ইরানের বন্দর আনজালিতে নৌ কমান্ড সেন্টারে ইসরাইলি যুদ্ধবিমানের আঘাত নেমে এলে আকাশ ভরে ওঠে তীব্র কমলা আলো আর পাক খাওয়া কালো ধোঁয়ায়। ইসরাইলের দাবি, ওই অভিযানে ইরানের নৌবাহিনীর একাধিক জাহাজ ধ্বংস করা হয়েছে। তাদের ভাষায়, ইরানের বিপক্ষে চালানো অভিযানগুলোর মধ্যে এটাই ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ’।
কিন্তু মার্চ মাসের এই হামলাটি কৌশলগত পারস্য উপসাগরে হয়নি। সেখান থেকে শত শত মাইল উত্তরে বিশাল এক জলাশয় ‘কাস্পিয়ান সাগর’ ছিল এর লক্ষ্য। এতদিন উপেক্ষিত থাকা এই সাগর এখন ইরান ও রাশিয়ার সংযোগকারী বাণিজ্যপথ হিসেবে একেবারে নতুন মাত্রা পেয়েছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত আর যুদ্ধক্লান্ত দুই মিত্র এই জলপথকেই এখন প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সব ধরনের পণ্য আনা-নেওয়ার নিরাপদ রাস্তা করে তুলেছে। মার্কিন সামরিক শক্তির আধিপত্যের মধ্যেও ইরান আমেরিকার শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়াতে পারছে এই চালানগুলোর জোরেই।
নাম না প্রকাশের শর্তে কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরান সাম্প্রতিক যুদ্ধে তাদের ড্রোন মজুদের প্রায় ৬০ শতাংশ হারিয়ে ফেলেছে। এখন রাশিয়া কাস্পিয়ান সাগর পেরিয়ে ইরানে ড্রোনের নানা সরঞ্জাম পাঠাচ্ছে, যাতে তেহরান হারানো শক্তি ফিরে পায়। শুধু অস্ত্র নয়, হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন নৌবাহিনীর বাধার কারণে যেসব পণ্য আটকে যাচ্ছে, রাশিয়া বৈশ্বিক বাণিজ্যের অংশ হিসেবে সেগুলোও কাস্পিয়ানের ওপর দিয়ে পাঠাচ্ছে।
ইরানের কর্মকর্তারা জানান, বিকল্প পথ চালু করতে তারা দ্রুত এগোচ্ছেন। কাস্পিয়ান তীরের চারটি বন্দর এখন ২৪ ঘণ্টা খোলা। সেখানে আসছে গম, ভুট্টা, পশুখাদ্য, সূর্যমুখী তেল আর নিত্যপ্রয়োজনীয় বিপুলসামগ্রী। চলতি মে মাসেই তেহরানের একটি বিলবোর্ডে বন্ধ হয়ে যাওয়া হরমুজ প্রণালির প্রতীকী ছবিও দেখা গেছে।
ইরানের ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান মোহাম্মদ রেজা মোর্তাজাভী রাষ্ট্রীয় চ্যানেল আইআরআইবিতে বলেন, খাদ্যের চালান এখন কাস্পিয়ান ঘুরিয়েই পাঠানো হচ্ছে। রুশ বাণিজ্য পরিসংখ্যান আর বন্দর ডাটাও বলছে, কাস্পিয়ানে পরিবহন দ্রুত বাড়ছে।
পোর্টনিউজ মিডিয়া গ্রুপের বিশ্লেষক ভিতালি চেরনভ জানান, রাশিয়া আগে বছরে ২০ লাখ টন গম কৃষ্ণ সাগর দিয়ে ইরানে পাঠাত। ইউক্রেন হামলার হুমকিতে এখন তা কাস্পিয়ানে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় এই পথের সম্ভাবনা এখন অনেক বেশি।
রাসইরান এক্সপোর প্রধান আলেকজান্ডার শারভ মনে করেন, এ বছর কাস্পিয়ানের কার্গো দ্বিগুণ হতে পারে। হরমুজ সংকটে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার ভয়ে যে কোম্পানিগুলো এ পথে আসতে চাইত না, তারাও ভয় ভেঙে বেরিয়ে আসবে বলে তিনি ধারণা করছেন।
লুকানোর সবচেয়ে ভালো জায়গা : কাস্পিয়ান সাগর জাপানের চেয়েও বড়, বিশ্বের বৃহত্তম হ্রদ। এখানকার বেশিরভাগ বাণিজ্যই হয় গোপনে। রুশ ও ইরানি জাহাজের চালকরা স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং এড়াতে সংকেত বন্ধ করে দেন, যাতে দূর থেকে নজরদারি প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্র জাহাজ আটকে দিতে পারলেও এখানে তা পারে না, কারণ এই সাগরে প্রবেশাধিকার আছে কেবল তীরবর্তী পাঁচটি দেশের।
সায়েন্সেস পো-র ইরান-রাশিয়া বিশেষজ্ঞ নিকোল গ্রাজেস্কি বলেন, ‘আপনি যদি নিষেধাজ্ঞা ফাঁকি দিয়ে অস্ত্র আনা-নেওয়া করতে একটা আদর্শ জায়গা খুঁজতে যান তবে সবার আগে কাস্পিয়ান সাগরের নাম আসবে।’ গম বা অন্য পণ্যের বাণিজ্য প্রকাশ্যে চললেও অস্ত্র আদান-প্রদান এখনও গোপনই রয়ে গেছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন, রুশ যন্ত্রাংশ হয়তো রাতারাতি যুদ্ধের মোড় ঘোরাবে না, তবে ইরানের ড্রোন শক্তি ধীরে ধীরে বাড়াবে। যদিও এই লেনদেন নতুন নয়। ইরান ইউক্রেনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে রাশিয়াকে শাহেদ ড্রোন পাঠিয়ে আসছিল। তবে ২০২৩ সালের জুলাই থেকে রাশিয়া তাতারস্তানের একটি কারখানায় নিজস্ব ড্রোন উৎপাদন শুরু করায় তেহরানের ওপর নির্ভরতা অনেক কমে গেছে।
সম্প্রতি ইউক্রেনের বাহিনী একটি রুশ জাহাজ ধ্বংস করে দাবি করে, সেটিতে ইরানের শাহেদ ড্রোনের সরঞ্জাম যুদ্ধক্ষেত্রে নেওয়া হচ্ছিল। যুক্তরাষ্ট্র ওই জাহাজ ও এর মালিকের ওপর আগেই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল।
দুই দশকের স্বপ্ন : গত দুই দশক ধরে রাশিয়া ও ইরান বাল্টিক সাগর থেকে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত ৭ হাজার ২০০ কিলোমিটার বাণিজ্য করিডোর তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে, যার লক্ষ্য পশ্চিমা নজরদারি এড়ানো। অধিকাংশ পরিকল্পনাই এখনও কাগজে, তবু এতে নতুন জাহাজ, বন্দর আর রেলপথের স্বপ্ন দেখানো হয়েছে।
বিশ্লেষকরা সন্দেহ প্রকাশ করেন, গভীর সামরিক সংঘাতে জড়ানো দুই পক্ষেরই এই বিশাল প্রকল্প সত্যি করার আর্থিক শক্তি আদৌ আছে কি না। কাস্পিয়ানের অনেক জায়গা অগভীর হওয়ায় বড় জাহাজ চলাচলও কঠিন। তবু রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জন্য কাস্পিয়ানের বাণিজ্য বড় কৌশলের খেলা। মধ্যপ্রাচ্যে মিত্রসংখ্যা সীমিত হয়ে আসায় তিনি ইরানকে সমর্থন দিলেও আরব দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের কথা ভেবে খোলামেলা সামরিক সাহায্যে ইতস্তত করছেন।
মার্কিন পরিকল্পনায় ‘ভূরাজনৈতিক ব্ল্যাকহোল’ : কাস্পিয়ানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নজরদারির বিশাল ফাঁকফোকর রয়েছে। হাডসন ইনস্টিটিউটের গবেষক লুক কফির কথায়, মার্কিন নীতিনির্ধারকদের চোখে এই সাগরের প্রায় কোনো অস্তিত্বই নেই, এটি তাদের কাছে ‘ভূরাজনৈতিক ব্ল্যাকহোল’-এর মতো।
মার্কিন বাহিনী বিভিন্ন দেশের দায়িত্ব আলাদা কমান্ডে ভাগ করে রেখেছে। ইউরোপীয় কমান্ড আজারবাইজান ও রাশিয়া দেখে, আবার সেন্ট্রাল কমান্ড দেখে ইরান, তুর্কমেনিস্তান ও কাজাখস্তান। ফলে সব তথ্য এক জায়গায় করে তোলা কঠিন।
২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রায় হামলা শুরু করলে আমেরিকার চোখে কাস্পিয়ানের আসল গুরুত্ব ধরা পড়ে। রাশিয়া কাস্পিয়ান থেকেই ইউক্রেনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছিল। তখন থেকে এই সাগরে ট্র্যাকিং বন্ধ করে ‘অন্ধকারে’ চলাচলরত জাহাজের সংখ্যা বেড়েছে লক্ষণীয়।
প্রথমে ইরান রাশিয়াকে গোলা, পরে শাহেদ ড্রোন দিয়ে সাহায্য করেছিল। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে রাশিয়া-ইরান একটি বড় সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। যুদ্ধের শুরু থেকে রাশিয়া ঠিক কতটা যুদ্ধ সরঞ্জাম ইরানে পাঠাচ্ছে, তা পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তবে কাস্পিয়ানের এই বাণিজ্য কখনোই হরমুজ প্রণালির বিশাল তেল রফতানির ধারেকাছে যেতে পারবে না।
ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ আনা বরশেভস্কায়া বলছেন, ‘ইরান ও রাশিয়া নিষেধাজ্ঞা ফাঁকির একটা বুদ্ধি খুঁজে বের করেছে। এই বাণিজ্যপথ ছোট হলেও যথেষ্ট শক্তিশালী। ইসরাইলিরা তা ভালোভাবেই বুঝেছিল, তাই তারা ঠিক ওই বন্দরটিতে বোমা ফেলেছে, যাতে রাশিয়া ইরানের জন্য সাহায্য পাঠাতে না পারে।’