হজের চিরায়ত প্রতীক ও বার্তা

মুহাম্মাদ ইমাম হাসান

ইসলাম

ইতিহাসের কিছু অধ্যায় এমন থাকে, যা সময়ের সীমানা অতিক্রম করে মানবতার হৃদয়ে স্থায়ী আসন গেড়ে বসে। সেসব ঘটনা কেবল স্মৃতির

2026-05-11T05:36:04+00:00
2026-05-11T08:57:16+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
ইসলাম
হজের চিরায়ত প্রতীক ও বার্তা
মুহাম্মাদ ইমাম হাসান
প্রকাশ: সোমবার, ১১ মে, ২০২৬, ৫:৩৬ এএম  আপডেট: ১১.০৫.২০২৬ ৮:৫৭ এএম
হজ মহিমান্বিত এক ইবাদত। ছবি : সংগৃহীত
ইতিহাসের কিছু অধ্যায় এমন থাকে, যা সময়ের সীমানা অতিক্রম করে মানবতার হৃদয়ে স্থায়ী আসন গেড়ে বসে। সেসব ঘটনা কেবল স্মৃতির বিষয় নয় বরং জীবনের পথচলার দিশারি, চিন্তার ভিত্তি এবং ঈমানের শক্তি হয়ে ওঠে। 

হজ তেমনই এক মহিমান্বিত ইবাদত, যার প্রতিটি অনুষঙ্গের সঙ্গে জড়িয়ে আছে গভীর তাৎপর্য, ত্যাগের শিক্ষা এবং আল্লাহর প্রতি নিখুঁত আত্মসমর্পণের বার্তা। 

মহাকাব্যিক এই ইতিহাসের সূচনা হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর জীবন থেকে, যিনি আল্লাহর আদেশের সামনে নিজের সমস্ত আবেগ, সম্পর্ক ও স্বার্থ উৎসর্গ করতে দ্বিধা করেননি। তার জীবনের প্রতিটি অধ্যায় যেন একেকটি পরীক্ষার নাম আর প্রতিটি পরীক্ষায় তিনি উত্তীর্ণ হয়েছেন অনন্য ধৈর্য ও ঈমানের দৃঢ়তায়।

আল্লাহর নির্দেশে তিনি তার প্রিয় স্ত্রী হাজেরা (আ.) এবং ছোট্ট শিশু ইসমাইল (আ.)-কে রেখে আসেন এক নির্জন, পানিহীন মরুপ্রান্তরে। মানবিক দৃষ্টিতে যা ছিল অকল্পনীয় কিন্তু ঈমানের দৃষ্টিতে তা ছিল এক পরম আনুগত্যের নিদর্শন। 

এই দৃশ্য আমাদের শেখায়- যেখানে আল্লাহর হুকুম, সেখানে ব্যক্তিগত অনুভূতির কোনো স্থান নেই। সেই নির্জন মরুভূমিতে এক মায়ের অসহায়ত্ব আর আল্লাহর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস একাকার হয়ে যায়। হাজেরা (আ.) সন্তানের তৃষ্ণা মেটাতে ছুটে বেড়ান সাফা ও মারওয়ার মাঝখানে। 

তাঁর সাতবার দৌড়ানো কেবল একটি কর্ম ছিল না বরং এটি ছিল একজন মায়ের ব্যাকুলতা, একজন মুমিনার তাওয়াক্কুল এবং আশাহত না হওয়ার জ্বলন্ত উদাহরণ। আজ সেই ঘটনাই হজের ‘সাঈ’ হিসেবে আমাদের সামনে প্রতিফলিত হয়, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপ মনে করিয়ে দেয়, আল্লাহর ওপর ভরসা কখনো বিফল হয় না।

অবশেষে আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দার এই অগাধ বিশ্বাস কবুল করেন এবং সৃষ্টি করেন ‘জমজম’, যা অনন্ত রহমতের উৎস। নির্জন বালুকাময় ভূমিতে যে পানির ধারা ফেটে বের হয়েছিল, তা আজও অব্যাহত- এ যেন আল্লাহর প্রতিশ্রুতির এক জীবন্ত প্রমাণ যে, কষ্টের পরই আসে স্বস্তি। 

এরপর ইতিহাসের আরেক উজ্জ্বল অধ্যায়- পিতা ও পুত্রের সম্মিলিত প্রয়াসে নির্মিত হয় পবিত্র কাবা। এটি কোনো সাধারণ স্থাপনা নয় বরং এটি মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ের কেন্দ্র, ঐক্যের প্রতীক এবং তাওহিদের জীবন্ত সাক্ষ্য। এখানে ধনী-গরিব, রাজা-প্রজা সবাই এক কাতারে দাঁড়ায়, এক আল্লাহর সামনে নিজেকে সঁপে দেয়। 

হজের প্রতিটি আনুষ্ঠানিকতা আসলে আমাদের জীবনের একটি বাস্তব রূপ। ‘রামি’ বা শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ আমাদের শেখায়, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মন্দ চিন্তা, কুমন্ত্রণা ও অহংকার দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করতে হবে। এটি এক অবিরাম আত্মসংগ্রামের শিক্ষা, যা প্রতিদিনের জীবনে প্রয়োগযোগ্য।

আরও গভীরে গেলে দেখা যায়, হজ কেবল কিছু নির্দিষ্ট আচার-অনুষ্ঠানের সমষ্টি নয় বরং এটি এক আত্মশুদ্ধির সফর। এখানে মানুষ দুনিয়ার চাকচিক্য, ভেদাভেদ ও অহংকার ছেড়ে ইহরামের সাদা কাপড়ে নিজেকে ঢেকে দেয়- যেন স্মরণ করে, একদিন তাকেও এভাবেই দুনিয়া ছেড়ে চলে যেতে হবে। 

সবকিছু মিলিয়ে হজ আমাদের শেখায় ত্যাগ ছাড়া মহত্ত্ব অর্জিত হয় না এবং ধৈর্য ছাড়া সফলতা আসে না আর আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা ছাড়া জীবনে প্রকৃত প্রশান্তি লাভ করা অসম্ভব। হজ তাই কেবল একটি ইবাদত নয়; এটি এক জীবনব্যবস্থা, এক দর্শন এবং অন্তরের এমন এক বিপ্লব, যা মানুষকে আল্লাহর আরও নিকটবর্তী করে এবং জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য উপলব্ধি করতে সহায়তা করে।

লেখক : শিক্ষক, দারুত তারবিয়াতিল ইসলামিয়া, নিউমার্কেট, যশোর

/এসএকে


  বিষয়:   হজে  ইতিহাস  ইবাদত  হজরত ইবরাহিম (আ.) 


Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: