ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যেখানে মানবজীবনের প্রতিটি সম্পর্ককে সুনির্দিষ্ট মর্যাদা ও দায়িত্বের আলোকে নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই সম্পর্কগুলোর মধ্যে পিতা-মাতার স্থান সর্বোচ্চ, আর তাদের মধ্যে মায়ের মর্যাদা বিশেষভাবে উচ্চ। ইসলামের দৃষ্টিতে আল্লাহ তায়ালার ইবাদতের পরপরই যে অধিকারের কথা এসেছে, তা হলো পিতা-মাতার অধিকার বিশেষত মায়ের।
কুরআন, হাদিস এবং ইসলামের ইতিহাসের নানা ঘটনা এই সত্যকে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেন, ‘তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন, তিনি ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো’ (সুরা বনি ইসরাইল : ২৩-২৪)। এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা নিজের ইবাদতের সঙ্গে সঙ্গেই পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছেন, যা তাদের মর্যাদার উচ্চতাকে নির্দেশ করে। বিশেষভাবে বলা হয়েছে, তাদের প্রতি বিরক্তিসূচক ‘উফ’ শব্দটিও উচ্চারণ করা যাবে না- এটি ইসলামের শিষ্টাচারের সূক্ষ্মতা ও গভীরতার প্রমাণ। অন্যত্র আল্লাহ বলেন, ‘আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি; তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট করে গর্ভে ধারণ করেছেন’ (সুরা লুকমান : ১৪)। আবার সুরা আহকাফেও একই বিষয় পুনরুচ্চারিত হয়েছে। এসব আয়াতে বিশেষভাবে মায়ের কষ্টের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন গর্ভধারণ, প্রসব এবং লালন-পালনের কঠিন সময়গুলো; যা মায়ের মর্যাদাকে আরও উঁচুতে নিয়ে যায়।
হাদিস শরিফে মায়ের মর্যাদা আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আমার উত্তম আচরণের সর্বাধিক হকদার কে?’ তিনি উত্তরে তিনবার বললেন, ‘তোমার মা’; তারপর বললেন, ‘তোমার পিতা’ (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)। এই হাদিসে মায়ের অধিকারকে তিনগুণ গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি সুস্পষ্ট। অন্য এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জান্নাত মায়ের পদতলে’ (মুসলিম)। এই সংক্ষিপ্ত বাক্যটি ইসলামে মায়ের মর্যাদার এক অনন্য দলিল। এর অর্থ হলো, মায়ের সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমেই জান্নাত লাভ সম্ভব। তাই মায়ের খেদমত শুধু একটি নৈতিক দায়িত্ব নয়, বরং তা পরকালীন মুক্তির অন্যতম মাধ্যম।
ইসলামের ইতিহাসেও মায়ের প্রতি আনুগত্য ও ভালোবাসার অসাধারণ দৃষ্টান্ত রয়েছে। হজরত ওয়াইস আল করনি (রা.)-এর ঘটনা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে জীবিত থাকলেও মায়ের সেবার কারণে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারেননি। তবু নবীজি (সা.) তাঁর এই আত্মত্যাগকে অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে মূল্যায়ন করেছেন এবং সাহাবিদের তাঁকে সম্মান করতে নির্দেশ দিয়েছেন। এটি প্রমাণ করে, ইসলামে মায়ের সেবার গুরুত্ব কতটা গভীর। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো- জুমার খুতবার সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) তিনবার ‘আমিন’ বলেছিলেন। পরে তিনি ব্যাখ্যা করেন, জিবরাইল (আ.) দোয়া করেছিলেন- যে ব্যক্তি তার পিতা-মাতাকে বার্ধক্যে পেয়েও তাদের সেবা করে জান্নাত অর্জন করতে পারল না, সে ধ্বংস হোক এবং নবীজি (সা.) তাতে সম্মতি জানান (মুসনাদ আহমদ)। এই হাদিস আমাদের সতর্ক করে দেয় যে, পিতা-মাতার সেবা অবহেলা করা মারাত্মক গুনাহ।
কুরআনে নবীদের জীবনেও মায়ের প্রতি সদাচরণের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। হজরত ঈসা (আ.) বলেন, ‘তিনি (আল্লাহ) আমাকে আমার মায়ের প্রতি সদ্ব্যবহারকারী করেছেন এবং আমাকে উদ্ধত ও অবাধ্য করেননি’ (সুরা মারিয়াম : ৩০-৩২)। আবার বনি ইসরাইলের কাছ থেকে অঙ্গীকার নেওয়া হয়েছিল, তারা যেন আল্লাহর ইবাদতের পাশাপাশি পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করে (সুরা বাকারা : ৮৩)। ইসলামে মায়ের শুধু সম্মানই নয়, তার আর্থিক অধিকারও নিশ্চিত করা হয়েছে।
আরও পড়ুন
উত্তরাধিকার আইনে মায়ের জন্য নির্দিষ্ট অংশ নির্ধারণ করা হয়েছে (সুরা নিসা : ১১)। এটি প্রমাণ করে, ইসলাম শুধু আবেগগত মর্যাদা নয়, বাস্তব জীবনের অধিকারও নিশ্চিত করেছে। মায়ের দোয়ার গুরুত্বও ইসলামে অপরিসীম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তিন ব্যক্তির দোয়া অবশ্যই কবুল হয়। তার মধ্যে একটি হলো পিতা-মাতার দোয়া (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১৫৩৮)। ইতিহাসে ইমাম বুখারি (রহ.)-এর জীবনে তার মায়ের দোয়ার প্রভাব একটি উজ্জ্বল উদাহরণ- মায়ের আন্তরিক দোয়ার মাধ্যমে তিনি দৃষ্টিশক্তি ফিরে পান।
এটি আমাদের শেখায়, মায়ের দোয়া সন্তানের জীবনে কী অসাধারণ পরিবর্তন আনতে পারে। বাস্তব জীবনের দিক থেকেও মায়ের অবদান অপরিসীম। তিনি দশ মাস দশ দিন গর্ভে ধারণ করেন, প্রসবের অসহনীয় যন্ত্রণা সহ্য করেন, তারপর বছরের পর বছর সন্তানকে লালন-পালন করেন। সন্তানের সুখের জন্য তিনি নিজের সুখ বিসর্জন দেন। তাই বলা হয়, ‘পৃথিবীর সবকিছু দিয়েও মায়ের এক ফোঁটা দুধের ঋণ শোধ করা সম্ভব নয়।’ মা শুধু একজন অভিভাবক নন; তিনি সন্তানের প্রথম শিক্ষক, প্রথম আশ্রয়, প্রথম ভালোবাসা। তার কোলে রয়েছে নিরাপত্তা, শান্তি ও মমতার সর্বোচ্চ প্রকাশ। একজন সন্তানের জীবনে মা না থাকলে সেই শূন্যতা কখনো পূরণ হয় না। তাই ইসলামে মায়ের মর্যাদা এত উচ্চ যে, তার সন্তুষ্টি অর্জন করাই একজন মুমিনের অন্যতম প্রধান কর্তব্য। ইসলামে মায়ের মর্যাদা শুধু একটি নৈতিক শিক্ষা নয়; এটি একটি ইবাদত, একটি জীবনদর্শন।
কুরআন ও হাদিসের আলোকে আমাদের দায়িত্ব হলো মায়ের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করা, তার সেবা করা, তার দোয়া অর্জন করা এবং তার সন্তুষ্টির মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করা। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে সেই তওফিক দান করুন।
এএডি/