পারমাণবিক চুক্তি ও মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে ওয়াশিংটনের দেওয়া সাম্প্রতিক প্রস্তাব যখন তেহরানের টেবিলে আলোচনার অপেক্ষায়, ঠিক তখনই হরমুজ প্রণালীর ওপর নিজেদের কঠোর নিয়ন্ত্রণের বার্তা দিল ইরান। দেশটির কর্তৃপক্ষ ও রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলো স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কৌশলগত এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ তাদের কাছে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
গত শনিবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সাংবাদিকদের জানান, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আসা ওয়াশিংটনের প্রস্তাবটি বর্তমানে পর্যালোচনা করছে তেহরান। তবে আলোচনার মধ্যেই দেশটির প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা আরিফ সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের কর্তৃত্বই হবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মোক্ষম জবাব। বিশেষ করে ইরানের তেল রপ্তানি বন্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের নেওয়া পদক্ষেপগুলো নস্যাৎ করতে এই জলপথকে কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবে তারা।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে হরমুজ প্রণালীকে ইসলামের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ওহুদ যুদ্ধের সেই কৌশলগত গিরিপথের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। টেলিভিশনের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ১৪০০ বছর আগে ওহুদ যুদ্ধে মুসলিম তীরন্দাজরা নির্দেশ অমান্য করে পাহাড়ের গিরিপথ ত্যাগ করায় যেমন পরাজয় নেমে এসেছিল, হরমুজ প্রণালীও ইরানের জন্য ঠিক তেমনি একটি ওহুদ গিরিপথ। কোনো অবস্থাতেই এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া করা যাবে না বলে কঠোর বার্তা দেওয়া হচ্ছে।
সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রয়াত আকবর হাশেমি রাফসানজানির কয়েক দশক আগের একটি ভিডিও ক্লিপ প্রচার করে তেহরান বর্তমান নীতি স্পষ্ট করেছে। রাফসানজানি সেই বক্তৃতায় বলেছিলেন, পারস্য উপসাগর যদি ইরানের ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে, তবে তারা এটি সবার জন্যই ব্যবহারের অনুপযোগী করে তুলবে। অর্থাৎ ইরান যদি তার তেল রপ্তানি করতে না পারে, তবে হরমুজ প্রণালী দিয়ে অন্য কাউকেও বাণিজ্য করতে দেওয়া হবে না- এই নীতিতেই এখনো অনড় দেশটির বর্তমান নেতৃত্ব।
এদিকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে চলমান মধ্যস্থতা নিয়ে ইরানের ভেতরে কট্টরপন্থীদের মধ্যে চাপা উত্তেজনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বা ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার নিয়ে কোনো ধরনের ছাড় দিতে রাজি নয় দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা কমিশন। কট্টরপন্থী আইনপ্রণেতারা পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিকেও কঠোর সমালোচনায় বিদ্ধ করছেন। তাদের দাবি, ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির (জেসিপিওএ) মতো কোনো আত্মঘাতী চুক্তিতে ইরান আর জড়াবে না। মার্কিন অবরোধ ও নব্য ব্লকেড মোকাবিলায় পশ্চিমা বিশ্বের বদলে চীনমুখী হওয়ার ওপরও জোর দিচ্ছে দেশটির একটি প্রভাবশালী অংশ।
উল্লেখ্য, গত কয়েক দিনে হরমুজ প্রণালীতে চলাচলকে কেন্দ্র করে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এবং মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোর মধ্যে কয়েক দফা গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে, যা ওই অঞ্চলে যুদ্ধের উত্তেজনাকে আরও উসকে দিয়েছে।
/কহু