অভাবের সংসারে বড় হলেও, প্রযুক্তির প্রতি ছিলো তার ভীষণ আগ্রহ, অজানাকে জানার চেষ্টা। আর সেই চেষ্টাই তাকে নিয়ে গেছে অনন্য উচ্চতায়। মাইক্রোসফটের মতো বড় প্ল্যাটফর্মে জায়গা করে নেওয়া বাংলাদেশী তরুণ কুষ্টিয়ার নাসিমের গল্প তুলে ধরেছেন বন্যা নাসরিন
"মানুষের মতো মানুষ হয়েই তবে আমি বাড়ি ফিরবো" — ক্লাস এইটে পড়া কিশোর নাসিম ড্রয়ারে লিখে রেখেছিল এই কথা। আজ সেই প্রতিজ্ঞা পূর্ণ হয়েছে।
বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জেলার একটি ছোট্ট গ্রাম। সেখানে জন্ম নেন মো. নাসিম আল আওয়াল কবির। বাবা একজন সৎ, পরিশ্রমী মানুষ — একসময় পাবনায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ভালো পদে চাকরি করতেন। কিন্তু, ঘুষ না নেওয়ার কারণে এবং পরিবারের চাপে ১৯৯৬ সালে সেই চাকরি ছেড়ে গ্রামে ফিরে আসেন। শুরু হয় পরিবারের কঠিন সংগ্রামের অধ্যায়। মুদির দোকান, ভাঙারির ব্যবসা — কোনোটাই টেকেনি বেশিদিন। শেষমেশ, ২০০৩ সালে দলিল লেখক হিসেবে জীবিকা শুরু করেন তার বাবা। ছোট্ট কবির তখন ক্লাস সেভেনের ছাত্র। অভাবের সংসারে স্কুলের অর্ধেক বেতনে পড়তে হতো তাকে।
কিশোর কবির জীবনে একটি ঘটনা আছে, যা তার চরিত্রের গভীরতা প্রকাশ করে। ক্লাস এইটে পড়াকালীন, বাড়ির কঠোর শাসন এবং প্রতিকূল পরিবেশ থেকে মুক্তি খুঁজতে এক বন্ধুকে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যান তিনি। রেললাইনের উপর দিয়ে হেঁটে মিরপুর থেকে ভেড়ামারা, পাকশি ব্রিজ পেরিয়ে ঈশ্বরদী — প্রায় ২৫-৩০ কিলোমিটার পথ। পায়ে ফোসকা পড়ে গিয়েছিল। রাজশাহী স্টেশনে রাত কাটান দুই কিশোর। ট্রেনে বই বিক্রির পরিকল্পনা ব্যর্থ হয় তাদের। নাটোরে পৌঁছে, হঠাৎ বাড়ির টান অনুভব করেন। ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার আগে ড্রয়ারে লিখে রেখেছিলেন, "মানুষের মতো মানুষ হয়েই তবে আমি বাড়ি ফিরবো।" এ কথাটা সেদিন সত্যি না হলেও, আজ হয়েছে।
ছোটবেলা থেকেই প্রযুক্তির প্রতি ছিলো তার তীব্র আকর্ষণ। এলাকার সব মোবাইল, টেলিভিশন তিনি ঠিক করে দিতেন — কেউ না শেখালেও। নবম শ্রেণীতে কুষ্টিয়ার আমলা স্কুলে পড়ার সময় ঢাকার ডিনেট পরিচালিত "কম্পিউটার লিটারেসি প্রোগ্রাম (CLP)" -এ হাতেকলমে কম্পিউটার শেখার সুযোগ পান। স্কুল শুরুর আগে ভোরবেলায় মাঠের পথ ধরে হেঁটে আসতেন, ঝড়-বৃষ্টিও থামাতে পারেনি তাকে। বিজ্ঞান বিভাগে জীববিজ্ঞানের পরিবর্তে কম্পিউটার বেছে নিলেন। পরে ভর্তি হলেন কুষ্টিয়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে, কম্পিউটার বিভাগে। পলিটেকনিকে একটি বিষয়েও অকৃতকার্য হননি।

পলিটেকনিকে পড়ার সময় ইন্টারনেট মডেম কেনার টাকা ছিলো না নাসিমের। মা নিজের ছাগল বিক্রি করে একটি মোবাইল কিনে দেন — যেটা কবির মডেম হিসেবে ব্যবহার করতেন। সেই মোবাইলই হয়ে ওঠে তার প্রযুক্তির দুনিয়ায় প্রবেশের দরজা।
২০১২ সালে সেই ডিনেটেই যোগ দেন Program Assistant হিসেবে- যে প্রতিষ্ঠানের কোর্স তিনি করেছিলেন নবম শ্রেণীতে। এরপর ধাপে ধাপে উন্নতি: Program Associate (২০১৫), Assistant Director (২০১৮)। এই সময়ে সারা বাংলাদেশের ৬৪ জেলার প্রায় ৩৫০টি হাইস্কুলে ঘুরেছেন, প্রায় তিন হাজার শিক্ষককে আইসিটি প্রশিক্ষণ দিয়েছেন — ব্রিটিশ কাউন্সিলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায়। গর্বের বিষয়, নিজের স্কুলের শিক্ষকদেরও প্রশিক্ষণ দেওয়ার সুযোগ হয়েছে তার।
২০১৮ সালের শেষে জাপানে আসেন নাসিম। ভাষা না জানায়, প্রথমে নাগোয়ায় একটি গাড়ি কারখানার প্রোডাকশন লাইনে কাজ করতে হয়। কিন্তু, নিজের ক্ষেত্রে ফেরার স্বপ্ন থেমে থাকেনি তার। ২০২০ সালের মে মাসে, করোনার ভয়াবহ সময়ে, স্ত্রীর উৎসাহে ইন্টারভিউ দেন জাপানের অন্যতম বৃহৎ টেলিকম কোম্পানি NTT Communications-এ। যোগ দেন Network Operations Center Engineer হিসেবে। দায়িত্ব ছিলো, সাবমেরিন কেবলের সিগন্যাল মনিটরিং এবং গ্লোবাল কাস্টমার সাপোর্ট। টানা ৫ বছর ৮ মাস নিষ্ঠার সাথে কাজ করেন। পাশাপাশি চলে নিজেকে আরও শাণিত করার অদম্য চেষ্টা। অনলাইনে ৪০টিরও বেশি সার্টিফিকেশন, Amazon, Google, Apple, Oracle, IBM, Microsoft-সহ বড় বড় প্রতিষ্ঠানে প্রায় পাঁচ বছর ধরে চাকরির আবেদন এবং ইন্টারভিউ দেন। বারবার প্রত্যাখ্যান হন। কিন্তু, তিনি থামেননি।
অবশেষে সেই মুহূর্ত এলো। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে যোগ দিলেন Microsoft Japan-এর CO+I দলে। এই দলটি Microsoft-এর ডেটাসেন্টার তৈরি, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করে — অর্থাৎ Azure, Microsoft 365, Xbox-সহ সমস্ত ক্লাউড সেবা যেন নিরবচ্ছিন্নভাবে চলে, তার দায়িত্ব।
Microsoft-এর ট্রেইনার জিজ্ঞেস করেছিলেন, ইংরেজি কোথায় শিখলেন? উত্তর ছিল সরল, "সিনেমা আর গান থেকে।" সম্প্রতি TOEIC-এ ৮৭৫ পেয়েছেন, জাপানিজ ভাষার N4 পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ হয়েছেন — প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই, নিজ আগ্রহ আর অধ্যবসায়ে।
কবি বলেন, "২০২৬ সালে প্রতিযোগিতার এই যুগে নিজেকে দক্ষ না করলে, সামনের জীবন আরও কঠিন হবে। ইংরেজি ভাষা, কম্পিউটার দক্ষতা এবং সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কে জ্ঞান এখন অপরিহার্য। প্রতিনিয়ত নতুন কিছু শিখতে হবে, থেমে থাকলে চলবে না।"
ভবিষ্যতে দেশের তরুণদের জন্য কাজ করতে চান তিনি। নিজের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও অনুপ্রেরণা ছড়িয়ে দিতে চান তাদের মাঝে।
/মহু