আমাদের অনেকের স্বভাব, ফোনকলে কোথায় আছি জানতে চাইলে- আমরা সঠিক তথ্য দেই না। এতে অন্যপাশের মানুষ বিভ্রান্ত হয়। আবার ফিশিং বা ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করেও অন্যের ক্ষতির কারণ হই। কিন্তু, এবার বিজ্ঞানীরা এমন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন, আপনি কোথায় আছেন- তা বিজ্ঞান বলে দেবে। অর্থাৎ, মিথ্যে বলা বা মানুষকে বিভ্রান্ত করার দিন শেষ হতে চলেছে।
এই অভাবনীয় কোয়ান্টাম প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের একদল বিজ্ঞানী, যা ভবিষ্যতে কারও বলা অবস্থান সত্য কি না, তা নিশ্চিতভাবে যাচাই করতে সক্ষম হতে পারে। এ গবেষণা কোয়ান্টাম এনট্যাংলমেন্টের ওপর ভিত্তি করে তৈরি ‘কোয়ান্টাম পজিশন ভেরিফিকেশন’ নামে পরিচিত একটি পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছে। ধারণাটি এমন এক প্রযুক্তিগত ভিত্তি তৈরি করছে, যেখানে ভবিষ্যতে ফিশিং বা ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে হওয়া সাইবার প্রতারণা ঠেকানো সম্ভব হতে পারে।
এ গবেষণার ফলাফল ১৮ মার্চ আমেরিকা ফিজিক্যাল সোসাইটির গ্লোবাল ফিজিকস সামিটে (বৈশ্বিক পদার্থবিজ্ঞান সম্মেলন) উপস্থাপন করেন পদার্থবিদ অ্যাবিগেল গুকিন। এই প্রযুক্তি বিভিন্ন সংবেদনশীল জায়গায় মানুষের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে পারে। যেমন- পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র; নির্দিষ্ট নিরাপদ অবস্থান থেকেই এর প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা যাবে।
এ পদ্ধতির মূল শক্তি কোয়ান্টাম এনট্যাংলমেন্ট, যেখানে দুটি দূরবর্তী কণার অবস্থা পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত থাকে। পরীক্ষায় দুটি ‘ভেরিফায়ার’ একটি নির্দিষ্ট স্থানের দুই পাশে অবস্থান নেয় এবং তৃতীয় ব্যক্তি বা ‘প্রুভা’-এর অবস্থান যাচাই করে।
ভেরিফায়াররা প্রুভারকে এলোমেলো সংখ্যা পাঠায়, যা দিয়ে প্রুভার নির্ধারণ করে পরবর্তী ধাপ। একই সময়ে ভেরিফায়ারদের একজন জোড়া কোয়ান্টাম এনট্যাংলড ফোটন তৈরি করে একটি নিজের কাছে রাখে এবং অন্যটি প্রুভারের কাছে পাঠায়। এরপর উভয় পক্ষ একই সময়ে ফোটনের পোলারাইজেশন বা আলোর তরঙ্গের দিক পরিমাপ করে এবং ফলাফল তুলনা করা হয়।
যদি প্রুভার সত্যিই নির্দিষ্ট স্থানে থাকে, তাহলে বহুবার এই পরীক্ষার ফলাফলে শক্তিশালী কোয়ান্টাম সম্পর্ক দেখা যায়। কিন্তু কেউ যদি অন্য কোনও স্থান থেকে প্রতারণার চেষ্টা করে, তবে আলোর গতিসীমা এবং কোয়ান্টাম মাপজোখের নিয়মের কারণে সেই সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ে। এতে প্রতারণা ধরা পড়ে যায়।
এই পরীক্ষা যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডোতে অবস্থিত ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেকনোলজিতে (এনআইএসটি) পরিচালিত হয়। সেখানে প্রায় ২০০ মিটার দূরত্বে দুটি ভেরিফায়ার স্টেশন স্থাপন করা হয় এবং মাঝখানে একটি প্রুভার অবস্থান নেয়।
গবেষকরা দেখিয়েছেন, এ পদ্ধতির মাধ্যমে প্রুভারের অবস্থান সফলভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হয়েছে।
গবেষকরা এটিকে একটি ‘লুপহোল-ফ্রি বেল টেস্ট’-এর বাস্তব প্রয়োগ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যার অদ্ভুত আচরণকে ক্লাসিক্যাল ব্যাখ্যা থেকে আলাদা করে প্রমাণ করে। ফলাফল থেকে বোঝা যায়, কোয়ান্টাম কণার সম্পর্ক এতটাই শক্তিশালী যে, তা প্রচলিত কোনও তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।
গুকিনের মতে, এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতের কোয়ান্টাম ইন্টারনেটের ভিত্তি হতে পারে, যেখানে শুধু তথ্য নয়, তথ্যের উৎসের অবস্থানও নিরাপদভাবে যাচাই করা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘এই প্রথমবারের মতো আমরা কারও অবস্থানকে তার তথ্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করতে পারছি।’
সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট
/মহু