দুর্ভিক্ষ কিংবা পরমাণু যুদ্ধের আতঙ্ক উত্তর কোরিয়াবাসীর জন্য নতুন কিছু নয়। তবে পিয়ংইংয়ের অভিজাত শ্রেণির নাগরিকদের কাছে এখন উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে অন্য এক নাগরিক সমস্যা- গাড়ি পার্কিং। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার বেড়াজাল ডিঙিয়ে উত্তর কোরিয়ার রাজধানীতে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা এতোটাই বেড়েছে, পিয়ংইয়ংয়ের রাস্তায় এখন নিয়মিত ট্রাফিক জ্যাম বা যানজট দেখা দিচ্ছে। রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে পিয়ংইয়ংয়ের এই বদলে যাওয়া চিত্র।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, উত্তর কোরিয়ার মতো একটি অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসর ও কঠোর নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকা দেশে ‘কার কালচার’ বা গাড়ি ব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে ওঠা রীতিমতো বিস্ময়কর। কিন্তু বর্তমানে পিয়ংইয়ংয়ের হোটেলগুলো ছাড়িয়ে পাশের রাস্তায় গিয়ে পড়ছে পার্ক করা গাড়ির সারি। গোল্ড ল্যান বোলিং অ্যালি কিংবা রাক্রাং মার্কেটের মতো জনবহুল এলাকাগুলোতে এখন গাড়ির ভিড় নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। এমনকি কিম জং উন নিজেও গত এপ্রিলে একটি অটো-সার্ভিস সেন্টার পরিদর্শন করেছেন, যেখানে বেশ কিছু বিলাসবহুল গাড়ি রূপালী কাপড়ে ঢেকে রাখা হয়েছিল।
জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার কারণে উত্তর কোরিয়ায় সরাসরি গাড়ি রপ্তানি নিষিদ্ধ থাকলেও চীনের কাস্টমস ডাটা বলছে ভিন্ন কথা। টায়ার, রিয়ার ভিউ মিরর এবং লুব্রিকেন্টের মতো গাড়ি সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশের সরবরাহ দেশটিতে কয়েক গুণ বেড়েছে। গত দুই বছরে উত্তর কোরিয়ার আইন পরিবর্তনের ফলে এখন একটি পরিবার একটি গাড়ি কেনার বৈধ অধিকার পেয়েছে, যা মূলত দেশটির অভিজাত ও উদ্যোক্তা শ্রেণি বা ‘ডনজু’দের হাতে গাড়ির স্টিয়ারিং তুলে দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, কালোবাজারি বন্ধ করে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে ব্যবসা পরিচালনার লক্ষ্যেই কিম জং উন এই ব্যক্তিগত মালিকানার অনুমতি দিয়েছেন।
পিয়ংইয়ংয়ের রাস্তায় আগে সাধারণত নীল বা কালো রঙের নেমপ্লেট দেখা যেত, যা রাষ্ট্রীয় বা সামরিক মালিকানার নির্দেশক। কিন্তু বর্তমানে ব্যক্তিগত গাড়ির পরিচায়ক হিসেবে হলুদ রঙের নেমপ্লেট সর্বত্র দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘ ২০ বছর ধরে উত্তর কোরিয়া ভ্রমণ করা সিঙ্গাপুরের এক আলোকচিত্রী অ্যারাম প্যান জানান, পিয়ংইয়ংয়ের প্রধান সড়কগুলোতে শত শত হলুদ প্লেটের গাড়ি ট্রাফিক জ্যাম তৈরি করছে। পিয়ংইয়ংয়ের নতুন হাসপাতালগুলোতে এখন আন্ডারগ্রাউন্ড পার্কিং গ্যারেজ তৈরি হচ্ছে এবং দেখা মিলছে বৈদ্যুতিক ট্যাক্সির চার্জিং স্টেশনও।
২০১৭ সাল থেকে উত্তর কোরিয়ায় গাড়ি সরবরাহ নিষিদ্ধ থাকলেও যন্ত্রাংশের আমদানি হু হু করে বাড়ছে। ২০২৫ সালে উত্তর কোরিয়ায় টায়ার আমদানি কোভিড-পূর্ব সময়ের তুলনায় ৮৮ শতাংশ বেড়েছে এবং গাড়ির আয়না আমদানির হার প্রায় চার গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলভিত্তিক থিঙ্কট্যাঙ্কগুলোর মতে, আগামী বছরের মধ্যে উত্তর কোরিয়ায় ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা ২০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
/কহু