বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম মহানগরী মেক্সিকো সিটি বর্তমানে এক ভয়াবহ ভূ-তাত্ত্বিক সংকটের মুখে পড়েছে। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার অত্যাধুনিক রাডার প্রযুক্তির সাম্প্রতিক চিত্রে দেখা গেছে, শহরটি প্রতি মাসে গড়ে আধা ইঞ্চিরও বেশি নিচে দেবে যাচ্ছে।
এই অস্বাভাবিক অবনমন এতটাই তীব্র যে এখন মহাকাশ থেকেও তা স্পষ্টভাবে ধরা পড়ছে। নাসার নতুন এই তথ্য মেক্সিকো সিটিকে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত ডুবে যাওয়া রাজধানীর তকমা দিয়েছে। প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ মানুষের এই মহানগরী তলিয়ে যাওয়ার এই গতি পরিবেশবিদ ও নগর পরিকল্পনাবিদদের কপালে গভীর উদ্বেগের ভাঁজ ফেলেছে।
মেক্সিকো সিটির এই বসে যাওয়ার ইতিহাস অবশ্য এক শতাব্দীরও বেশি পুরনো। নাসার সংগৃহীত ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৮০০ সালের শেষ ভাগে শহরটি বছরে প্রায় ২ ইঞ্চি হারে নিচে নামত। ১৯৫০ সালের দিকে সেই হার নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়ে বছরে প্রায় ১৮ ইঞ্চিতে পৌঁছায়।
বর্তমানে এই হার কিছুটা কমলেও শহরের কিছু নির্দিষ্ট অংশ কয়েকশ ফুট পর্যন্ত নিচে নেমে গেছে। এর প্রভাবে শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও অবকাঠামোতে বড় ধরনের ফাটল ও ধস দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে শহরের প্রধান বিমানবন্দর বেনিতো হুয়ারেজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে অন্যতম হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
শহরের এই অবনমনের দৃশ্যমান প্রমাণ পাওয়া গেছে মেক্সিকোর স্বাধীনতার ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে নির্মিত ১১৪ ফুট উঁচু ‘অ্যাঞ্জেল অব ইনডিপেনডেন্স’ স্মৃতিস্তম্ভে। ১৯১০ সালে এটি নির্মাণের পর থেকে এর চারপাশের ভূমি এতটাই নিচে নেমে গেছে যে, স্তম্ভের মূল কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে পরবর্তীতে সেখানে অতিরিক্ত ১৪টি সিঁড়ি যোগ করতে হয়েছে।
গবেষকরা জানিয়েছেন, মেক্সিকো সিটি মূলত একটি প্রাচীন হ্রদের নরম মাটির ওপর নির্মিত হওয়ায় এই সমস্যা প্রকট হয়েছে। আগে জলাভূমি ও খাল সমৃদ্ধ এই এলাকার মাটি প্রাকৃতিকভাবেই সংকুচিত হয়, যা বড় বড় স্থাপনার ভার সইতে পারছে না।
তবে এই সংকটের জন্য প্রাকৃতিক কারণের চেয়ে মানুষের অপরিকল্পিত কার্যকলাপকেই বেশি দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। মেক্সিকো সিটির বিশাল জনসংখ্যার জন্য পানির চাহিদা মেটাতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অত্যধিক নির্ভরশীলতা এই পরিস্থিতির মূল কারণ।
ভূগর্ভস্থ পানি অতিরিক্ত উত্তোলনের ফলে মাটির ভেতরে যে শূন্যতা তৈরি হচ্ছে, তার ফলেই ভূমি দেবে যাচ্ছে। এর পাশাপাশি শহরের ক্রমাগত উন্নয়ন ও ভারী অট্টালিকা নির্মাণ এই প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে এই মহানগরীর বিশাল অংশ স্থায়ীভাবে বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়তে পারে।
সূত্র: সিএনএন
সময়ের আলো/টিএইচ