যেভাবে নিজের দুর্গ নিজ হাতেই ভাঙলেন মমতা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

পশ্চিম বাংলার রাজনীতিতে ৪ মে দিনটি কেবল একটি সাধারণ ভোট গণনার দিন হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি এমন একদিন হিসেবে ইতিহাসে

2026-05-06T03:18:56+00:00
2026-05-06T03:18:56+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
যেভাবে নিজের দুর্গ নিজ হাতেই ভাঙলেন মমতা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ৩:১৮ এএম 
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সংগৃহীত ছবি
পশ্চিম বাংলার রাজনীতিতে ৪ মে দিনটি কেবল একটি সাধারণ ভোট গণনার দিন হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি এমন একদিন হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত হবে, যেদিন ১৫ বছরের দীর্ঘ রাজনৈতিক আধিপত্য জনসমক্ষেই ভেঙে পড়ে। সোমবার দুপুরের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনের অবসান ঘটতে চলেছে এবং রাজ্যজুড়ে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জয়জয়কার শুরু হয়েছে। বিধানসভার মোট ২৯৪টি আসনের মধ্যে বিজেপি ২০৬টি বিশাল আসনে জয়লাভ করেছে, যেখানে তৃণমূল কংগ্রেসের আসন নেমে এসেছে মাত্র ৮১ তে। 

২০২১ সালের বিশাল জয়ের তুলনায় এটি তৃণমূলের জন্য ১৩৩টি আসনের এক মর্মান্তিক পরাজয়। এই ফলাফলের পেছনে বিজেপির কৌশলী প্রচার যেমন কাজ করেছে, তেমনই বড় কারণ স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত। পরাজয়ের বীজ তিনি নিজের হাতেই বুনেছিলেন।

একদিকে তৃণমূল প্রচারে জোর দিয়েছিল ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’, ‘কন্যাশ্রী’, ‘স্বাস্থ্যসাথী’র মতো জনমুখী প্রকল্পে। অন্যদিকে আরজি করের কাণ্ড নারী নিরাপত্তা নিয়ে সরকারের দাবিকে ফাঁপা বুলিতে পরিণত করে। ২০২৪ সালে কলকাতার আরজি কর হাসপাতালে এক তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা নির্ভয়া কাণ্ডের মতোই গণমানসে গভীর ক্ষত তৈরি করে। নারী সুরক্ষায় ব্যর্থতার এই চিত্র ‘মা, মাটি, মানুষ’-এর স্লোগানকে একেবারে ম্লান করে দেয়।

মমতা নিজোই বিজেপির হাতে অস্ত্র তুলে দিয়েছেন তার সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ভারসাম্যের খেলা দিয়ে। সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ রুখতে গিয়ে মমতা নিজেই সেই ফাঁদে পা দিয়েছিলেন। একদিকে হিজাব পরে ইমামদের সঙ্গে মেলামেশা ও ইমাম ভাতার ঘোষণা করে তিনি যেমন একাংশ হিন্দুকে ক্ষুব্ধ করেছেন, তেমনই ভারসাম্য আনতে দীঘার জগন্নাথ মন্দির বা নিউ টাউনের দুর্গা আঙন তৈরি করে তিনি নিজেকে ‘প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতার’ জালে জড়িয়ে ফেলেন। এই দ্বিচারিতা ভোটারদের একটি বড় অংশকে মমতার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করেছে। একসময় যে বাংলা এই বিভাজনের রাজনীতিকে অনেকটা প্রতিরোধ করত, সেখানেই তিনি বিজেপির হিন্দুত্ববাদী বার্তাকে প্রকারান্তরে বৈধতা দেন।
 
আরও বড় ক্ষত হয়ে উঠেছিল তৃণমূলের তলাবাজি ও সিন্ডিকেট রাজ। বড় শিল্পের অভাবে বাংলার যুবসমাজ যখন নির্মাণ, কয়লা, গরু পাচার বা রাস্তার কাজে সরবরাহ নেটওয়ার্ক ঘিরে জীবিকা খুঁজছিল, তখন সেসব জায়গা দখল করে নেয় দলের স্থানীয় নেতৃত্ব নিয়ন্ত্রিত সিন্ডিকেট। ব্যবসায়ীদের থেকে জোর করে ‘সুরক্ষা কর’ আদায়, সরকারি দরপত্র নিয়ন্ত্রণ, আর সেই টাকা ঘুরে আসত দলের তহবিলে। সাধারণ মানুষের মধ্যে এই চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি তৃণমূলের প্রতি বিতৃষ্ণা তৈরি করেছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই ব্যবস্থা জানতেন, তবু তা বন্ধে কার্যত ব্যর্থ হয়েছেন। বেকারত্বের জেরে হাজার হাজার তরুণের পরিযায়ী শ্রমিকে পরিণত হওয়া ছিল মমতার দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক ব্যর্থতার একটি বড় প্রতিফলন।

মমতার আরেকটি বড় ভুল ছিল, নিজের অনুগত প্রচারমাধ্যম ও চাটুকার বৃত্তের তৈরি মরীচিকায় বিশ্বাস করা। সাধারণ মানুষের মধ্যে যে ‘পরিবর্তন’-এর তীব্র আকুতি কাজ করছিল, তা তিনি বুঝতেই পারেননি। তিনি ভেবেছিলেন, কল্যাণমূলক প্রকল্পই ভোট ফেরত দেবে। অথচ ভোটারদের এক বড় অংশই তার ওপর আস্থা রাখতে পারেননি। কারণ বিজেপিও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল প্রকল্প বন্ধ হবে না বরং অর্থ বাড়ানো হবে। ফলে তৃণমূলের সবচেয়ে বড় অস্ত্রটিও ভোঁতা হয়ে যায়। 

মূলত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তার ঘনিষ্ঠ বৃত্ত রাজ্যের নিচুতলার ক্ষোভ আঁচ করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। যখন কেন্দ্রীয় সরকার ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ (এসআইআর) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রায় ২৭ লাখ মানুষকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেয়, তখন রাজ্য সরকার এর গুরুত্ব বুঝতে পারেনি। গোটা প্রশাসনকে যখন কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন নিজের কব্জায় নিয়ে এসে ভিনরাজ্যের কর্মকর্তাদের দিয়ে সাজাল, তখন মমতার ক্যাডারনির্ভর নির্বাচনি যন্ত্রটিও অসহায় হয়ে পড়ে।

শেষে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ও দলীয় সংস্কৃতিই কাল হয় মমতার। নিজ ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্রমবর্ধমান প্রভাব দলের পুরোনো রক্ষী ও নতুন প্রজন্মের মধ্যে একটি ফাটল তৈরি করেছিল। অভিষেককে সামনে রেখে যে উত্তরাধিকার পরিকল্পনা সাজানো হয়েছিল, তা দলের অভ্যন্তরীণ সংহতি নষ্ট করে দেয়। পরাজয়ের সঙ্গে সঙ্গেই তৃণমূলের মধ্যম সারির নেতাদের বিজেপির দিকে ঝুঁকে পড়ার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা মমতার দীর্ঘদিনের একনায়কতান্ত্রিক নেতৃত্বের অভ্যন্তরীণ ফাটলকেই ইঙ্গিত করে। মুসলিম তোষণের অভিযোগ, নারী নিরাপত্তায় ব্যর্থতা, সিন্ডিকেটকে প্রশ্রয় আর নিজের দলের মধ্যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া এই চার কারণেই ১৫ বছরের শাসনের ভিত ধসে পড়েছে। 

২০২১ সালে বিজেপিকে ‘বহিরাগত’ বলে আক্রমণ করে মমতা জয়ী হয়েছিলেন। কিন্তু ২০২৬-এ বিজেপি সেই ভুল সংশোধন করে বাঙালির গরিমা, সংস্কৃতি ও অভাব-অভিযোগের ভাষায় কথা বলতে শুরু করে। মোদি-শাহের সুপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা এবং শমিক ভট্টাচার্যের মতো নেতাদের ‘ভদ্রলোক’ ইমেজের সামনে মমতার আক্রমণাত্মক রাজনীতি আবেদন হারায়। 

পশ্চিম বাংলার মানুষ বিশেষ করে যুবসমাজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গরিমা বা পরিচয়নির্ভর রাজনীতির চেয়ে শাসনব্যবস্থার নবায়ন চেয়েছিল। কিন্তু মমতা সময়ের দাবি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন এবং সাংগঠনিক দুর্নীতি ও জনরোষ গুরুত্ব না দিয়ে কার্যত নিজের হারের চিত্রনাট্য নিজেই রচনা করেছেন। পশ্চিম বাংলার রাজনীতিতে এবার এক নতুন গল্পের শুরু হলো, যার কেন্দ্রীয় চরিত্রে আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নেই। 

বিরোধী জোটে নিজের কদর বাড়ানোর স্বপ্ন দেখা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখন নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে দাঁড়িয়ে। এই বিপর্যয়ের জন্য বাইরের কাউকে দোষ দিয়ে লাভ নেই; আয়নায় তাকালেই তিনি দেখতে পাবেন, এই পরাজয় আসলে তার নিজেরই তৈরি।


  বিষয়:   মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়  তৃণমূল কংগ্রেস  ভারতীয় জনতা পার্টি 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: