ঢাকায় টিকে থাকা শেষ পুকুরগুলো

বন্যা নাসরিন

ফিচার

মাত্র কয়েক দশক আগেও ঢাকা শহরজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল প্রায় দুই হাজার পুকুর। গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিভার অ্যান্ড ডেলটা রিসার্চ সেন্টার

2026-05-07T17:52:43+00:00
2026-05-09T12:09:47+00:00
 
  শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬,
১ কার্তিক ১৪৩৩
শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
ফিচার
ঢাকায় টিকে থাকা শেষ পুকুরগুলো
বন্যা নাসরিন
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৭ মে, ২০২৬, ৫:৫২ পিএম  আপডেট: ০৯.০৫.২০২৬ ১২:০৯ পিএম
গ্রাফিক : সময়ের আলো
মাত্র কয়েক দশক আগেও ঢাকা শহরজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল প্রায় দুই হাজার পুকুর। গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিভার অ্যান্ড ডেলটা রিসার্চ সেন্টার (আরডিআরসি)-এর ২০২৩ সালের এক গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকায় এখনো ২৪১টি পুকুর টিকে আছে।

ঢাকার বুকে হারিয়ে যাওয়া হাজারো পুকুরের মাঝে হাতে-গোনা যে কয়েকটি পুকুর এখনও টিকে আছে, তার মধ্যে পুরান ঢাকা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুকুরগুলো অন্যতম। নগরায়ণের দাপটে অনেক পুকুর ভরাট হয়ে গেলেও কিছু পুকুর আজও টিকে আছে। 

গোল তালাব (নবাব বাড়ি পুকুর)
পুরান ঢাকার ইসলামপুরে আহসান মঞ্জিলের পাশে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক পুকুরটি প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো। এর আয়তন ২ দশমিক ২৩ একর এবং গভীরতা ২৩ ফুট।

পুকুরটি কবে খনন করা হয়েছিল, তার নিশ্চিত তথ্য নেই। তবে ধারণা করা হয়, নবাব আবদুল বারী এটি খনন করেছিলেন। পরে নবাব খাজা আলিমুল্লা ১৮৩০ সালে পুকুরটি কিনে নিয়ে সংস্কার করেন। দ্বিতীয় দফায় ১৮৮৬ সালে পুনরায় খনন ও সংস্কারের মাধ্যমে এটি বর্তমান রূপ লাভ করে।


স্থানীয়ভাবে এটি 'নবাব বাড়ি পুশকুনি' নামেও পরিচিত। বর্তমানে এটি একটি সংরক্ষিত ঐতিহ্যবাহী স্থান এবং সাধারণ মানুষের গোসলের জন্য ব্যবহৃত হয়। প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত পুকুরের ঘাট সবার জন্য খোলা থাকে। গোসল করতে খরচ আগে ৫ টাকা ছিল, এখন ১০ টাকা। পুকুরের চারপাশে গাছের সমারোহ এবং মানুষের হাঁটার জন্য রাস্তা রয়েছে। বিভিন্ন ধরনের মাছও চাষ করা হয় এখানে। বছরের বিভিন্ন সময় এখানে টিকিট কেটে বড়শি দিয়ে মাছ ধরার ব্যবস্থা থাকে। 

হোসেনি দালান পুকুর
হোসেনি দালানের দৃষ্টিনন্দন স্থাপনার সামনে একটি স্বচ্ছ পানির পুকুর রয়েছে। ধারণা করা হয়, পুকুরটি ৩৫০ বছর আগে হোসেনি দালান নির্মাণের সময় অথবা তার কাছাকাছি কোনো সময় খনন করা হয়েছিল। পরবর্তীতে একাধিকবার এটি সংস্কার করা হয়।


শহীদুল্লাহ হল পুকুর
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলের পুকুরটি এর দেড়শ বছরের ইতিহাস, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং রহস্যের জন্য পরিচিত। পুকুরটি শহীদুল্লাহ হল এবং ফজলুল হক হলের মাঝখানে অবস্থিত। পুকুরের চারপাশে পায়ে হাঁটা সুন্দর রাস্তা আছে। কার্জন হলের পেছনের এই পুকুরটি রোজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং বহিরাগতদের পদচারণায় মুখর থাকে।


বংশাল বা সিক্কাটুলি পুকুর
কাজী আলাউদ্দিন সড়কের উত্তর পাশে প্রায় এক বিঘা আয়তনের এই পুকুরটির বয়স প্রায় ১৩২ বছর। নাজিরাবাজার, হাজী ওসমান গনি রোড, আগামসি লেন, সাত রওজা, মাহুতটুলী, কায়েতটুলী, মুকিম বাজারসহ বংশাল এলাকার মানুষরা বিভিন্ন কাজে পুকুরটি ব্যবহার করে থাকেন।


কে, কখন কীভাবে এই পুকুরটি খনন করেছিলেন, সে ব্যাপারে নিশ্চিত তথ্য নেই। তবে, স্থানীয় সূত্রে কিছু তথ্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত হচ্ছে, তৎকালীন বংশালের মুসলিম যুব সংঘের সভাপতি ছিলেন মীর মোস্তাক আহমেদ। তার স্ত্রীর নাম ছিল বোচা বিবি। জনসাধারণের পানির কষ্ট লাঘবের জন্য বোচা বিবি তার দেনমোহরের টাকায় নাজিরাবাজার-সংলগ্ন এই পুকুরটি খনন করেন।


একসময় এ পুকুরে মাছচাষ করা হত। সব বয়সী লোকদের গোসল, সাঁতার কাটা, হৈ-হুল্লোড়, নৌকা ভ্রমণে সরব থাকত। এলাকাবাসী পুকুরটিকে বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করতেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের দৈনন্দিন পানির চাহিদাও পূরণ হত। এখনো ভারী বৃষ্টি হলে জলাবদ্ধতা থেকে রেহাই দেয় এ পুকুর।

অথচ পুরান ঢাকায় অবস্থিত এ পুকুরটির ঠিকঠাক রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে না। তাই পুকুরটির পুরোপুরি সুফলও ভোগ করতে পারছে না স্থানীয়রা। 

বলধা গার্ডেন পুকুর
পুরান ঢাকার ওয়ারীতে অবস্থিত ঐতিহাসিক বলধা গার্ডেনের ‘সিবিলী’ অংশে একটি প্রাচীন ও দর্শনীয় পুকুর রয়েছে, যা উদ্যানটির অন্যতম মূল আকর্ষণ। পুকুরটি শঙ্খনদ নামেও পরিচিত। ১৯০৯ সালে বলধা এস্টেটের জমিদার নরেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী এই বাগানটি তৈরি করেন। বাগানের শান্ত ও প্রাকৃতিক পরিবেশে এই পুকুরটি যেন তার পূর্ণ রূপ মেলে ধরেছে। 


পুকুরটির চারপাশে রয়েছে নানারকম বিরল ও দুর্লভ প্রজাতির উদ্ভিদ। পুকুরটি দর্শনার্থীদের জন্য এক টুকরো শীতলতা ও শান্তির আধার হিসেবে কাজ করে। প্রতিদিন অনেক দর্শনার্থী ভিড় করেন এখানে।

লালবাগ কেল্লা পুকুর
পুরান ঢাকার লালবাগ কেল্লার ভেতরের পুকুরটি ’বিবির পুকুর’ বা ’পরী বিবির ঘাট’ নামে পরিচিত, যা মুঘল আমলের নান্দনিকতার সাক্ষী। এটি কেল্লা চত্বরের মাঝখানের অংশে, দিওয়ান-ই-আম এবং হাম্মামখানার পূর্বে এবং পরী বিবির মাজারের সামনে অবস্থিত। আয়তনে এটি বর্গাকার। এর চারপাশেই নিচে নামার সিঁড়ি রয়েছে। মুঘল আমলে নবাব পরিবারের সদস্যরা পুকুরটিতে গোসল করতেন। বর্তমানে পুকুরটি প্রায় সারা বছরই পানিশূন্য থাকে।

জগন্নাথ হল পুকুর
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে সুন্দর একটি পুকুর রয়েছে। এই শতবর্ষী পুকুরটিতে হল প্রশাসন মাছ চাষ করে। বর্ষা মৌসুমে শিক্ষার্থীরা ছিপ দিয়ে মাছ শিকার করেন। পুকুরটি সংস্কার করা হয়েছে।


জহুরুল হক হল পুকুর
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের ভেতরে রয়েছে আরও একটি বড় পুকুর। এটি হলের আবাসিক শিক্ষার্থীদের প্রাকৃতিক পরিবেশে সময় কাটানো এবং গোসলের জন্য ব্যবহৃত হয়। এখানেও মাছ চাষ  হয়। 


ঢাকেশ্বরী মন্দির পুকুর
ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পুকুরটি ঢাকার অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ পুকুর, যা প্রায় ৮০০ বছরের পুরনো। দ্বাদশ শতাব্দীতে সেন রাজবংশের রাজা বল্লাল সেন মন্দির নির্মাণের সময় ভক্তদের ব্যবহারের জন্য এই পুকুরটি খনন করেছিলেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। এখনো পুণ্যার্থী ও দর্শনার্থীরা এই পুকুর ব্যবহার করেন। পুরান ঢাকার লালবাগ থানার পলাশী মোড় এলাকার ঢাকেশ্বরী রোডে অবস্থিত এই পুকুরটি ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে এখনো টিকে আছে।


রোজ গার্ডেন পুকুর
পুরান ঢাকার টিকাটুলির কেএম দাস লেনে অবস্থিত ঐতিহাসিক রোজ গার্ডেন। তার সামনের শান-বাঁধানো পুকুরটি ১৯৩০-এর দশকে খনন করা হয়। হৃষিকেশ দাসের বিশাল বাগানবাড়ি ও প্রাসাদের নান্দনিক সৌন্দর্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল এই পুকুর। বর্তমানে পুকুরসহ বাড়িটি বাংলাদেশ সরকারের সংরক্ষিত পুরাকীর্তি। সরকারি উদ্যোগে এখানে জাদুঘরও প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।


এছাড়াও রাজারবাগ পুলিশ লাইন পুকুর, বঙ্গভবনের পুকুর, জাতীয় জাদুঘরের পিছনের পুকুর, পিলখানার ভিতরের পুকুরসহ ঢাকায় আরও কিছু পুকুর এখনো টিকে আছে। তবে অপরিকল্পিত নগরায়ন ও দখলদারিত্বে এ পুকুরগুলোও হয়তো একসময় ভরাট হয়ে যাবে। এটি শহরে বসবাসরত মানুষের জন্য ক্ষতিকর হবে। কারণ এতে জলাবদ্ধতা বাড়বে, বড় আকারে আগুন লাগলে তা নেভানোর জন্য পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যাবে না। তাপমাত্রাও বৃদ্ধি পাবে। তাই সবার এখনই সচেতন হওয়া উচিত, যেন পুকুরগুলোর যথেষ্ট রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়।

/মহু

  বিষয়:   পুকুর  ঢাকা  হোসেনি দালান  শহিদুল্লাহ হল  বলধা গার্ডেন পুকুর  বংশাল  সিক্কাটুলি  লালবাগ কেল্লা  জগন্নাথ হল  জহুরুল হক হল  ঢাকেশ্বরী মন্দির  রোজ গার্ডেন  গোল তালাব  নবাব বাড়ি পুকুর 


Advertisement
Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: