ইরানের অন্ধকারাচ্ছন্ন গলি থেকে শুরু করে সুপরিসর রাজপথ- সর্বত্রই এখন শোকের মাতম। কালো পোশাক পরিহিত শত শত মানুষের বুক চাপড়ানোর শব্দের সাথে তাল মিলিয়ে ধর্মীয় বক্তাদের কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছে শাহাদাত, আত্মত্যাগ আর যুদ্ধের মর্সিয়া। ২০২৫ সালের জুনে ১২ দিনব্যাপী ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের পর থেকে এই দৃশ্য ইরানের সমকালীন ‘যুদ্ধকালীন আবহে’ এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শোকের এই বিশেষ রীতি ‘লাতমিয়াহ’ নামে পরিচিত, যার উৎস মূলত ১০ মহররমের আশুরা। ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে কারবালার প্রান্তরে নবী দৌহিত্র ইমাম হোসাইন (আ.)-এর বীরত্বগাথাকেই এখন বর্তমানের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন রূপ দিচ্ছে ইরান।
ইরানের রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট প্রখ্যাত ধর্মীয় সংগীতশিল্পী বা ‘মদ্দাহ’- যেমন মাহদি রাসুলি, হোসেন তাহেরি ও সাইয়্যেদ রেজা নারিমানিরা কারবালার সেই ঐতিহাসিক লড়াইকে সরাসরি বর্তমানের ‘যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরান’ যুদ্ধের সমান্তরালে দাঁড় করিয়েছেন। গত মার্চে এক অনুষ্ঠানে হোসেন সতুদেহ ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মুজতবা খামেনিকে কারবালার পতাকাবাহী ‘হযরত আব্বাস (আ.)’-এর সাথে তুলনা করেন।
ফেব্রুয়ারিতে মৃত্যুর মাত্র দুই সপ্তাহ আগে এক বিবৃতিতে সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বলেছিলেন, হোসাইন যেভাবে ইয়াজিদের কাছে মাথা নত করেননি, ইরানও তেমনি আমেরিকার বর্তমান দুর্নীতিবাজ শাসকদের কাছে আনুগত্যের শপথ নেবে না।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই শোকগাথায় যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা- ফারসি জাতীয়তাবাদ। গত বছরের মহররমের এক অনুষ্ঠানে প্রখ্যাত মদ্দাহ মাহমুদ করিমি ইরানের দেশাত্মবোধক গান ‘এ ইরান’-এর সংস্করণ গেয়ে শোনান, যেখানে ইরানকে ‘কারবালার পুণ্যভূমি’ হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে।
অন্য এক অনুষ্ঠানে হোসেন তাহেরি দশম শতাব্দীর বিখ্যাত মহাকাব্য ‘শাহনামা’-র বীর রুস্তমের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ইমাম হোসাইন আজ একা নন, কারণ আমরা রুস্তমের বংশধর। অর্থাৎ, একদিকে ইসলামের প্রতিরক্ষা এবং অন্যদিকে ইরানের অখণ্ডতা- এই দুই চেতনাকে একীভূত করার চেষ্টা করছে তেহরান।
রাষ্ট্রীয় এই বয়ান সমর্থকদের মাঝে উদ্দীপনা সৃষ্টি করলেও সমালোচকরা একে দেখছেন ভিন্নভাবে। তাদের মতে, ধর্মীয় আবেগ ও কারবালার প্রতীকগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে সরকার। ২০২১ ও ২০২৩ সালের বিক্ষোভের সময় অনেক আন্দোলনকারী খামেনিকে কারবালার অত্যাচারী শাসক ‘ইয়াজিদ’ বা শাহনামার কাল্পনিক স্বৈরাচারী ‘জহহাক’-এর সাথে তুলনা করেছিলেন।
তবে ভূ-রাজনীতিবিদদের মতে, ইরানের জাতীয় পরিচয় ও ধর্মীয় মিশনের এই মেলবন্ধন দেশটির সমাজ ব্যবস্থায় অত্যন্ত গভীর। গত ডিসেম্বরে রিয়ালের রেকর্ড দরপতনের পর অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ হলেও, বহিঃশক্তির হস্তক্ষেপের প্রশ্নে অনেক ইরানিই কারবালার সেই ‘প্রতিরোধের ভাষা’য় একাত্মতা প্রকাশ করছেন।
/কহু