র‌্যাব বাহিনীর পুনর্গঠন : দেশ কি সেই আবর্তে

​শহীদুল্লাহ ফরায়জী

মতামত

​একটি সার্বভৌম প্রজাতন্ত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং গোয়েন্দা সংস্থা কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, এগুলো আধুনিক রাষ্ট্রের অপরিহার্য ও স্বাভাবিক অনুষঙ্গ।

2026-05-09T02:06:44+00:00
2026-05-09T02:06:44+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬,
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
মতামত
র‌্যাব বাহিনীর পুনর্গঠন : দেশ কি সেই আবর্তে
​শহীদুল্লাহ ফরায়জী
প্রকাশ: শনিবার, ৯ মে, ২০২৬, ২:০৬ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
​একটি সার্বভৌম প্রজাতন্ত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং গোয়েন্দা সংস্থা কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, এগুলো আধুনিক রাষ্ট্রের অপরিহার্য ও স্বাভাবিক অনুষঙ্গ। কিন্তু কোনো সভ্য জনপদে ‘কসাই বাহিনী’র অস্তিত্ব থাকতে পারে না। এমন কোনো বাহিনীর অস্তিত্ব কল্পনা করাও দুষ্কর, যার নাম উচ্চারিত হলে নাগরিকের মনে আইনি আশ্রয়ের পরিবর্তে নিরেট আতঙ্কের সঞ্চার হয়, নিরাপত্তা নয়, বরং গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিভীষিকা হানা দেয়। যে বাহিনী সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার সম্মুখীন হয়, তাকে ঘিরে রাষ্ট্রের প্রতিটি পদক্ষেপ জনমনে নৈতিক ও রাজনৈতিক প্রশ্নের উদ্রেক করাটাই স্বাভাবিক।

​এই ধ্রুব সত্যটি আজ পুনরায় আলোচনায় উঠে এসেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) জন্য ১৬৩টি নতুন গাড়ি ক্রয়ে ১২২ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদনের সংবাদকে কেন্দ্র করে। প্রশ্ন জাগে, এই বিশাল ব্যয় এবং তোড়জোড়ের মাধ্যমে রাষ্ট্র তার জনগণের কাছে ঠিক কী বার্তা পৌঁছাতে চাইছে?

​এটি কেবল যান্ত্রিক সরঞ্জাম সংগ্রহের বিষয় নয়, এটি মূলত রাষ্ট্রের নৈতিক অগ্রাধিকারের প্রশ্ন। একটি রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র যখন ক্ষতবিক্ষত জনপদের সংস্কারের চেয়ে দমনযন্ত্রকে সুসজ্জিত করতে অধিক তৎপর হয়, তখন নাগরিকরা প্রমাদ গুনে। প্রশ্ন ওঠে- এই রাষ্ট্র কি সত্যিই নতুন কোনো দিগন্তের সন্ধান করছে, নাকি পুরোনো সেই সহিংস কাঠামোকেই নবরূপে পুনরুজ্জীবিত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে?
আরও পড়ুন

​বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে ‘র‌্যাব’ কেবল একটি সংক্ষেপিত নাম নয়, বরং এটি একটি যন্ত্রণাদায়ক রাজনৈতিক স্মৃতির নামান্তর। বছরের পর বছর ধরে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং ভীতির সংস্কৃতির সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে এই বাহিনী। মধ্যরাতে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে পরিবারগুলো আশ্বস্ত হওয়ার বদলে আতঙ্কিত হয়েছে। অসংখ্য মানুষ নিখোঁজ হয়েছে রাষ্ট্রের অদৃশ্য গহ্বরে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি এমন এক চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়েছিল- রাষ্ট্রের হাতে ধরা পড়া মানে ন্যায়বিচার পাওয়া নয়, বরং চিরতরে হারিয়ে যাওয়া।

​সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় হলো, র‌্যাবের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক মনস্তত্ত্বের বহিঃপ্রকাশ। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ অনুযায়ী, আটকের পরপরই ‘ক্রসফায়ার’-এর হুমকি দেওয়াটা বাহিনীর এক অলিখিত রীতিতে পরিণত হয়েছিল। যেন রাষ্ট্রের প্রচলিত বিচারিক প্রক্রিয়ার তোয়াক্কা না করে তাৎক্ষণিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার এক সার্বভৌম ক্ষমতা তাদের হাতে ন্যস্ত। এই সংস্কৃতি একটি বিপজ্জনক ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করে : রাষ্ট্রের কিছু বাহিনী নাগরিক হত্যাকেই নিজেদের বৈধ অধিকার হিসেবে গণ্য করতে শুরু করেছিল।

​সবচেয়ে মর্মান্তিক দিকটি হলো, এই অসাংবিধানিক কাঠামোর সঙ্গে প্রতিরক্ষা বাহিনীর বহু দক্ষ ও প্রশিক্ষিত সদস্যকে সম্পৃক্ত করা হয়েছিল। এর ফলে তারা রাষ্ট্রের অতন্দ্র প্রহরী হওয়ার পরিবর্তে ধীরে ধীরে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ারে পরিণত হচ্ছিলেন। সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া গুম কমিশনের কাছে তার জবানবন্দিতে এই রূঢ় বাস্তবতারই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। এত গুরুতর অভিযোগ ও নৈতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হওয়ার পরও রাষ্ট্র যদি আমূল সংস্কারের পরিবর্তে একই কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করার পথ বেছে নেয়, তবে বুঝতে হবে, রাষ্ট্র আইনের শাসনের বদলে পুনরায় ভয়ের শাসনকেই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে সচেষ্ট।

​এই প্রেক্ষাপটে ‘কসাই বাহিনী’ শব্দটি কোনো রাজনৈতিক অলংকার নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী নৈতিক অভিযোগ। এটি প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র এমন এক দানবীয় শক্তি গড়ে তুলেছিল, যা নাগরিক সুরক্ষা প্রদানের সীমা লঙ্ঘন করে জনগণের মূর্ত আতঙ্কে রূপান্তরিত হয়েছিল।

​প্রজাতন্ত্রের মূল দর্শন হলো- রাষ্ট্রের যাবতীয় শক্তি শেষ পর্যন্ত নাগরিকের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষার রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে। রাষ্ট্র কখনোই তার নিজ জনগণের বিরুদ্ধে রণসজ্জা করতে পারে না। নিরাপত্তা বাহিনীর লক্ষ্য হওয়া উচিত আইনের শাসন নিশ্চিত করা, ভয় সৃষ্টি করা নয়। প্রতিরক্ষা বাহিনীর আনুগত্য থাকবে ভূখণ্ড ও সংবিধানের প্রতি, কোনো বিশেষ গোষ্ঠী বা ব্যক্তির প্রতি নয়। যখন কোনো বাহিনী জবাবদিহির ঊর্ধ্বে চলে যায়, তখন সেটি আর প্রজাতন্ত্রের থাকে না, বরং ক্ষমতার ব্যক্তিগত রক্ষীবাহিনীতে পরিণত হয়।

​সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, গণঅভ্যুত্থানের পর জনগণের প্রত্যাশা ছিল- রাষ্ট্র অন্তত এই সহিংস অতীত থেকে একটি নৈতিক বিচ্ছেদ ঘটাবে। সত্য উদঘাটন হবে, বিচার হবে এবং নিরাপত্তা খাতের আমূল সংস্কার হবে। কিন্তু আজ সংস্কারের আগে যখন সেই দমনযন্ত্রেরই শক্তি বৃদ্ধির আয়োজন বেশি দৃশ্যমান হয়, তখন গণমানুষের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ শুরু হয়।

​আজও সেই সব হতভাগা মায়ের বুকফাটা হাহাকার বাংলার আকাশে-বাতাসে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। যেসব সন্তানকে তারা ফিরে পায়নি, তাদের জন্য ঝরা চোখের পানি আজও শুকায়নি। 

রাজপথের ধূলিকণায় এখনও মিশে আছে সেসব বীর সন্তানের রক্ত, যারা এক নতুন ও মানবিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিল। সেই অশ্রু আর রক্তের দাগ মুছে যাওয়ার আগেই যখন আবারও একই বাহিনীকে পুনর্গঠনের তোড়জোড় চলে, তখন তা শহিদের রক্তের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল হয়। রাষ্ট্র যখন সংস্কারের পরিবর্তে পুরোনো ঘাতকযন্ত্রকেই পালিশ করে জনসমক্ষে আনে, তখন নিহতদের বিদেহী আত্মা আর স্বজনহারাদের দীর্ঘশ্বাস রাষ্ট্রকে অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করায়।

​ইতিহাস সাক্ষী, যে রাষ্ট্র দমনযন্ত্রকে মানবিক ও সংস্কারমুক্ত না করে কেবল শক্তিশালী করে, সে রাষ্ট্র অচিরেই জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। আর জনসমর্থনহীন রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত টিকে থাকার জন্য অস্ত্রের ভাষার ওপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠে। প্রখ্যাত রাষ্ট্রচিন্তক হান্না আরেন্ট বলেছিলেন- ‘সহিংসতা ক্ষমতার শক্তি নয়, বরং এটি ক্ষমতার চরম সংকটের লক্ষণ।’

​বাংলাদেশ কি সেই একই আবর্তে আবর্তিত হচ্ছে? এই প্রশ্ন আজ এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এটি কেবল নতুন গাড়ি কেনা বা বাজেট বরাদ্দের প্রশ্ন নয়, এটি রাষ্ট্রের আত্মপরিচয় ও গন্তব্যের প্রশ্ন। আমরা কি এমন একটি প্রজাতন্ত্র গড়ে তুলব যেখানে নাগরিক তার রাষ্ট্রকে ভালোবাসবে এবং সম্মান করবে? নাকি এমন এক বিভীষিকাময় রাষ্ট্রে বাস করব যেখানে নাগরিক রাষ্ট্রকে কেবল যমদূত মনে করে ভয় পাবে?

​আইনশৃঙ্খলা ও অপরাধ দমনের প্রয়োজনে বাহিনী অবশ্যই থাকবে। কিন্তু কোনো সভ্য ও গণতান্ত্রিক জনপদে ‘কসাই বাহিনী’র ঠাঁই হতে পারে না। কারণ যে রাষ্ট্র তার নিজ নাগরিককে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে, সেই রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে তার নিজের নৈতিক ও আইনি বৈধতাকেই সমূলে বিনাশ করে।

গীতিকবি

এএডি/


  বিষয়:   র‌্যাব  বাহিনী  পুনর্গঠন  দেশ 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: