমন দুরবস্থা তৈরি হয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
/এসএকে