তিতাসের জলে ভেসে বিদ্যাকুটের সেই সতীদাহ মন্দিরে

সিদ্দিকুর রহমান স্বপন

ফিচার

বাংলাদেশের অনিন্দ্য সুন্দর এক গ্রামের নাম বিদ্যাকুট। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার এ গ্রামে আছে কালের নির্মম অধ্যায়ের এক নীরব সাক্ষী-

2026-05-09T11:56:39+00:00
2026-05-09T11:58:15+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
ফিচার
তিতাসের জলে ভেসে বিদ্যাকুটের সেই সতীদাহ মন্দিরে
সিদ্দিকুর রহমান স্বপন
প্রকাশ: শনিবার, ৯ মে, ২০২৬, ১১:৫৬ এএম  আপডেট: ০৯.০৫.২০২৬ ১১:৫৮ এএম
বিদ্যাকুটের সতীদাহ মন্দির। গ্রাফিক : সময়ের আলো
বাংলাদেশের অনিন্দ্য সুন্দর এক গ্রামের নাম বিদ্যাকুট। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার এ গ্রামে আছে কালের নির্মম অধ্যায়ের এক নীরব সাক্ষী- সতীদাহ মন্দির। বিদ্যাকুট গ্রাম আর সেই মন্দিরের টানে একদিন তিতাসের জলে ভেসে রওনা হলাম।

বাংলার গ্রামগুলোর একটা অদ্ভুত স্বভাব আছে। তারা কখনও পুরোপুরি নিজেকে খুলে দেয় না। একটু রহস্য রেখে, দীর্ঘশ্বাস জমিয়ে রাখে। আর সেই দীর্ঘশ্বাসের পেছনে যদি থাকে ইতিহাস, তাহলে কথাই নেই- না চাইলেও তা মানুষকে টেনে নিয়ে যায়।

প্রথমে পৌর তলা থেকে অটোরিকশায় উঠে গোকর্ণঘাটের দিকে রওনা দিলাম। বর্ষার সময় এই জনপদের আলাদা এক রূপ। রাস্তার দুই পাশে জল, দূরে গাছপালার সবুজ, মাঝে মাঝে তালগাছ এমনভাবে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে, যেন সে এই এলাকার পাহারাদার। গোকর্ণঘাটে পৌঁছে বিশাল এক বটগাছের নিচে খানিক দাঁড়ালাম। এরপর ট্রলারে চড়ে বিদ্যাকুটের পথে রওনা হলাম।

বাংলার নদীপথে ভ্রমণের মধ্যে এক ধরনের ধীরলয়ের কবিতা আছে। শহরের মানুষ যেখানে মিনিটে মিনিটে মোবাইল চেক করে, সেখানে নদী আপনাকে বাধ্য করবে চুপ করে বসে থাকতে। তিতাসের জল তখন ধূসর-সবুজ রঙে ঝিলমিল করছিল। দূরে জেলেদের নৌকা, কোথাও হাঁসের দল, কোথাও বৃষ্টিভেজা ঘাসের গন্ধ। মনে হচ্ছিল, পৃথিবীটা আসলে খুব ধীরে চলার জন্যই তৈরি হয়েছিল, আমরা মানুষরাই শুধু তাড়াহুড়ো করে সেটাকে নষ্ট করেছি।


প্রায় এক ঘণ্টার নদী ভ্রমণ শেষে পৌঁছালাম বিদ্যাকুট ঘাটে। সেখান থেকে রিকশায় আরও মিনিট পনেরো। রিকশাওয়ালাকে যখন বললাম সতীদাহ মন্দিরে যাবো, সে এমনভাবে তাকালো যেন আমি ভূত ধরার ঠিকাদার।

গ্রামের দক্ষিণ প্রান্তে পৌঁছে মন্দিরটি দেখেই বুকের ভেতর একটা চাপা অনুভূতি তৈরি হলো। জায়গাটা অস্বাভাবিক রকম নিরিবিলি। চারপাশে গাছ, ঝোপঝাড়, পুরোনো বাতাস। দিনের আলোতেও সেখানে দাঁড়িয়ে মনে হয়- সন্ধ্যা খুব দূরে নেই।

দুই-তিনশ বছরের পুরোনো এই মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন বিদ্যাকুটের দেওয়ান বাড়ির দেওয়ান রাম মানিক। একসময় এই অঞ্চলকে বলা হতো ‘ত্রিপুরার নবদ্বীপ’। জ্ঞানচর্চা, সংস্কৃতি আর আভিজাত্যে সমৃদ্ধ ছিল বিদ্যাকুট। কিন্তু ইতিহাস বড় নিষ্ঠুর জিনিস- একই গ্রামের বুকে যেমন বিদ্যার আলো থাকে, তেমনি কখনও কখনও জ্বলতে থাকে মানুষের অমানবিকতার আগুনও।

এই মন্দিরের দেয়ালে হাত রাখতেই মনে হচ্ছিল, ইতিহাসের শরীর এখনও ঠান্ডা হয়নি। ভাবুন তো, একসময় এখানে ঢাক-ঢোল, করতাল, বাদ্যের তীব্র শব্দে সরগরম থাকত, কোনও উৎসবের আনন্দে নয়- একজন জীবন্ত নারীর আর্তনাদ চাপা দেওয়ার জন্য।

১৮২৯ সালে লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ করেছিলেন। কিন্তু আইন তো কাগজে লেখা থাকে, মানুষের কুসংস্কার অনেক সময় তার থেকেও দীর্ঘজীবী হয়। এই অঞ্চলেও সেই প্রথার রেশ টিকে ছিল আরও কিছু বছর।

লোকমুখে শোনা যায়, ১৮৩৫ সালে এই মন্দিরেই শেষবার সতীদাহ হয়েছিল। রাম মানিকের মাকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয় স্বামীর চিতায়। তার স্মরণে বসানো হয়েছিল শ্বেত পাথরের একটি নামফলক। কিন্তু ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের অস্থির সময়ে সেই ফলক ধ্বংস হয়ে যায়। কী অদ্ভুত! একজন নারী জীবনে নিজের পরিচয় হারালেন সমাজের কাছে, মৃত্যুর পর হারালেন ইতিহাসের কাছেও।

আমরা ইতিহাসে রাজাদের নাম মনে রাখি, যুদ্ধের সাল মনে রাখি, কিন্তু কত নারীর কান্না যে সময়ের অতল গহ্বরে হারিয়ে গেছে, তার হিসাব কেউ রাখে না।

মন্দিরটির বর্তমান অবস্থা দেখে খানিকটা মন খারাপ হলো। সংস্কারের নামে চকচকে চুনকাম করা হয়েছে।

স্থানীয় ইতিহাসবিদরা বলছেন, ‘এতে মন্দিরের আদিরূপ নষ্ট হয়েছে।’ কথাটা মিথ্যে নয়, পুরাকীর্তির শরীরে বয়সের দাগও তো ইতিহাসেরই অংশ।

তবু জায়গাটির মধ্যে এক অদ্ভুত আকর্ষণ আছে। সেখানে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, তিতাসের বাতাস এখনও সব ভুলে যায়নি। গাছগুলো হয়ত এখনও জানে সেই ঢোলের শব্দ। সন্ধ্যার নীরবতায় হয়ত আজও কোথাও ভেসে আসে চাপা কান্না।

ফেরার পথে নদীতে সূর্য ডুবছিল। আকাশের রঙ বদলাচ্ছিল ধীরে ধীরে। আমি ট্রলারের মাথায় বসে ভাবছিলাম, ভ্রমণ আসলে শুধু সুন্দর জায়গা দেখা নয়। কখনও কখনও ভ্রমণ মানে ইতিহাসের সামনে দাঁড়ানো- তার গৌরবের সামনে যেমন, তেমনি নিষ্ঠুরতার সামনেও।

বিদ্যাকুটের সেই সতীদাহ মন্দির তাই আমার কাছে নিছক কোনও পুরোনো স্থাপনা নয়। এটা এক নীরব প্রশ্ন- সভ্যতা কী সত্যিই এতটা সভ্য হয়েছে?

/মহু


  বিষয়:   বিদ্যাকুট  সতীদাহ মন্দির  ব্রাহ্মণবাড়িয়া 


Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: