মিরপুর বহু স্মৃতির সাক্ষী। এই মাঠে বাংলাদেশ দেখেছে উল্লাস, ইতিহাস, আবেগ আর গৌরবের অসংখ্য বিকাল। তবে দেশের মাঠে পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট জয় যেন সবসময়ই ছিল এক অপূর্ণতা। ঘরের মাঠে চারটি সিরিজ, সাতটি টেস্ট কিন্তু জয় ছিল না একটিও।
সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার দেয়াল এবার ভেঙে দিল নতুন বাংলাদেশ। যে বাংলাদেশ শুধু ব্যাটে-বলে নয়, মানসিক শক্তিতেও এখন প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলতে জানে। আর সেই মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়েই শেষ পর্যন্ত হার মানল পাকিস্তান।
চতুর্থ দিনের খেলা শেষে বাংলাদেশের লিড ছিল মাত্র ৩৪ রান। ম্যাচ তখনও দোদুল্যমান। একদিকে বৃষ্টির শঙ্কা, অন্যদিকে মিরপুরের ধীরে ধীরে বদলে যাওয়া উইকেট।
ঠিক তখনই সংবাদ সম্মেলনে এসে বাংলাদেশের ব্যাটিং কোচ মোহাম্মদ আশরাফুল আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বলেছিলেন, আমার কাছে মনে হয় আমরা যদি অন্তত ২৬০ রান করতে পারি, তা হলে ওই রানে জেতা সম্ভব হবে।
কথাটি হয়তো সাধারণ মনে হতে পারত। কিন্তু পাকিস্তান সেটিকে নিয়েছিল ভিন্নভাবে। পাকিস্তানের ব্যাটার সালমান আলি আগা পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন বাংলাদেশের দিকে। তিনি বলেন, অবশ্যই আমরা জয়ের জন্য খেলব। যদি তারা ৭০ ওভারে ২৬০ রানের লক্ষ্য দেয়, তা হলে আমরা অবশ্যই রান তাড়া করব।
তবে আমার মনে হয় না তারা সেটা করবে। সালমানের কথাটা নিছক মন্তব্য নয়, ছিল এক ধরনের মানসিক চাপ তৈরির প্রয়াস। যেন বাংলাদেশ সাহস করে ম্যাচ এগিয়ে নিতে পারবে না। কিন্তু পঞ্চম দিনের সকালেই বদলে গেল গল্পের মোড়।
বাংলাদেশ সাহস দেখাল। দ্রুত রান তুলল। উইকেট হারালেও পিছিয়ে যায়নি পরিকল্পনা থেকে। শেষ পর্যন্ত ২৬৮ রানের লক্ষ্য ছুড়ে দিয়ে ইনিংস ঘোষণা করে টাইগাররা। আর সেই লক্ষ্য তাড়া করতে নেমেই চাপে পড়ে যায় পাকিস্তানের দীর্ঘ ব্যাটিং লাইনআপ।
দিন শেষে সংবাদ সম্মেলনে ঘুরেফিরে এসেছে সেই মানসিক লড়াইয়ের প্রসঙ্গ। এক উইকেট হাতে রেখেই ইনিংস ঘোষণা করার সিদ্ধান্তে কতটা আত্মবিশ্বাস ছিল, এমন প্রশ্নে শান্ত বলেন, আমার মনে হয় যে ব্যাটিংয়ে আমরা সকাল থেকে ক্লিয়ার ছিলাম আমরা কী করতে চাই।
আমাদের অনেস্টলি ইচ্ছা ছিল আরও ১৫-২০ রান করার। আমার মনে হয় যে এরকম ব্রেভ ডিসিশন নেওয়াটাও জরুরি। টেস্ট টিমটা স্লোলি গ্রো করছে। ওপরের দিকে যাচ্ছে। আমরা একটু সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এটা সামনের দিকে আমাদের হেল্প করবে।
এই কথাতেই যেন ধরা পড়ে নতুন বাংলাদেশের মানসিকতা। আগে যেখানে ড্র বাঁচানোর চিন্তা থাকত, এখন সেখানে জয় ছিনিয়ে আনার সাহস। কোন মুহূর্তে মনে হয়েছিল বাংলাদেশ আর ম্যাচ হারবে না, এমন প্রশ্নেও শান্তর কণ্ঠে ছিল আত্মবিশ্বাসের দৃঢ়তা।
তিনি বলেন, না, আমাদের একটা লক্ষ্য ছিল যে ২৭০ প্লাস রান এখানে খুব ভালো একটা স্কোর হবে এবং যখন আমরা ২৬৮ তে শেষ করেছি তখন আমাদের একটা বিশ্বাস ছিল যে এখান থেকে আমরা ম্যাচটা বের করতে পারব।
টাইগার অধিনায়ক আরও যোগ করেন, ডে ফাইভ হিসেবেও অনেক যে উইকেট খারাপ হয়ে গিয়েছিল তা কিন্তু না। সত্যি কথা এই ১০টা উইকেট নিতেও আমাদের বোলারদের অনেক কষ্ট হয়েছে। এটা একটা ডিফারেন্ট এক্সপেরিয়েন্স।
আমি বলব, বোলাররা ভালো জায়গায় বল করেছেন। ক্রেডিট তাদের দিতেই হবে এবং আমার মনে হয় যে ব্যাটিংয়ের সময় আমাদের মাথায় একটা জিনিস ছিল যে আসলে এই ২৭০-২৮০ এটা কতটুকু সেফ হবে। যেহেতু বোলিং অ্যাটাকটা ভালোই বিশ্বাসটা নিয়ে আমরা এসেছিলাম এবং মিরপুরে ডে ফাইভে যেকোনো কিছু হতে পারে।
এরকম কোয়ালিটি বোলিং অ্যাটাক থাকলে আপনি ওই ধরনের মাইন্ডসেট আপনি নিতেই পারেন। ম্যাচজুড়ে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন শান্ত নিজেই। প্রথম ইনিংসে খেলেছেন দুর্দান্ত সেঞ্চুরির ইনিংস।
দ্বিতীয় ইনিংসেও ছিল শতকের সম্ভাবনা। তবে ৮৭ রানে থেমে যাওয়ায় খানিক আক্ষেপ রয়ে গেছে তার নিজের মধ্যেও। অকপটে স্বীকার করেছেন সেটিও। তার ভাষায়, নিজের জায়গায় অন্য কেউ থাকলে হয়তো একটি ইনিংসে ডাবল সেঞ্চুরিও করতে পারত।
তবু আক্ষেপ ঢেকে গেছে বড় এক আনন্দে। কারণ এই জয় শুধু স্কোরবোর্ডের জয় নয়। এটি সাহসের জয়, বিশ্বাসের জয়, মানসিক দৃঢ়তার জয়। যে বাংলাদেশ একসময় পাকিস্তানের সামনে ভীত ছিল, সেই বাংলাদেশ এখন চোখে চোখ রেখে বলে, ম্যাচ জিততে এসেছি আমরা।
/এসএকে