একটি ‘কৃষ্ণচূড়া গ্রাম’ ও তার অপমৃত্যুর গল্প

ঝিনাইদহ প্রতিনিধি

সারাদেশ

ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার উমেদপুর ইউনিয়নের এক শান্ত জনপদ লক্ষণদিয়া। প্রকৃতি যেখানে সবুজ আঁচল বিছিয়ে রেখেছে চারপাশ। কিন্তু এই সবুজের মাঝে

2026-05-06T15:24:17+00:00
2026-05-06T15:24:17+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
একটি ‘কৃষ্ণচূড়া গ্রাম’ ও তার অপমৃত্যুর গল্প
ঝিনাইদহ প্রতিনিধি
প্রকাশ: বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ৩:২৪ পিএম 
ছবি : সময়ের আলো
ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার উমেদপুর ইউনিয়নের এক শান্ত জনপদ লক্ষণদিয়া। প্রকৃতি যেখানে সবুজ আঁচল বিছিয়ে রেখেছে চারপাশ। কিন্তু এই সবুজের মাঝে এক অদ্ভুত মায়াবী লালের স্বপ্ন দেখেছিলেন এক মানুষ। তিনি চেয়েছিলেন, গ্রামটির ধূলিময় পথঘাট যখন গ্রীষ্মের তপ্ত রোদে পুড়বে, তখন আকাশপানে মাথা তুলে দাঁড়ানো হাজারো কৃষ্ণচূড়া তার আগুনরাঙা রূপ নিয়ে প্রশান্তি দেবে পথচারীকে। পুরো গ্রামটি পরিচিত হবে ‘কৃষ্ণচূড়ার গ্রাম’ হিসেবে। কিন্তু বিধিবাম! এক স্বপ্নদ্রষ্টার সেই লাল-সবুজ ক্যানভাস আজ বিষাক্ত প্রতিহিংসার শিকার।

স্বপ্নবাজ এই মানুষটির নাম আমিনুল ইসলাম। ছোটবেলা থেকেই গাছের সঙ্গে তার নিবিড় সখ্য। পেশাগত ব্যস্ততা কিংবা সাংসারিক সীমাবদ্ধতা- কোনো কিছুই তার বৃক্ষপ্রীতিকে দমাতে পারেনি। ব্যক্তিগত অর্থ, সময় আর হাড়ভাঙা শ্রম দিয়ে তিনি বছরের পর বছর ধরে গ্রামের আনাচে-কানাচে, রাস্তার ধারে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আঙিনায় রোপণ করেছিলেন প্রায় ১ হাজার কৃষ্ণচূড়া চারা। তার লক্ষ্য ছিল একটাই- লক্ষণদিয়া গ্রামকে কৃষ্ণচূড়ার এক অনন্য শৈল্পিক রূপ দেওয়া। তিনি বিশ্বাস করতেন, একদিন দূর-দূরান্ত থেকে পর্যটকরা এই গ্রামের সৌন্দর্য দেখতে ভিড় জমাবে।

অতপর গাছগুলো যখন বড় হতে শুরু করল, ডালপালায় মেলতে লাগল সবুজের সমারোহ, তখনই শুরু হলো এক পৈশাচিক অধ্যায়। প্রকৃতির শত্রু কিছু মানুষ রাতের অন্ধকারে গাছের গোড়ায় ঢালতে শুরু করল বিষাক্ত কেমিক্যাল। স্রেফ প্রতিহিংসা আর অবহেলায় একে একে মরতে শুরু করল প্রাণবন্ত গাছগুলো। ১ হাজার স্বপ্নের চারা থেকে আজ টিকে আছে মাত্র ৫০টির মতো গাছ। 
আমিনুল ইসলাম ক্ষোভ আর হাহাকার নিয়ে বলেন, ‘গাছগুলো সন্তানের মতো বড় করেছিলাম। কিন্তু কিছু মানুষ বিষ দিয়ে আমার স্বপ্নটাকে মেরে ফেলল। যদি গাছগুলো বেঁচে থাকত, আজ এই গ্রামকে সারাদেশের মানুষ চিনত।’ শুধু কৃষ্ণচূড়াই নয়, নিজের বাড়িতে মায়ের নামে ‘সেলাই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র’ গড়ে তুলেছেন তিনি, যার চারপাশ ঘিরে রেখেছেন ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছে। গ্রামবাসী এখন তার বাড়িকে চেনেন ‘গাছ বাড়ি’ হিসেবে।

হাজার গাছ না থাকলেও, টিকে থাকা সেই গুটিকয়েক গাছে যখন গ্রীষ্মে ফুল ফোটে, তখন পুরো এলাকা এক মায়াবী রূপ ধারণ করে। বর্তমানে সেই অল্প কিছু কৃষ্ণচূড়ার শোভা দেখতেই দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসছেন। ছবি তুলে ছড়িয়ে দিচ্ছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। অথচ এই সম্ভাবনা হতে পারত আরও বিশাল। পরিবেশ সচেতন ব্যক্তিত্ব সুজন বিপ্লব মনে করেন, এটি কেবল একটি পরিবেশবান্ধব প্রকল্প ছিল না, বরং গ্রামীণ পর্যটনের এক অপার সম্ভাবনা ছিল। স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা যদি শুরুতে সচেতন হতেন, তবে আজ লক্ষণদিয়া হতে পারত দেশের একটি ‘মডেল গ্রাম’।

লক্ষণদিয়ার মেঠোপথে এখন যে কটি কৃষ্ণচূড়া দাঁড়িয়ে আছে, তাদের লালের মাঝে মিশে আছে হারিয়ে যাওয়া হাজারো স্বপ্নের দীর্ঘশ্বাস। তবে স্বপ্নদ্রষ্টা আমিনুল ইসলাম দমে যাওয়ার পাত্র নন। তার চোখে এখনো নতুন করে গাছ লাগানোর স্বপ্ন। ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান আশ্বাস দিয়েছেন, লিখিত অভিযোগ পেলে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং অবশিষ্ট গাছগুলো রক্ষায় উদ্যোগ নেওয়া হবে।

/কহু



  বিষয়:   ঝিনাইদহ  কৃষ্ণচূড়া  গ্রাম  অপমৃত্যু 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: