প্রধানমন্ত্রীর বৃক্ষরোপণ এবং নারিকেল গাছ

রূপম চক্রবর্তী

মতামত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ২৪তম দিন সকালে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘ঢাকা শহরকে সবুজে

2026-05-10T06:34:31+00:00
2026-05-10T06:34:31+00:00
 
  সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬,
৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬
মতামত
প্রধানমন্ত্রীর বৃক্ষরোপণ এবং নারিকেল গাছ
রূপম চক্রবর্তী
প্রকাশ: রোববার, ১০ মে, ২০২৬, ৬:৩৪ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ২৪তম দিন সকালে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘ঢাকা শহরকে সবুজে আচ্ছাদিত করা, পরিবেশদূষণ কমানো এবং নগরীর সৌন্দর্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে বন অধিদফতর থেকে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং বাংলাদেশ সড়ক ও জনপথ বিভাগের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মাধ্যমে যৌথভাবে রাস্তার মিডিয়ান, ইউলুপ, পন্ডিং এরিয়া এবং খালের পাড়গুলোতে বৃক্ষরোপণ এবং জিরো সয়েল কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এ কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন প্রজাতির ৪১ হাজার ৫৬৫টি ফলদ, বনজ, ওষুধি ও শোভাবর্ধনকারী বৃক্ষের চারা রোপণ করা হয়েছে। 

এছাড়া ঢাকা শহরের দূষণ কমানোর জন্য বিভিন্ন প্রজাতির লতা, গুল্ম ও ঘাস দ্বারা মাটি আবৃত করা হয়েছে। আগামী ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে ঢাকাকে ক্লিন এবং গ্রিন সিটিরূপে গড়ে তুলতে বনায়নযোগ্য খালি জায়গায় বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। গাছের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর ভালোবাসা সত্যি অসাধারণ। গত ২ মে সিলেটের বাসিয়া খাল পুনর্খননের সুফল ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, এই প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পর খালের দুই তীরে অন্তত ৫০ হাজার গাছ লাগানো হবে। 

বন অধিদফতর তাদের চলমান প্রকল্পের আওতায় এ বছরের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে ১ কোটি ৫০ লাখ গাছের চারা রোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে এক লাখ নিমগাছ রয়েছে। আগামী ৫ বছরে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি- এ তিন ধাপে ভাগ করে এ বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। 

এই বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিকে স্বাগত জানিয়ে নারিকেল গাছের চারাও অধিক হারে রোপণ করার ওপর গুরুত্ব প্রদান করছি। তীব্র গরম যখন পড়ে তখন ডাবের পানি পিপাসা মেটানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে কাজ করে। দশ-বারো বছর আগেও ৩০ থেকে ৪০ টাকা দামের ডাব পাওয়া যেত। হঠাৎ করে ডাবের দাম আকাশচুম্বী হওয়ার পথে। ১০০ থেকে ১২০ টাকা করে ছোট আকারের ডাব ক্রয় করতে হয়। 

ডাবের পানিতে রয়েছে উচ্চ পরিমাণে ফাইবার, যা পরিপাকের জন্য ভালো। নিয়মিত ডাবের পানি পানে গ্যাস্ট্রিক এসিড থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়। ডাবের পানি আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে। মূত্রনালি-সংক্রান্ত ইনফেকশন দূর করতে সাহায্য করে। এ ছাড়া নিয়মিত এই পানি পান করলে দাঁতের মাড়ির সমস্যা দূর হয়। ডাব রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করলেও ডাবের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে ডাবের পানির স্বাদ নিতে আমরা অনেক অসমর্থ। 

ডাব পেকে গেলে তা পরিপক্ব নারিকেলে রূপান্তরিত হয়। এ সময় ডাবের ভেতরের পাতলা ও নরম শাঁস শক্ত, পুরু ও সাদা রঙের নারিকেলে পরিণত হয় এবং ভেতরের মিষ্টি পানি কমে গিয়ে তা শুকিয়ে যায় বা আঠালো হয়ে যায়। ডাবের তুলনায় নারিকেল ক্যালোরি এবং ফ্যাটে অনেক বেশি সমৃদ্ধ হয়। বিশ্বের অনেক দেশেই নারিকেল উৎপাদিত হয়। তার মধ্যে ফিজি, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ভারত, ব্রাজিল, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন অন্যতম। তবে সবচেয়ে বেশি নারিকেল উৎপাদিত হয় ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনে। হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বের ৭০ শতাংশ নারিকেল উৎপাদিত হয় এই তিন দেশে।

বর্তমানে ইন্দোনেশিয়ায় সবচেয়ে বেশি নারিকেল উৎপাদন হয়ে থাকে। ভারত রয়েছে তৃতীয় স্থানে। বাংলাদেশে অল্প পরিমাণে হলেও দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে নারিকেল উৎপাদিত হয়ে থাকে। 

নারিকেল গাছকে কল্পবৃক্ষ বলা হয়, কারণ প্রতিটি অংশ থেকে এর অনেক ব্যবহার রয়েছে। নারিকেলের সন্দেশ, কুলিপিঠা, ভাপা পিঠা, নাড়ু, পোলাও, কোরমা, খিচুড়ি, সেমাই নারিকেল, নারিকেল-মুড়ি, নারিকেল-চিংড়ি, নারিকেল-পটোল, নারিকেল-কচু, নারিকেল-মুরগি, নারিকেলের দুধ দিয়ে আমড়া, নারিকেলের মালাই- আরও কত রকমের খাবার নারিকেল থেকে তৈরি করা হয়। কচি নারিকেলের সাদা অংশ (শাঁস) অত্যন্ত সুস্বাদু ও পুষ্টিকর খাবার। নারিকেলের শাঁস দিয়ে বিভিন্ন ধরনের পিঠা, মিষ্টি, বিস্কুট, চকলেট তৈরি ও বিভিন্ন রান্নায় ব্যবহার করা হয়। তা হলে বোঝাই যাচ্ছে নারিকেল খাদ্য, তেল এবং বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। নারিকেলের তেল, ছোবড়া থেকে তৈরি ম্যাট্রেস, দড়ি, ঝাড়ু এবং এর শাঁস থেকে বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরি এই শিল্পের মূল অংশ।

যেসব দেশে সমুদ্র উপকূল বিদ্যমান সেসব দেশে নারিকেল ভালো হয়। বাংলাদেশের প্রতিটি জেলাতে কম-বেশি নারিকেল হয়, তবে উপকূলাঞ্চলে বেশি ভালো হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৩৫ হাজার হেক্টর জমিতে নারিকেল চাষ হয়, যার উৎপাদন প্রায় ১ লাখ টন। বাংলাদেশে কৃষক মাটি ও জলবায়ু সমস্যা, জেনেটিক্যালি সমস্যা, ঝড়, শিলাবৃষ্টি, খরা এবং পোকামাকড়ের কারণে ভালো ফলন পান না। সঠিক পরিচর্যা ও রোগ-পোকামাকড় দমন করে প্রথম ক্ষতি আংশিক এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয় ক্ষতি প্রায় সম্পূর্ণরূপে সমাধান করা সম্ভব। 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে নারিকেল উৎপাদন হয় ৫ লাখ ৬ হাজার টন। তার আগের বছর অর্থাৎ ২০২১-২২ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছিল ৫০ লাখ ১০ হাজার টন। বস্তুত ২০১৬-১৭ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে নারিকেলের উৎপাদন কমতে থাকে। এপিসিসির এক জরিপ প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশে ৪০ কোটি নারিকেল গাছ লাগানো সম্ভব। কিন্তু উন্নত জাতের নারিকেল চারার সন্ধান মেলেনি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে নারিকেল উৎপাদন হয় ৫ লাখ ৬ হাজার টন। 

আমাদের বিশাল এক উপকূলীয় অঞ্চল থাকা সত্ত্বেও আমরা নারিকেল শিল্পে এগোতে পারছি না কেন- প্রশ্ন হচ্ছে আমরা নারিকেল নিয়ে কী ভাবছি? ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, শ্রীলঙ্কা, ভারত, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড; সেসব দেশে নারিকেলের জাত উন্নয়নের পাশাপাশি নারিকেলের উৎপাদন বাড়ছে। বাড়ছে নারিকেল দিয়ে উৎপাদিত বিভিন্ন খাদ্য উপকরণও। নারিকেল শিল্পের প্রভাবে সমৃদ্ধ হচ্ছে তাদের অর্থনীতি। নারিকেল গাছের প্রাচুর্যের কারণে সেন্টমার্টিন দ্বীপের আরেক নাম ‘নারিকেল জিঞ্জিরা’। সাম্প্রতিক নারিকেল জিঞ্জিরায় নারিকেলের উচ্চ দাম নিয়ে বেশ আলোচনা-সমালোচনা চলছে। 

সেন্টমার্টিনে এখন যে ডাব পাওয়া যাচ্ছে সেসব সেন্টমার্টিনের নয়। কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকা থেকে সেখানে ডাব যাচ্ছে। এসব ডাবের আকার ছোট, পানির পরিমাণও কম। যেহেতু ওখানে ডাবের চাহিদা আছে, তাই বিক্রেতারা বাইরে থেকে ডাব এনে বেশি দামে বিক্রি করছেন। সেন্টমার্টিনের ডাব মানেই পানি বেশি, মিষ্টতা বেশি। এক ডাবে কম করে হলেও তিন গ্লাস পানি হয়। অনেকেই বলেন, সেন্টমার্টিনে গিয়ে সেখানকার ডাব না খেয়ে ফেরার কোনো অর্থ নেই। ধীরে ধীরে কমে আসছে সেখানকার নারিকেল গাছের সংখ্যা।

লক্ষ্মীপুর জেলায় নারিকেলের ছোবড়া থেকে আঁশ ও গুঁড়া তৈরি হচ্ছে। নারিকেলের আঁশ (ফাইবার) থেকে জাজিম, গদি, দড়ি, সিøপার (জুতা), খেলনা ও শৌখিনসামগ্রী তৈরি হয়। ফাইবার তৈরির সময় প্রচুর গুঁড়াও উপজাত হিসেবে উৎপাদিত হয়। এসব গুঁড়া বা কোকোডাস্ট কৃষিকাজে ব্যবহৃত হয়। যেসব বাগানে মাটির অভাব রয়েছে, সেখানে এসব গুঁড়া ব্যবহৃত হয়। ছোবড়া প্রসেসিং কারখানা গড়ে উঠেছে জেলার রায়পুর উপজেলার হায়দরগঞ্জ, সদর উপজেলার দালাল বাজার, মান্দারী, চন্দ্রগঞ্জ, রামগঞ্জ উপজেলার পানপাড়া, মীরগঞ্জ, সোনাপুর, কমলনগর উপজেলা হাজিরহাট, রামগতির আলেকজান্ডার ও জমিদারহাটে। 

এসব এলাকায় ছোট-বড় ৩০টি কারখানা রয়েছে। প্রতিটি কারখানায় নারী ও পুরুষ মিলে কমপক্ষে ১০-১২ জন শ্রমিক কাজ করেন। জেলায় ২ হাজার ৭৩৫ হেক্টর জমিতে নারিকেল বাগান রয়েছে। এ ছাড়া প্রতিটি বাড়ির আঙিনাতেই রয়েছে নারিকেল গাছ। ২৩-২৪ অর্থবছরে ২৬ হাজার মেট্রিকটন নারিকেল উৎপাদিত হয় লক্ষ্মীপুরে। বছরে শুকনা নারিকেল ও ডাব মিলিয়ে এই জেলায় কয়েকশ কোটি টাকা আয় হয় বলে জানা গেছে।

নারিকেলের ছোবড়া দিয়ে জাজিম, পাপোশ, রশি, সোফা ও চেয়ারের গদিসহ বিভিন্ন ধরনের শৌখিন ও প্রয়োজনীয় পণ্য তৈরি করা হয়। বেডিং শিল্পেও ছোবড়ার ব্যবহার আছে। নারিকেলের মালা বা কোকোনাট শেল একটি বাই প্রোডাক্টস। নারিকেলের মালা ব্যবহার করে মশার কয়েলসহ অনেক রকম পণ্য তৈরি হয়। চাহিদার সঙ্গে সঙ্গে ডাবের দাম নারিকেলের চেয়ে দ্বিগুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় চাষিরা এখন গাছ শূন্য করে ডাব বিক্রি করে ফেলছে। 

ডাব বিক্রির কারণে উৎপাদন কমে যাওয়ায় নারিকেল তেল শিল্প, নারিকেলজাত পণ্য, ছোবড়া শিল্প, মশার কয়েল ফ্যাক্টরি, কোকোডাস্ট এবং মালা শিল্প পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এ অবস্থা চলতে থাকলে নারিকেল নির্ভরশীল মানুষগুলো বেকার হয়ে যেতে পারেন। 

আমাদের ডাব ও নারিকেল দুটোই প্রয়োজন। তবে ব্যাপক হারে ডাব বিক্রির ফলে নারিকেলের যেন ঘাটতি না পড়ে সেদিকে সবাইকে খেয়াল রাখতে হবে। বেশি বেশি নারিকেল গাছ লাগানোর মাধ্যমে ডাব এবং নারিকেলের চাহিদা পূরণ করতে পারি।

প্রাবন্ধিক

সময়ের আলো/আআ


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: